ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৯, ১৭:০৭

প্রিন্ট

নিঃসঙ্গ নীরবতা

নিঃসঙ্গ নীরবতা
জাহিদুল কবির রিটন

সোহরাব হোসেনের সাথে শক্রতা এ জীবনে শেষ হবার নয়। প্রথমে মনোমালিন্য , ক্রমান্বয়ে বাকবিতণ্ডা এবং তারপর থেকে শক্রতা, এভাবে চলছে তো চলছেই। কী পরিমাণ শক্রতা যে করছে তার সাথে সেটার কোন ইয়ত্তাই নেই ! তার সম্বন্ধে কুৎসা রটনা করাকে সেই তুলনায় মামুলি বিষয় হিসেবেই গণ্য করা যায়, এত্তো শক্রতামীর ভেতর। সর্বশেষ শক্রতামী করেছে তার মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে। পরে অবশ্য মেয়ের বিয়ে হয়েছে অন্যত্র। এই বিয়েটিও ভাঙ্গার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল সে।

খবরটা শোনার পর থেকেই মনে এক ধরণের ফূর্তিভাব বিরাজ করছে সোহবার হোসেনের। কখনো কখনো মনের এই ফূর্তিভাবটাকে বিদায় করার চেষ্টা সে যে করছে না, তা নয়। কিন্তু এ ভাবটা মন থেকে যেতে চাচ্ছেই না। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে তার মনের এ ভাবটা যেন কোনভাবেই পরিবারের ও কাছের লোকজন আঁচ করতে না পারে। বলা যায়, এ ব্যাপারে সে এখন পর্যন্ত শতভাগ সাফল্য ধরে রেখেছে। শেষ কয়েকটি কথা সমবেতদের উদ্দেশ্যে বলার জন্যে সে মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে। শুরুটা সে এভাবে করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে - আজ হতে আমি অসহায় হয়ে পড়লাম। আমার মন স্থবির হয়ে গেল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল, বাহুশক্তি-চলৎশক্তি অসাড় হয়ে গেল... এভাবে শুরু করে তাদের দু’জনের মধ্যে কতোটা গাঢ় বন্ধুত্বছিল তা কথার চাতুর্যে প্রমাণ করে ছাড়বে সোহবার হোসেন । এজন্যে মিথ্যার আশ্রয় তাকে নিতে হবে প্রচুর পরিমাণে।

নিতে হলে নিবে, তাতে কি ! ঠোঁটের কোণায় ঈষৎ হাসির ঝিলিক ফোটে উঠলো তার ! মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো সোহরাব হোসেন, যেতে যেতে পুরো স্ক্রিপ্টটি সাজিয়ে ফেলবে সে।

এখন সোহরাব হোসেনের উপর তার রাগ হচ্ছে না, বরং করুণা হচ্ছে। লোকটা সারাটা জীবন বলতে গেলে কূটবুদ্ধি আর অভিনয় দিয়েই ভরে রেখেছে। কী অভিনয়টাই না করার চেষ্টা করছে ! দেখে মজা পাচ্ছে সে।

এই যে মজাটি দিচ্ছে সোহরাব হোসেন তাকে, এটিই বা কম কোথা দিয়ে । সে সোহরাব হোসেনের অভিনয় দেখতে লাগলো।

তার নজর গেল আমজাদ আলীর দিকে। পরপর দু’বার নির্বাচনে হেরে বেশ বেসামাল হয়ে গিয়েছিল সে। নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে এনেছে সে কিছুদিন ধরে ।

আমজাদ আলীর থেমে থেমে নিজে উপর রাগ লাগছে। প্রত্যেক জায়গায় সে পবিত্র কোরআনের যে আয়াতটি পড়ে, অথচ এখন সেই আয়াতটি তার মনে পড়ছে না । আশ্চর্য !

আমজাদ আলীকে কানে কানে তার বলতে ইচ্ছে করছে, তুমি যে আয়াতটি হাতড়ে বেড়াচ্ছো,সেটির মর্মার্থ দূরে থাক, সোজা অর্থটিও কি তুমি কখনো অনুধাবন করেছো ?

করোনি, যদি সামান্য অনুধাবনও করতে, তাহলে আগের সব বাদ দিয়েই বললাম, সর্বশেষ মসজিদ ও ঈদগাহ আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে এমন ধূম্রজাল তৈরী করতে না !

কি হবে বলে আমজাদ আলীকে ! নিজে থেকে বোঝার ইচ্ছা না হলে, তাকে তো বলে বোঝানো যায় না। আর আমজাদ আলীরা সব বোঝে, আবার মনে হয় কিছুই বোঝে না! নাকি আমজাদ আলীরা সব সময় অচেনাই থেকে যেতে চায়।

মির্জা মাকসুদুর রহমানকে দেখে সে কিছুটা অবাক হলো। মির্জা সাহেবের তো এখানে আসার কথা না। তবুও তিনি আসছেন কেন ?

আমজাদ আলীকে পোড়াতে ? মির্জার ছায়াও তো আমজাদ আলী কেটে ফেলতে চায়। পরপর দু’বার নির্বাচনে সে হেরেছে এই মির্জার কাছেই।

মির্জার আজ এখান থেকে চলে যাবার কথা ছিল। সে যাবে, এমন সময় খবরটা পেল। তখনোই মির্জা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, সে আজ আমজাদ আলীর বাগ্বাকুম করা কথার জন্যে ইঙ্গিতে কথা বলে তাকে শায়েস্তা করবে।

মির্জার মনের কথা জানতে পেরে তার যেমন উদ্বেগ হচ্ছে, তেমনি হাসিও পাচ্ছে। মির্জা একটিবার চিন্তা করছে না, সে যেমন আমজাদ আলীকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা এঁটেছে, তাকেও কি কথার সাহায্যে আমজাদ আলী আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা না করে ছাড়বে?

আয়াতটি মনে করার কতো ভাবেই না চেষ্টা করছে আমজাদ আলী। সে অবশ্য ঠিক করে রেখেছে, আমজাদ আলী আয়াতটি শেষ পর্যন্ত মনে করতে না পারলে, সে তার কানে কানে বলে আয়াতটি মনে করিয়ে দিবে।

যার সবগুলো পদবীই সাবেক, সেই লিয়াকত খন্দকারকে দেখা যাচ্ছে। পদবীতে সাবেক হলেও বর্তমানে ঐ পদবী ধারীদের চেয়ে আচরণে সে কম যায় না। কথা-কাজে সে কুলিতে উঠতে না পারলে শেষে হট্টগোল শুরু করে দেয়। এ ব্যাপারে সে যথেষ্ট কৃতিত্বের অধিকারী।

লিয়াকত খন্দকার যখন সাবেক পদবীধারী ছিল না, তার হাতে ক্ষমতা ছিল, তখন একবার সে তার কাছে ছেলের চাকরির ব্যাপারে তদবির করাতে গিয়েছিল।

তার ছেলের চাকরিটি হবে এ বিষয়ে লিয়াকত খন্দকার তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ কারণে সে অন্য একজনের মাধ্যমে কিছু টাকা উৎকোচ হিসাবে লিয়াকত খন্দকারকে দিয়েছিল।

সেই চাকরিটা তার ছেলের হয়নি। তার ব্যাপারে লিয়াকত খন্দকার নিজের স্বভাবের কোন পরিবর্তন করেনি। তার স্বভাব হচ্ছে, সবার কাছ থেকে টাকা নেবে, যার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি আদায় করতে পারবে, তার কাজ করে দেবে।

লিয়াকত খন্দকার আজ সবাইকে বলবে, তার সহপাঠী কতো মহৎ লোক ছিল। তার হাতে যখন ক্ষমতা ছিল, তখন যেচে উপকার করতে চেয়েছে, কিন্তু সে নেয়নি । এমনই সৎ স্বভাবের মানুষ !

এতে লিয়াকত খন্দকারও মহৎ হবে। মহতের বন্ধু তো মহৎ- ই হবে, জ্বোতচোর তো আর হবে না।

লিয়াকত খন্দকারের এই ভাবনা তাকে দুঃখ দিল। লোকটি যা ভাবছে তা যদি বলে, তাহলে সে ছোট হয়ে যাবে নিজের কাছেই নিজে। সে মোটেই মহৎ লোক নয়। তবে জানা মতে, সে জীবন-যাপনে সততা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ভাবনায় ছেদ ঘটলো, আমজাদ আলীর কথা শুনে। কথাগুলো যে মির্জা মাকসুদুর রহমানের উদ্দেশ্যে , তা শুধু সাবালকরা নয়, নাবালকরাও বুঝবে এমন।

’পদ্মা সেতু, মেঘনা সেতু করতেও তো আড়াই বছর লাগাবে না ! আর দুই হাত দুই হাত চার হাতের একটা ব্রিজ নিয়ে কী তামাশাটা শুরু হয়েছে ! আড়াইটা বছর ধরে কেবল দ্যাখছি, কিছু বলছিনা! ফাজলামো শুরু করেছে ! বাশের সাঁকো দিয়ে মানুকে চলাফেরা করতে হয় ! ’

এই পর্যন্ত বলে আমজাদ আলীর ক্ষোভের লক্ষ্য মির্জা মাকসুদুর রহমান থেকে সরে সমবেতদের উপর গিয়ে পড়ল। এরাইতো মির্জাকে ভোট দিয়ে পাশ করায়। তার ইচ্ছা করছে ডিনামাইট দিয়ে ব্রিজের যা কাজ হয়েছে তা উড়িয়ে দিতে । কিসের ব্রিজ লাগে ? তোরা সাতরিয়ে নদী পাড় হবি !

আমজাদ আলীর রাগ-ক্ষোভ এখন মির্জার উপর থেকে নেমে সমবেতদের উপর ভর করেছে।সে বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে সবাইকে দেখছে। আচমকা আমজাদ আলীর রাগ সমবেতদের উপর থেকে তার উপর এসে পড়লো।

এর জন্যেই তাকে এখানে আসতে হয়েছে। তা না হলে মির্জার চেহারা তাকে দেখতে হতো না !

আমজাদ আলীর এখন মনে হচেছ, কেউ তাকে ভোট দেয়নি ! মির্জাকে এ ভোট দিয়েছি, যার জন্য মির্জা এসেছে !

তার উপর আমজাদ আলীর রাগ দেখে সে যখন দুঃখিত হচ্ছে, ঠিক তখন মির্জার মনের কথা শুনে সে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। মির্জার মন আমজাদ আলীকে বলছে, দাঁড়াও, আজ তোমাকে শায়েস্তা করবো। ব্রিজ নিয়ে কথা বলো, ব্রিজ তোমার মাথায় ভাঙ্গবো ! মাইক্রোফোন দেখলেই কথা উগাড়াইয়া উঠে ? সেই কথা আজকে তোমাকে আবার গিলাবো। মির্জা মাকসুদুর রহমানের মন এ কথাগুলো বলেই চলচ্চিত্রের ভিলেন মার্কা হাসি হাসছে।

সেই হাসির শব্দে বিচলিত না হয়ে সে পারলো না আসন্ন ঝামেলার আশংকা দেখে।

এরই মধ্যে হেলে-দুলে এসে হাজির হলো সত্যিকারের মাইক্রোফোনের লোক আইয়ুব বাচ্চু। যার আরেক নাম চেয়ারম্যান বাচ্চু। যেখানেই মাইক্রোফোন সেখানেই চেয়ারম্যান বাচ্চু; এ যেন একে অপরের পরিপূরক।

সদা হাস্যজ্জ্বল চেয়ারম্যান বাচ্চুকে দেখলে তার প্রায়ই করুণা হয় এই ভেবে যে, এ আরো বড় পদবী যোগাড় করতে পারতো, যদি লোভ ও কৃপণতার কারণে পা-চাটার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারতো! এটা বোধহয় এ জীবনে ত্যাগ করা এর পক্ষে সম্ভব নয় !

শহিদুল আলমকে আসতে দেখে আইয়ুব বাচ্চু কয়েক কদম এগিয়ে গেল। যেন অভ্যর্থনা দিয়ে নিয়ে আসবে তাকে। বাচ্চু পারেও !

যদিও এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু মনে মনে বলছে, শালা গোমস্তা, ধব্ ধবে সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা পইরা ঘুরোস্!

সঙ্গে সঙ্গে সে বিরক্ত হয়ে আইয়ুব বাচ্চুকে বলল, তোমার চাইতে শহীদুল আলম অনেক ভালো। আলম এক দোকানের কর্মচারী ছিল, এটা সত্য। কর্মচারী হওয়া নিশ্চয়ই দোষের কিছু না। তারপর আলম ব্যবসা শুরু করছে। ওর শ্বশুর ওকে আর্থিক সহযোগীতা করেছে। ওর ভাগ্য, পরিশ্রম ও বুদ্ধি ওর সহায় হয়েছে। আর সর্বশেষে রাজনৈতিক মারপ্যাচের খেলায় ওকে জেতানো হয়েছে ।

কি তুমি বাচ্চু; পথ তৈরী ছিল , তুমি হাঁটতে পারেনি । এই যে তুমি শহীদুল আলমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছো, সে মনে মনে কি বলছে জানো ?

সে বলছে , বাচ্চু আয়, তোর জন্যে পকেটে আমি খুচরা পয়সা রাইখ্যাই দেই!

মির্জা মাকসুদুর রহমানের চোখে চোখ পড়তেই আইয়ুব বাচ্চু সিদ্বান্ত পাল্টিয়ে শহীদুল আলমের দিকে না যেয়ে মির্জার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।

তা দেখে শহীদুল আলমের মনের উক্তি, লাভ নাই রে বাচ্চু, মির্জা তোরে একটা কানা পয়সাও দিবো না !

এরপর শহীদুল আলম নিজেই নিজেকে শাসালো, কি হয়েছে আমার ! বাচ্চুরে নিয়ে আমি চিন্তা করছি ক্যান ? এখনো তো বক্তব্য কি দেব, সেটাই স্থির করতে পারি নাই । আমি এখনো ভালো বক্তৃতা দিতে পারি না। পারবো কেন ? আমি কি আগে বক্তৃতা দিছি কখনো। হালে বক্তৃতার মহা ক্যাচালের মধ্যে পড়ে গেছি । মাইকে তো আমাকে গুরুগম্ভীর কন্ঠে কিছু বলতে হবে। কি বলব, সেটা আগে ঠিক করি ।

তার সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল, এই কথা বলে শুরু করবে শহীদুল আলম। কিন্তু মনে করতে পারছে না সে, উনার সঙ্গে তার কখনো কথা হয়েছে কিনা।

কথা তো নিশ্চয়ই হয়েছে ,যখন সে দোকানের কর্মচারী ছিল । সে কথা তো আর এখন বলা যাবে না। এখন বলতে হবে মিথ্যা কথা বানিয়ে বানিয়ে।

সে মিথ্যা কথা বানিয়ে বানিয়ে বলতে পারদর্শী হতে পারছে না । এ জন্যে তার রাগও লাগে । অন্যেরা কি সুন্দর করে গুছিয়ে মিথ্যা কথা বলে। আজও এখনে মিথ্যা গল্প আউরাবে প্রায় সকলেই ,দু’এক জন ছাড়া । সমবেত সকলেই এসব বোঝবে, কিন্তু কেউ কিছু বলবে না।

শহীদুল আলমও গিয়ে দাঁড়ালো মির্জা মাকসুদুর রহমানের পাশে। সে সব সময় ক্ষমতার সাথে থাকে। যার কারণে তার হাতেও ক্ষমতা এসেছে। সে বলেও, আমি সব সময় সরকারি দল করি !

শহীদুল আলমের এক সময়ের রাজনৈতিক গুরু ছিল আমজাদ আলী । তার হাত-পায়ের সাহচর্যে সে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি উপরে উঠেছে । এখন সে মির্জা মাকসুদুর রহমানের পেছনে পেছনে থাকে ।আবার কায়দা মতো গোপনে গোপনে আমজাদ আলীর হাত-পাও টিপে দিয়ে আসে।

এজন্যে একদিন আমজাদ আলী তাকে র্ভৎসনা করে বলেছিল, আলম,দুই নৌকায় পাও দিয়ে থাইকো না ,নদীর মধ্যে পইড়া ডুইবা যাবা !

তখন শহীদুল আলম বলেছিল, লিডার, আমি আপনের নৌকাই থাকি । ঐ নৌকায় যাইতে হয় ব্যবসা করার কারণে। বোঝেনিতো, ব্যবসা কইরা খাই !

আমজাদ আলী তখন খুব নোংরা ভাবে তাকে বলেছিল , তুমি ব্যবসা কইরা খাও না , তুমি বেশ্যাগিরি কইরা খাও !

