ঢাকা, শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১১:১৭

প্রিন্ট

সেই এসপিকে যা যা বললেন হাইকোর্ট

সেই এসপিকে যা যা বললেন হাইকোর্ট
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত আজ সোমবার হাইকোর্টে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান।

নিজস্ব প্রতিবেদক

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় হাইকোর্টে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত।

তার আবেদনের ওপর শুনানিকালে আদালত বলেন, পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়া। সে যেই হোক না কেন। কুষ্টিয়ায় যে পরিবেশ বিরাজ করছে, পত্রপত্রিকায় যেভাবে এসেছে, তা যদি বাস্তব চিত্র হয়, এটি হবে ভয়ংকর।

সোমবার বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চে বেলা পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১২টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টাব্যাপী শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

মামলার শুনানিকে কন্দ্রে করে সকাল থেকে ওই আদালতে ভিড় করেন আইনজীবী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে আদালতে পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত দাঁড়িয়ে থাকেন।

আদালতে পুলিশ সুপারের পক্ষে শুনানি করেন মুনসুরুল হক চৌধুরী। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী শফিকুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাহিরুল ইসলাম।

শুনানিতে এসপির পক্ষে মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনা ঘটে গেছে। সেখানে আমার (এসপির) ভুল হয়েছে স্বীকার করছি। অপরাধ করেছি। অতীতে আমার (এসপির) এমন কোনো রেকর্ড নেই। এমন ভুল ভবিষ্যতে হবে না। ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনে আরো সতর্ক থাকব বলে অঙ্গীকার করছি।’

আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে এসপি তানভীর আরাফাত নিঃশর্ত ক্ষমার আরজি জানান।

এ সময় পুলিশ সুপারের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘কথায় পটু হলে চলবে না, কাজে পটু হতে হবে। আপনার কার্যক্রমের মাধ্যমে সবকিছু সমন্বয় করে আপনি সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন, যাতে পুলিশ ভীতিকর না হয়ে বন্ধু হয়।’

পুলিশে দক্ষ কর্মকর্তার বিষয়ে আদালত বলেন, ‘আপনাদের অনেক দক্ষ পুলিশ অফিসার আছেন, যারা অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। আপনাকেও সে জায়গায় যেতে হবে। আপনি তো রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন।’

‘আপনাদের যথেষ্ট জ্ঞান আছে। সেটা কাজে লাগান। সমাজকে একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দিকে নিয়ে যান। রাষ্ট্রের এ অর্গানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কাজ করাই দক্ষতা। এমন যেন না হয় যে, মানুষ ধারণা করছে, একটা পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেছে।’

কুষ্টিয়ার এসপি এস এম তানভীর আরাফাতের উদ্দেশে হাইকোর্ট আরো বলেন, ‘পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের সুরক্ষা দেওয়া; সে যে-ই হোক না কেন। কুষ্টিয়ায় যে পরিবেশ বিরাজ করছে, পত্রপত্রিকায় যেভাবে এসেছে, তা যদি বাস্তব চিত্র হয়, এটি হবে ভয়ংকর।’

আদালত আরো বলেন, ‘কে কোন দল, মত, আদর্শের উত্তরাধিকার, এটা বিবেচ্য বিষয় আপনার নয়। কথায় পটু হলে চলবে না, কাজে পটু হতে হবে।’

হাইকোর্ট বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা ও জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনার কার্যক্রমের মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় সাধন করে কুষ্টিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন, যাতে পুলিশ ভীতিকর না হয়ে বন্ধু হয়। আপনাদের মূলমন্ত্র দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন। আপনাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আপনি রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন। এর মর্যাদা রক্ষা করা আপনার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’

পুলিশ সুপারের প্রতি হাইকোর্ট আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর (তিনটি বিভাগ) মধ্যে সমন্বয়সাধন করে কাজ করাকেই দক্ষতা বলে। এমন যাতে না হয়, একটি পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেছে, মানুষ সেই ধারণা করতে পারে। জাতি উৎকণ্ঠিত। এ অবস্থা নিরসনের দায়িত্ব আপনাদেরই। আপনারা অনেক ভালো কাজ করেন। তাই কথায় পটু না হয়ে কর্মে পটু হোন। তাতে উদ্দেশ্যসাধনে আপনি সফল হবেন।’

এসপিকে আদালত অবমাননা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আরজি জানানো হয়। আইনজীবী অনীক আর হক ভেড়ামারা পৌর নির্বাচনের প্রিজাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরজি জানান।

শুনানি শেষে আদালত আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন। সেই সঙ্গে এই সময় পর্যন্ত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ সুপারকে আপাতত ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে এসপি এস এম তানভীর আরাফাত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

২০ জানুয়ারি ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা জানাতে এসপি এস এম তানভীর আরাফাতকে তলব করেন হাইকোর্ট। সোমবার তাকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

‘এসপির বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ বিচারকের’ শিরোনামে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে এলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই আদেশ দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় তার (এসপি) বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না এবং আদালত অবমাননার জন্য কেন তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না- এ মর্মে কারণ দর্শাতে রুল দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যেই ১৮ জানুয়ারি পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) একটি গোপনীয় চিঠি পাঠান কুষ্টিয়ার এসপি তানভীর আরাফাত।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত