ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৫৩

প্রিন্ট

জীবনের রং বদল

জীবনের রং বদল
লেখক হামিদুল ইসলাম সবুজ
হামিদুল ইসলাম সবুজ

ছেলেটার সাত বছরের রিলেশন ছিলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটা আমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। নাম মোহনা। ভাইয়ের নাম ছিলো সামস। আমাদের হলেই থাকতেন। তিন ব্যাচ সিনিয়র। কোনদিনও হাসি ছাড়া দেখিনি তাকে। এতো ভদ্র ছেলে পুরো ক্যাম্পাসে পাওয়া দুষ্কর ছিল। মেয়েটাকে ভালোও বাসতেন পাগলের মতো। প্রায়ই দেখা যেতো ক্যাম্পাসে হাত ধরাধরি করে হেঁটে চলেছেন দুজন। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই অবশ্য হাত ছেড়ে দিয়ে লাজুক হাসি দিতেন শামস ভাই। মাঝে মাঝেই রাত তিনটা-চারটায় ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, হলের করিডোরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ভাই তখনও মোবাইলে ফিসফাঁস করেই চলেছেন!

একটা চাকরির অভাবে সেই সম্পর্কটাই বদলে গেল কী ভীষনভাবে!

ততোদিনে ভাইয়ের মাস্টার্স পাস করা শেষ। চাকরি পাচ্ছেন না বলে হলেই থেকে গিয়েছিলেন আরও দেড় বছরের মতো। মেয়েটা ছেড়ে চলে গিয়েছিলো মাস্টার্স শেষের এক বছরের মাথায়। যাবেই না বা কেনো, সুন্দরী মেয়ে, বাসায় বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, সেই ছেলে আবার প্রসাশনের ক্যাডার।

যাওয়ার আগে মেয়েটা সামস ভাইকে বলে গিয়েছিলো, ‘চাকরি পাও না, যোগ্যতা নেই, তো প্রেম করতে এসেছিলে কেন?’

ব্রেকাপের পর ভাই প্রায়ই আমার রুমে আসতেন সিগারেট খেতে। হাতে সবসময় কোনো না কোনো বিসিএসের বই থাকতোই। ঘন্টার পর ঘন্টা ধোঁয়া ছাড়তেন আর মাথে মাঝে উনার জীবনের গল্প বলে চলতেন। বাড়ির রান্নাঘরের কোনাটা ভেঙে পড়েছে, বড় বোনটার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে, বাপ আবার পেনশনে গেছে এই বছর। মাঝে মাঝে কথা বলা বন্ধ করে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কি যেন ভাবতেন। হয়তো সে ভাবনা আমাদের ধরাছোয়ার বাইরে!

মাস্টার্স শেষ হওয়ার দেড় বছরের মাথায় সামস ভাইকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। বের করে দিয়েছিলো তারাই, যারা সামস ভাইয়ের হেল্প পেতে পেতে এতদূর এসেছে, যাদের হলে উঠার ব্যবস্থা করে দেয়েছিলেন সামস ভাই নিজেই।

যেদিন বেরিয়ে যান, অঝোর ধারায় চোখ থেকে পানি পড়ছিলো। ভার্সিটিতে ক্লাস সেরে এসে দেখি, ভাই বের হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাকে দেখে চোখে পানি নিয়ে অনেক কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আর যাই করিস, প্রেম করতে যাস না ভাই। জীবনটা ছাই বানিয়ে দেবে।’

কথাটা কাগজে লিখে দেয়ালে টানিয়ে রেখেছিলাম!

উপরের কথাগুলো প্রায় বছর-দশক আগের।

ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত একটা কাজে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছিলাম কোনো এক কাষ্টমস অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে, বিষেশত ভার্সিটির কোনো বড় ভাইয়ের সাথে। হেল্প বেশি পাওয়া যায় তাহলে। খোজ-খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম তাতে মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম হলো। শামস ভাই এখন ঢাকা এয়ারপোর্টের নামীদামি কাষ্টমস অফিসার।

সময় করে একদিন গেলাম ভাইয়ের অফিসে। ঝাঁ চকচকে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের একপাশে বসে ছিলেন ভাই। আমাকে দেখে চওড়া হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে বুকে বুক মেলালেন। একথা সেকথার পর উঠল সংসার জীবনের কথা। বললাম, বিয়ে-থা করিনি এখনো, বোহেমিয়ান জীবনই ভালো লাগছে।

ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে বললেন, বিয়ে করেছেন, একটা ফুটফুটে বাচ্চাও হয়েছে। ভাবি সলিমুল্লাহ মেডিকেলের ডাক্তার।

অনেকক্ষন যাবত মনের সধ্যে একটা কথা বাজছিল, শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। ‘মোহনার কথা মনে পড়েনা, ভাই?’বেশ বড়সড় একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘না রে। জীবনে যা চেয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়ে গিয়েছি। এখন আর এইসব ছোটখাট চাওয়াগুলো পাত্তা পায়না।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘মোহনার আর কোনো খবর পাননি?’

কিছুক্ষন চুপ থেকে বললেন, ‘শুনেছিলাম বছরখানেক আগে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।’

ভাইয়ার গাড়িতে একসাথে ফেরার পথে ভাইয়ের বলা একটা কথা কানে বাজতে থাকে। ‘লাইফে কাউকে ঠকাস না রে। লাইফ কাউকে ছাড় দেয়না, প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ে। রিভেঞ্জ অফ নেচার!’

সত্যিই, লাইফ কি ভীষনভাবে রং পাল্টায়!

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best