ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২০, ১৫:০৮

প্রিন্ট

ঘুরে এলাম ‘বাংলার কাশ্মীর’ সাদাপাথরের রাজ্যে

ঘুরে এলাম ‘বাংলার কাশ্মীর’ সাদাপাথরের রাজ্যে
শওকত জামান

সাদা পাথর স্বচ্ছ নীল জলের স্রোতে আকাশের নিচে চারপাশে পাহাড়ের গাঁয়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের ভেলায় রুপ নিয়েছে এক টুকরো 'কাশ্মীর'। 'বাংলার কাশ্মীর' দেখতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সপরিবারে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জের উদ্দেশে নোহা গাড়িযোগে রওনা হলাম ৭ সদস্যের পর্যটকের টিম নিয়ে।

সিলেট শহরের কদমতলীতে প্রেসিডেন্ট রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। সিলেট থেকে সড়কপথে ৩৩ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ অভিমুখে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দুপাশে সারি সারি চা বাগান পাহাড়ের টিলা পিছনে ফেলে। চা বাগানগুলো দৌড়াচ্ছে, ঘুরছে গাছপালা ঘরবাড়ি। আমাদের স্বাগতম জানাচ্ছে একটি কুড়ি দুটি পাতা। গড়িতে হালকা সুরে বাজছে গান। একে অপরের সাথে নানা খুনসুটি, ভ্রমণ নিয়ে রাজ্যের সব গল্প গুজব। মাঝে মধ্যে হৈহুল্লোর। আমার পাগলি মা মেধার পাগলামি আর আমার আদরের ধন নাবিল নানা ভাষায় কথা বলছে। রাজপুত্রের ভাষা বুঝি আর না বুঝি, মাথা নেড়ে সায় দিতে হচ্ছে; মাথা না নাড়লেই বেতাল।

একবার গাড়ি উঁচুতে উঠছে আবার ঢালুতে নামার সময় প্রাণ কাঁপা কাঁপা অবস্থার মধ্যেও মনে আনন্দের ঢেউ। আঁকাবাঁকা এসব সড়কের দুপাশে প্রকৃতির বৈচিত্রময় রূপ দেখছি গাড়ির জানালার ফাঁকে চোখ বুলিয়ে। রাস্তায় মাইল মিটারে দেখলাম ভোলাগঞ্জ ৫ কিলোমিটার। কোম্পানীগঞ্জ যতই পেছনে পড়ছে ততই চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে মেঘালয় রাজ্য আর খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়। বিশাল বিশাল নীল পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। পাহাড়ের কোলে নীল আকাশে মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। সময়ে সময়ে বাহারি রূপ নিচ্ছে নীল পাহাড়গুলো। যাওয়ার পথে পাথর তোলার দৃশ্য, পাথর কোয়ারীতে পাথর ক্রেসিংয়ের ঝনঝন শব্দ আর সবুজ প্রকৃতি মুগ্ধ করবে যে কাউকে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টে।

ঘাটে সারি সারি পর্যটকবাহী ট্রলার নৌকা। ঘাটজুড়ে পর্যটকদের ঘিরে নানা ব্যবসার বাহারি সব আয়োজন। খাবার হোটেল থেকে শুরু করে রকমারি পণ্যের দোকান। ইন্ডিয়ান পণ্যের পসরা সাজানো দোকানও চোখে মিলছে। এমনকি গাড়ি পার্কিং পাবলিক টয়লেটও। পাবলিক টয়লেটের গায়ে সাইনবোর্ডে লেখা 'টয়লেট ব্যবহার ১০ টাকা, কাপড় পরিবর্তন ১০ টাকা।' এখানে সেখানে পর্যটকদের নিয়ম ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড।

ঘাটের একপাশে চোখে পড়লো 'সামনে ভারত' সাবধানবাণীর বড় একটি সাইনবোর্ড। পেছনে কাঁটাতারের বেড়া, সামনে বিজিবির চৌকি। ঘাট এলাকায় সবকিছুই দর কষাকষি করে না নিলে পর্যটক শিকারীদের পকেট কাটার খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এসবের মাঝে খুবই ভালো লাগলো ট্রলার ভাড়ার সিস্টেম। কোন দামাদামি বা গলাকাটা দাম হাতিয়ে নেয়ার কোন সুযোগই নেই। ট্রলার ভাড়া নিতে হলে কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে হবে। ঘাট থেকে সাদা পাথরের রাজ্যে আপডাউন ৮০০ টাকা। টিকিটের সিরিয়াল অনুযায়ী নির্দিষ্ট ট্রলারের মাঝি কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। টিকিট ক্রয় করে মাঝির হাতে ধরিয়ে দিলাম। ফিরতি ট্রিপে আসতে মাঝির মোবাইল নাম্বার টুকিয়ে নিতে ভুলবেন না কিন্তু। ধলাই নদীর তীরে ভিড়ে থাকা আমাদের জন্য ট্রলারে উঠে বসলাম। উপর থেকে ধলাই নদীর পানি নীল দেখা গেলেও কাছে এসে দেখলাম সচ্ছ সাদা। আমাদের নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার যাত্রা শুরু করলো ধলাই নদীর আঁকাবাঁকা পথে সাদা পাথরের উদ্দেশে।

নদীর ঢেউ ভেঙে ট্রলার যতই এগিয়ে যাচ্ছে, নীল জলরাশি আর ভারতের মেঘালয়ের সারি সারি পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য আর হিমেল হাওয়া আমাদের মন কেড়ে নিচ্ছে। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই জায়গাটি বাংলার কাশ্মীর বললে ভুল হবে না। মাঝে মাঝে ঢেউ নৌকায় আছড়ে পড়ে শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনিট বিশেক ধলাই নদীর জলের ধারা ভেঙে ট্রলার নিয়ে পৌঁছলাম সাদাপাথরের রাজ্যে। ট্রলার থেকে নেমে বালুচরের রাশি রাশি বালি মাড়িয়ে স্বপ্নের সাদাপাথরের উপর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলরাশিতে পৌঁছালাম আমরা। সেখানে নানা বয়সি পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়।

যতদূর দৃষ্টি যায় দুদিকে সাদা পাথর, মাঝখানে স্বচ্ছ নীল জল। শান্ত পাহাড়, সঙ্গে মিশেছে আকাশের নীল। আকাশে ছোপ ছোপ শুভ্র মেঘ। পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন। এ যেন প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য।

ওপারের মেঘালয় চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা জলের স্রোত ফকফকে সাদা পাথরের উপর ঢেউ খেলে বয়ে যাচ্ছে উদ্যাম নৃত্যে। এসব ঘিরে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ক্যানভাস। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে সাজিয়েছে সাদা পাথরের রাজ্য। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য দেখলে মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়।

সাদা পাথরের উপর গড়িয়ে যাওয়া নীল স্বচ্ছ পানিতে আমরা পা রাখি। সামনে সবুজ পাহাড়; পাশেই পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জল আর সে জল থেকে গড়িয়ে নামা সাদা পাথর— কী অপরূপ দৃশ্য, তা বলে বোঝানোর নয়! আমরা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া শীতল জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আহা কী ঠাণ্ডা!

সাদা পাথরের উপর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ভেজাতেই শুরু হলো ক্যামেরা ক্লিক। পারিবারিক কিছু ছবি তোলার সময় আমার ছোটবাবা নাবিলের দুরন্তপনা হঠাৎ অস্থিরতায় রূপ নিল। কী আর করার, ১০০ টাকা ঘণ্টায় ইজি বিছানার ছাতা ভাড়া করে নাবিলকে নিয়ে বসে থাকার ব্যবস্থা হলো। ওর মা শিমু ও খালা শিল্পি আপার আনন্দের ইতি টানতে হলো দুষ্টটার জন্য। তারাও আনন্দ করেছে; গাঁ ভাসিয়ে নয়, অপরুপ দৃশ্য আর পর্যটকদের আনন্দ উল্লাস অবলোকন করে।