শহীদুল আলম রাগ করেনি একথায়। হাসি মুখে মাথা নিচু করে রেখেছিল। আর মনে মনে বলেছিল , কথা সত্য বলছেন , কারো গলাই ছুরি চালাতে আমার হাত কাপবে না ! অধ্যাপক বেলাল উদ্দিনকে দেখে তার মনটা আনন্দে ভরে গেল। সে যেন জঞ্জালদের হাত থেকে মুক্তি পেল !

অধ্যাপক সাহেব অশ্রুসজল মনে এসে দাঁড়ালেন, চিরন্তন সত্য ভাবনা নিয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।

অধ্যাপক সাহেবের সাথে কতো মায়াময় সম্পর্ক রয়েছে তার। এখন মনে পড়েছে সে যখন বাস দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল সে সময়টার কথা। কাকতালিয় ভাবে অধ্যাপক সাহেব সেখানে ছিলেন। কী ছোটাছুটিটাই সে করেছিল তাকে নিয়ে! প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে জেলা শহরের হাসপাতাল থেকে বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করে নিয়ে এসেছিল।

স্থানীয় হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা শহরের হাসপাতালে চিকিৎসার শেষ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হয়েছে তা অধ্যাপক সাহেবের মুখ থেকে বের করতে পারেনি সে। বরং খরচের কথা তোলাতে অধ্যাপক সাহেব রাগ করেছেন । বলেছেন , আমি আমার বন্ধুর জন্যে করেছি । আমার এ অবস্থা হলে আপনি করতেন না ? বন্ধুত্ব ফেরত দিতে চান?

এ কথার পর আর কি কোন কথা বলা যায় ? সত্যি অধ্যাপক বেলাল উদ্দিনের মতো বন্ধু এ জীবনে সে পাবে না। বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায় বিপদের সময় । শুধু এই দুঘর্টনার সময়ই নয়, তার জীবনের আরো অনেক দুর্যোগের সময় অধ্যাপক সাহেব বন্ধুত্বের পরিচয় রেখেছেন ।

সোহরাব হোসেনের কারণে যখন তার মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে গিয়েছিল , তখন এই অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন । সে খোঁজাখুজি করে অবশেষে ভালো পাত্র জোগাড় করে এনেছেন। পাত্র তার সম্বন্ধীর ভায়ের ছেলে। তার সেই মেয়ে ভালো আছে, সুখে আছে!

এই জীবনে অধ্যাপকের কাছে ঋণ শোধ করা যাবে না। একথা একদিন বলতে অধ্যাপক শুনে বলেছিলেন, ঋণ যদি থাকে, তাহলে শোধ করে দেন ! ঋণী থাকবেন কেন? একথা বলেই সে তাকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, ঋণের কথা আর বলবেন না, এতে বন্ধুত্বের অমর্যাদা হয়, মাফ করবেন !

অধ্যাপকের সেই কথাগুলি এখনো তার কানে ধ্বনিত হলো। সে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

আর তখনই উপস্থিত হয়ে অবশ্যম্ভাবী বক্তাদের উপস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন হলেন মুফতি গোলাম মাওলা। আজও কয়েকদিন আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। শুধু কয়েকদিন আগের অবস্থার পুনরাবৃত্তি নয়, এ যেন চলমান একটি অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বক্তাদের সত্য-মিথ্যা বক্তৃতার চাপে সমবেতরা অতিষ্ঠ হয়ে যায়। কেউ এদেরকে থামাচ্ছে না, আর নিজে থেকে থামার লোকও এরা নয়। কথা বলতে পেরে এরা যেমন ধন্য হচ্ছে, এদেরকে দিয়ে কথা বলাতে পেরেও কেউ কেউ ধন্য বনে যাচ্ছে।

এমন সময় হাঁকডাক দিতে দিতে এসে হাজির হলো আব্দুস সালাম। তাকে দেখলে সেই প্রবাদটির কথা মনে পড়ে, গাঁয়ে মানে না আপনা মড়ল।

আবদুস সালাম দাঁড়িয়েই মুফতি গোলাম মাওলাকে দেখে বলল, মুফতি আসছো ?

মুফতি গোলাম মাওলা বিনীত ভঙ্গিতে তাকে সালাম জানালেন। আর মনে মনে মুফতি ভাবলেন, আজ এ অবস্থার প্রতিবাদ সে করবে কৌশলে। এভাবে চলতে দেওয়া উচিত না। সবাই বিরক্ত হয়, কেউ শব্দ করে কিছু বলে না। গুনগুন করে বিরক্ত প্রকাশ করে কোন ফল হবে না। এভাবে চলতে থাকলে লোকজনের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।

মুফতি গোলাম মাওলার এই ভাবনাকে সে সমর্থন করলো। তাই তো, পরেও তো বলা যায়। গুরুত্বপূর্ন মানুষকে নিয়ে কিযেন সভা করে। সেটা করেও তো ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলা যায়। আর সে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ না তার চোখে সমাজের কাছে, তাই তাকে নিয়ে এখন কিংবা পরে কোন কথাই তো হবার নয়। অথচ কত পরিকল্পনা একেকজন করছে কি বলবে তা নিয়ে। মুফতি, আপনি এসবের বিরুদ্ধে কিছু বলুন। কাউকে না কাউকে এসব অনায্য কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ করতে হবে। এরই মধ্যে লোকমান ও শওকতের দিকে নজর গেল তার। তারা ফিস্ফিস করে কথা বলছে একে অপরের সাথে।

: আগেই বলছি পরে আসি ! না, এখনি যাই, এখন এক ঘন্টা বক্বকানি শুনতে হবে !

: এক ঘন্টা বক্বক্ করলে সবাইকে গোছল করে ফেলতে হবে ! আকাশের অবস্থা ভালো না !

তাদের কথা শুনে সে আকাশের দিকে তাকালো। সত্যিই তো, মেঘ আকাশ ঢেকে ফেলেছে।

: আরে , এদের কোন কান্ডজ্ঞান আছে ! বৃষ্টি মধ্যেই এরা কথা বলবো ! একজন কথা বলে ফেললে, প্রত্যেকেই তখন কথা বলবে ! তা না হলে ইজ্জ্বত থাকব তাদের ! তখন কিসের বৃষ্টি, কিসের ঝড় !

: আচ্ছা, এরা একটা কাজ করতে পারে না, নিজেদের বাড়িতে মাইক নিয়ে সারা দিন-রাত বক্তৃতা দিবে! কেউ বাধা দেবার থাকবে না !

তাদের কথা শুনে তার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। কতোটা বিরক্তি থেকে তারা এসব বলছে। এরা যদি এসব সাধারণ মানুষের কথা একটু বুঝতো !

: বাড়িতে মাইক নিয়া বক্তৃতা দিলে চলবো ? মানুষরে চেহারা দেখাতে হবে না !

: এক চেহারা মানুষ আর কতো দেখবো ! বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট কয়েকটি চেহারা দেখে যেতে হচ্ছে ! চেহারা তো বদলিয়েও আসে না !

বক্তারা আঁটঘাট বেঁধে কথা বলার জন্যে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। কথা বলার সময় হয়তো কিছু পরিবর্তন করে বলতে হতে পারে, অন্যের কথার পরিপেক্ষিতে।

সমবেত সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। বক্তারাও সমবেতদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমজাদ আলী ভীষণ খুশি, পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতটি অবশেষে মনে পড়াতে, যার বাংলা অর্থ - প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হবে।

শুধু আমজাদ আলী নয়, প্রত্যেক বক্তাই খুশি। কেননা, প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্য কি হবে তা গোছিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তারা কেউই আকাশের দিকে খেয়াল করছে না। শুধু সে আর সমবেতরাই তা খেয়াল করছে।

সঞ্চালক মাইক্রোফোন হাতে নেবার সাথে সাথে সমবেতরা সমস্বরে চিৎকার করে বলতে লাগলো, জানাজা শুরু করেন, বৃষ্টি শুরু হয়ে যাচ্ছে !

বক্তারা উদ্বিগ্ন চোখে সমবেতদের দিকে তাকাতে লাগলো।

সমস্বরে নির্দেশমূলক কথা বলা চলছে। এটাই স্বাভাবিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো জোরালো ভাবে বৃষ্টি পড়া শুরু হবে।

বক্তারা দ্রæতপায়ে যেয়ে প্রথম সারিতে জোরপূর্বক স্থান করে নেয়ে শুরু করলো।

বৃষ্টির আগমন বার্তা তাদের প্রত্যেকের পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিলো। তাদের মনের সাজানো কথাগুলো বলা হলো না !

তারা প্রত্যেকেই বিরক্ত চোখে আকাশের দিকে তাকাতে লাগলো।

জাহিদুল কবির রিটন, লেখক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
close
close