ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৫ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ২২:৫২

প্রিন্ট

মুসা আল হাফিজ-এর ১০টি কবিতা

মুসা আল হাফিজ-এর ১০টি কবিতা
মুসা আল হাফিজ

শ্রমিক

মেশিনে গুড়ানো হয় প্যাকেটে মোড়ানো হয় পানিতে

চুবানো হয় পরে আগুনে পোড়ানো হয় অনেক আদরে!

তাওয়া থেকে যেই মুক্তি পাই,সকলের

খাদ্য হয়ে যাই!

শ্রমিকের রুটি নেই,শ্রমিকই রুটি

রুটি খাওয়ার এক তরিকার নাম আমেরিকা!

আরো মজাদার নাম শিল্পবিপ্লব

কালো- ধলো কারখানা ও মস্ত মস্ত মাস্তির শহর!

বিশ্বায়ন সুন্দরীর সুতনুর তেজে ওগো উতলা সময়!

এ রূপসী শুধু রুটি খায়!

তার রুটির খনির নাম প্রাচ্য কালোসোনাআফ্রিকা

বেশি বেশি কমমানুষের তৃতীয় জগত!

পৃথিবীর অগ্রগতি রুটি খেতে খেতে!

কায়দা করে রুটি খেতে খেতে বহুজাতিক কোম্পানি মুখ জোড়ায়,

বিশ্বব্যাংক চোখ ঘোরায়, প্রভুবিশ্ব দাসবিশ্বকে বুকে জড়ায়!

নেকড়েবিশ্ব রুটি খেয়ে নেকড়েবিশ্ব হয়

ছাগলবিশ্বে ব্রাক্ষণ ছাগলেরা শুধু রুটি খায়!

মন্ত্রীপরিষদ, খাকি পোশাক, বিনিয়োগ, নগরভবন,

সম্পাদকের চেয়ার রুটি খায়

আশ্রম,আমলা, অভিনেতা, অফিসার সকল অভিসারে রুটি খায়।

সকলেই রুটি খায় সকল খানায়

নরমাংসে রুটি আর বৈজ্ঞানিক ঝুল

সভ্যতার পাতে বসে বসে!

মেশিনে গুড়ানো হয় প্যাকেটে মোড়ানো হয় পানিতে

চুবানো হয় পরে আগুনে পোড়ানো হয় অনেক আদরে!

তাওয়া থেকে যেই মুক্তি পাই,সকলের

খাদ্য হয়ে যাই!

জামা

জামাটি বিক্রি করবো

মাংসল জামা

জামার ভেতরে চোখ

চোখের ভেতরে আমি

হাজারো বাজারে ঘুরি

নগরে, শহরে

ওয়াশিংটন, লন্ডন, মস্কো, দিল্লির কথা ছেড়ে দিলাম

এই ঢাকা

ডাকার

দামেশক

বাগদাদ

বৈরুত

কিংবা

জুব্বাপরা রিয়াদও

জামাটির ক্রেতা হলো না!

পাগল লোকটি

লোকটি মানুষের ভিড়ে নিবিড় নিরবে নিখোঁজ নিজেকে খুঁজছে

ভগ্নলোকালয়, মগ্নসুখালয় নগ্নভোগালয় কিংবা

বহুজাতিক ডুবন্ত জাহাজ, উড়ন্ত রাজনীতি, থৈ থৈ হাহুতাশ

এবং মাতাল দুতাবাসে খুঁজছে মানুষ!

চন্দ্র- সূর্যগলা গোলাকার ঘরখানা মানুষের চাপে

চ্যাপ্টা হয়ে যায় আর লোকটি

মানুষ কোথায়?

মানুষ কোথায়?

বলে দিন- রাত জলে- স্থলে নিজেকে ঝরায়!

লোকটি

লোকটি আকাশের হাত হাতে নিয়ে ভাগ্য রেখা দেখে আর

ধমকে সরে না এমন মেঘকে

ধমক দিয়ে বলে,

সরে যাও কুণ্ডুলিপাকানো কালো সাপ!

লোকটি প্রদীপ নিয়ে সারা দিন আলো খুঁজে দিনের আলোয়!

লোকটি সারাবেলা ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট ছোট

শূন্যের মধ্যে হিসেব করছে জিরো প্লাস জিরো জিরো প্লাস জিরো...

দ্রষ্টব্যের সীমানা

অনবরত মুখরতা থেকে বিরতিহীন নৈশব্দে চলে যাই

অবিরাম কথা বলি অবিরত নিরবতায়

শব্দ যাকে ধারণ করতে পারছে না,তার নাম

নিরবতা

নিখিলের বসন্তে অফুরান দানোৎসব শুরু হলে

সকলেই ব্যক্ত করে যার যার চাওয়া

যার যার প্রেম

আমি কিছুই ব্যক্ত করি না

আমি কিছু ব্যক্ত না করে সকলের বেশি ব্যক্ত করি

বলা যদি প্রেম হয়,না বলা তো প্রেমের অধিক!

আমি কিছুই না বলে পেরিয়ে যাই দ্রষ্টব্যের

সীমানা

হে পৃথিবী, খাও!

তুমি আমাকে খাবে?

খাও

তুমি কি জানো কী খেতে যাচ্ছো?

নায়াগ্রার রক্তপাত,তাতার তেজের দীর্ঘশ্বাস,

কাকের চুলের রাত্রি আর না- জীবন,

না- মরণের চিৎকার!

জীবনকে আমি চাইনি সীমাবদ্ধতার দোষে

মরণকে আমি চাইনি যোগাযোগের বিভ্রাটে!

যদি আমাকে খাও

ক্ষুধা যাবে বেড়ে!

ঝড়- বাদল,খরা

হত্যা- রাজনীতি,

সেনানিবাস, রোকেয়া হল

সমুদ্র সৈকত, বহুজাতিক চুক্তি

সব তুমি খাবে

শুধু বেড়ে চলবে ক্ষুধা

আমাকে খেয়ে ক্ষুধা বাড়লে আরো বেশি আমাকেই খাবে!

খাবে ব্যাবিলন,হরপ্পা,সমতট

কিংবা ইনকা,মেসোপটেমিয়া!

খাবে, দ্রাবিড়, মোঙ্গল, হুন, শকের শিকার!

খাবে বোধিবৃক্ষ, বেদের উদ্যান নাজারাতের ফল

খাবে,হোমার- চার্বাক, সোলান

প্লেটোর তরকারি

আমাকে খাবে বলে যা খাচ্ছো

তা পূর্ণত আমি নই

কিন্তু আমাকেই খাচ্ছো এতক্ষণ!

আমি মূলত না খাদ্য না ক্ষুধা

না দৃশ্য না অদৃশ্য, না রাত না দিনের অদেখা প্রান্তরে মধুময়

আগুনের ভেতর চিরদিনের বেহালায় সুরারোপ করছি

পরমায়ুর!

আমাকে খাবে?

খাও সেই সুধার নিস্বন!

আরেক পৃথিবী

আমরা কোথায় আছি?

আছি, যেখানে থাকা নেই!

এখানে বৃষ্টি সিক্ত করে এবং শুকিয়ে

দেয়

এখানে সূর্য এবং চাঁদ হাজির হয় না

লজ্জায়

কেননা এখানে প্রতিটি চেহারাই

চাঁদ, প্রতিটি কপোলে সূর্য

এখানে কথা বলছে পাহাড় আর

গাছে গাছে দাউ দাউ সবুজ আগুন

মদের মৌতাতে দ্যাখো বেহুঁশ মেঘমালা!

আমরা মৃত্যুবরণ করে করে এখানে এসেছি

আমরা বার বার জীবিত হয়ে এখানে এসেছি!

এখানে হৃদয় থেকে বইছে নদীনালা

ওরা আকাশে উড়ে যায় জমিনের মাধুরি নিয়ে

ওরা জমিনে নেমে আসে আকাশের

শুভেচ্ছা নিয়ে!

এখানে সাত আকাশের সমান আকাশ বুকে নিয়ে

আমরা বসে যাই ধ্যানের নিকেতনে!

প্রশ্ন

মেঘের কুন্ডুলি কেউ যদি চূর্ণ করো

তাহলে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মতো প্রশ্নগুলো

ঝরে পড়বে। কেউ যদি শঙ্খের আর্তনাদে

মহাশুন্যে কান পাতো, তাহলে কারাবন্দি হাসির মতো

সব নির্মমতা ফাঁক করে দেবে।

পৃথিবীর হৃদপিন্ডে ক্লেদের ট্রাক হামলে পড়ছে

নদীর নক্ষত্র দৌড়াচ্ছে কবিতার ছিন্নভিন্ন জনপদে

বিবেকের বৃক্ষটিতে অবিরাম কুঠারাঘাত

কেউ দেখে না!

কস্তুরি হরিনীটি শরাহত

তার যাতনামথিত পাশটিতে

কেউ এসে দাঁড়ালো কি?

রজনীগন্ধাগুলো ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছে

হনন মাতাল শ্বেতাঙ্গ ফুঁৎকারে। বাণিজ্যের জালে

গোল্ডেন ফিশের মতো শিকার হচ্ছে ভালোবাসা

পুঁজিদেব ব্যাগ হাতে তারই কামনায়।

মৃত্যুর তামস নিয়ে চাঁদের নরোম দেহ ঘষছে বাদুড়

আর দীপ্তিমান সুন্দরের বুকে কুকুর লেলিয়ে দিয়ে

ভদ্রাসনে বসে আছো তোমরা মানুষ?

মহাকালের ড্রাকুলারা (উৎসর্গ : মাহমুদ দারবিশ)

বুকের ভেতর উদ্ধত লাভাটিকে ঘুম পাড়ানো যায়?

ভালোবাসার বিনিদ্র আগুনকে কেউ পেরেছে

দাফন করতে?

ঘুমায় না লাভা,সে ঘুমিয়ে গেলে জীবন হয়ে

যাবে বরফের স্তুপ

ভালোবাসা মানে না মরণ

সে না থাকলে আমি হয়ে যাবো আমারই সংহার

ফিলিস্তিন আছে স্বাধীনতার লাভা বুকে নিয়ে

আর কুদস মানেই ভালোবাসার হৃদপিন্ড

যেখানে রক্ত থেকে প্রত্যহ বিকশিত হচ্ছে

জীবনের অঙ্কুর

ফিলিস্তিন আমাকে বুঝিয়েছে কবিতার বেদনা

ফিলিস্তিন আমাকে মাতিয়েছে জীবনের যৌবনে

মহাকালের ড্রাকুলারা মানবতার সমস্ত

সম্ভাবনাকে অবজ্ঞা করে

প্রেমের মাতৃভূমিকে যখন দখল করলো

তখনই জগতের সমস্ত ন্যায়কে ধারণ করে

দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো কুদসের ইন্তিফাদা

সেই থেকে আমি ফিলিস্তিনে মজে আছি

যেভাবে শিশুরা ডুবে থাকে মায়ের মাঝে

মাতৃস্তনের রহস্য না জেনেই

ইতিহাসের করুন প্রহরে নির্জন নদিতীরে বসে দেখছি

আমারই ধড় কামড়ে দিয়ে উর্ধশ্বাসে ছুটছে নেকড়েদল

কিন্তু পৃথিবীর কোথাও কোনো শব্দ নেই

অনেক দূরে বসে আছে দুঃখিত বিদ্রোহ

জন্তু ছিঁড়ছে আমাকে আর থেঁতলানো শরীর

থেকে মধু চাটছে

বিশ্বরাজনীতির পোকামাকড়

কিন্তু ফিলিস্তিন!

আইউবির ঝড়ের মতো সেখানে ধাবিত হলো সহসা আযান

তারপর প্রেমের যুবা দুঃসাহসে দাঁড়িয়ে

গেলো পশুর মুখোমুখি

নক্ষত্র মরে গেলে ভস্ম থেকে জন্ম হয় তার

ফিলিস্তিন -ভস্ম থেকে জাগে কবি

মুক্তিপ্রিয়তার

সাম্প্রতিক পৃথিবী

দুধের গামলায় ক্লেদাক্ত পা ডুবিয়ে

ঘেউ ঘেউ করছে নেড়ে কুকুর

রক্তাক্ত সবুজ পড়ে আছে মৃত গোলাপদের মাঝখানে

জখমী সূর্য থেকে চুইয়ে পড়ছে লাল পুঁজ আর

সন্ধ্যার লাল প্রস্রাব

প্রতিধ্বনি আর ছায়ামূর্তিরা ইতিহাস থেকে নেমে আসছে

তারা কাউকে উন্মাদ বানাচ্ছে মেরে ফেলবে বলে !

আটলান্টিক পেরুতে কাদছে সভ্যতার যাযাবর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close
close