আমি, আমার ভায়রা সুলতান মাহমুদ, শ্যালক শুভ, ভাগিনা অনিক ও আমার বুচি মা মেধা মিলে স্ব-দলবলে নেমে পড়লাম সাদা পাথরে স্বচ্ছ পানির ধারায়। সাদা পাথরের উপর দিয়ে প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডা স্বচ্ছ জল। পানির তীব্র স্রোত পা ফসকে দেহখানি টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভাটির দিকে। বেশ কয়েকবার পানির শক্তির কাছে পরাভূত হয়ে ছুটে যাচ্ছিলাম বড় পাথর আঁকড়ে ধরে প্রাণ রক্ষা করি আপ্রাণ চেষ্টায়। অল্প স্রোত যেখানে পানির শক্তি দুর্বল এমন স্থান বেছে নিয়ে সাদা পাথরের উপর স্বচ্ছ ঠাণ্ডা পানিতে শুয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। অনুভব করলাম স্বর্গীয় সুখ। মেতে উঠলাম জলকেলি খেলায়। সেইসাথে আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি করতে চলছে ক্যামেরা ক্লিকের পর ক্লিক। পানি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকায় আনন্দের পেয়ালায় বেশিক্ষণ টিকতে পরলো না সুলতান ভাই। নামেই সুলতানী আযম, তবে কাজে প্রমাণ নেই ছিটেফোটাও। শিল্পি আপার টানে চলে গেল ছাতার নিচে ইজি বিছানায়। বোনাস সঙ্গ পেল বেড়াতে আসলেই কাহিল হয়ে পড়া আমার জীবন সঙ্গী শিমু ও আমার সুপারম্যান পুত্রধন নাবিল।

মেধা, অনিক ও শুভকে সাথে নিয়ে পাথরের উপর বয়ে যাওয়া স্রোত পেরিয়ে হারিয়ে গেলাম সাদা পাথরের জলরাশিতে। ফিরে গেলাম তারুণ্যের দুরন্তপনায়। ওদের তিনজনকে পানিতে ভাসতে টায়ার ভাড়া করে দিলাম ঘণ্টায় ১শ' টাকায়। তিনজনে টায়ারে চড়ে পানিতে ভাসছে আর জলকেলি খেলছে। ওদের আনন্দ দেখে আমিও আনন্দে ভাসতে থাকলাম। ওরা জলে ভাসছে এই ফাঁকে ইন্ডিয়ান বর্ডারের দিকে এগিয়ে গেলাম ছবি তোলার নেশায়। মনোরম দৃশ্যে ছবি তুলতে তুলতে পাথর বেয়ে বেয়ে ভারতের মেঘালয়ের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছি কখন বুঝতেই পারিনি।

ছবি তুলছি ওপাড় থেকে হঠাৎ বিএসএফ -এর পরপর দুটি গুলির শব্দ। শব্দ শুনে দ্রুত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে স্থানীয়দের কাছে জানতে পারলাম উঁচু পাহাড় থেকে মাঝে মাঝে গুলির ফাঁকা আওয়াজ করে। পর্যটকরা যেন ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে। তবে সমস্যা নয় এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তারপর টায়ারে পানিতে ভাসা ও জলকেলি খেলায় আমিও যোগ দিলাম। নিজেকে হারিয়ে ফেললাম সাদা পাথরের উপর বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা স্বচ্ছ জলে নীল পাহাড়ের মেঘের ভেলায় অপার সৌন্দর্যে বিশাল বালুকাময় চরে সাদা পাথরের রাজ্যে।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভবনার হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পর্যটন স্পটটি নতুন হওয়ায় এখনো পর্যটকবন্ধব হয়ে গড়ে ওঠেনি। এই পর্যটন কেন্দ্রটি নিয়ে পর্যটন কর্পোরেশনের প্রচার প্রচারণা না থাকলেও অপার সৌন্দর্য উপভোগে 'বাংলার কাশ্মীর' দেখতে দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় দিনকে দিন বেড়েই চলছে।

দেশের নানা প্রান্ত থেকেও প্রতিদিন আসছে পর্যটকরা। এই নতুন সম্ভবনাময় পর্যটন কেন্দ্রটিতে হোটেল মোটেলসহ পর্যটকদের নানা সুযোগ সুবিধা সজ্জিত স্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন খাতে বিপুল রাজস্ব আয়ের উজ্জল সম্ভবনা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নজর দিলে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে 'বাংলার কাশ্মীর' ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর।

লেখক: শওকত জামান, গণমাধ্যমকর্মী

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত