ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:১৩

প্রিন্ট

বঙ্গতাজের শিক্ষক ভক্তির অনন্য কাহিনী

বঙ্গতাজের শিক্ষক ভক্তির অনন্য কাহিনী
আলী আকবর

তখন ১৯৭৬ সাল। সবে মাত্র প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কাপাসিয়ার ঈদগা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বাড়ি থেকে দুই মাইল দুরে বিদ্যালয়। তখনও স্কুলব্যাগের প্রচলন হয়নি। রুমালে একগাদা বই বেঁধে বগলে চেপে হৈ হুল্লোড় করে সহপাঠীদের সঙ্গে বিদ্যালয়ে রওনা দিতাম। পথে ধলেগর খাল, এর কুল ঘেঁষে বিদ্যালয়ের রাস্তা। কিছুদূর গেলেই রাস্তার ধারে একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার সময় প্রায়ই লক্ষ করতাম এক বৃদ্ধবয়সী গুরু-গম্ভীর ব্যক্তি ওই বাড়ির দক্ষিণের ডাকবাংলোতে বসে খবরের কাগজ কিংবা বই পড়ছেন। আবার কখনও বা আমাদের বিদ্যালয় যাওয়ার দৃশ্য দেখছেন।

ধবধবে সাদা পাজ্ঞাবি পাজামা পরা ওই বয়োবৃদ্ধ ভদ্রলোকের হাতে থাকত একটি লাঠি যা তার চলার পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করতো। একটি ছাতাও ব্যবহার করতেন সব সময়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে লাঠিটির মত ছাতাটিও ছিল তার নিত্য দিনের সঙ্গী।

গাঁয়ের মেঠো পথ দিয়ে যখন তিনি হাঁটতেন, অসংখ্য আবালবৃদ্ধবনিতা তাকে সালাম দিতেন। কেউবা নতজানু হয়ে পাঁ ছুঁয়ে সালাম করতেন। পরম স্নেহে তাদের তিনি বুকে জড়িয়ে ধরতেন। তার প্রতি লোকজনের এ অকৃত্রিম ভক্তি আর শ্রদ্ধাঞ্জলির এ দৃশ্য শৈশবে আমার কচি মনকেও আপ্লুত করতো। ভাবতাম, বড় হয়ে আমিও যদি উনার মতো এমন সন্মানের পাত্র হতে পারতাম!

প্রিয় পাঠক! হা, বলছিলাম মানুষ গড়ার কারিগর এক আদর্শ শিক্ষক মফিজ স্যারের কথা। তিনি ছিলেন কাপাসিয়ার গর্ব বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের স্কুলশিক্ষক। বর্তমান কাপাসিয়া পাইলট স্কুল ছিল তৎকালীন এম.ই স্কুল। মফিজ স্যার ছিলেন উক্ত মাইনর স্কুলের শিক্ষক।

বাবা মৌলভী ইয়াসিন খানের কাছ থেকে আরবি শেখার পর শৈশবে তাজউদ্দিন ভর্তি হন বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ভূলেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর ভর্তি হন কাপাসিয়া মাইনর স্কুলে। ওই স্কুলে পড়ার সময় নিজের অসাধারণ মেধা আর প্রতিভার গুণে শিক্ষকদের নজর কাড়েন। বাদ পড়েননি মফিজ স্যারও। শ্রেণিশিক্ষক হিসেবে একটু বেশি আদর-স্নেহ করতেন স্কুল পড়ুয়া সে দিনের শিশু তাজউদ্দিনকে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার কাছে যেদিন শুনলাম মফিজ স্যার বঙ্গতাজের শিক্ষক, সে দিন থেকে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাভক্তি আরো বেড়ে গেল। তার সান্নিধ্যে যাওয়ার ইচ্ছে হলো।

একদিন বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। জানুয়ারী মাস। শীতের সকাল। লক্ষ্য করলাম, তিনি পড়ার ঘরের সামনে রোদে চেয়ারে বসে পড়ছেন। সামনে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম। পরম স্নেহে তিনি আমাকে পাশে রাখা একটি জলচৌকিতে বসতে দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তার এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘মানুষ বুড়ো হলে যাকে কাছে পায় তার কাছেই অতীত স্মৃতি সুধায়।’ আমার ক্ষেত্রেও তাই হল। তিনি শুরু করলেন তার জীবনের কত স্মৃতি, না কত সাফল্য গাঁথা! কত অতীত কথা! আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। অনেক কথার পর তিনি আমাকে শোনালেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাহিনী, যা হয়তো অনেকের অজানা।

তিনি বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনো এক কাজে ঢাকা গেলাম। উদ্দেশ্য তাজউদ্দিন এর সঙ্গে দেখা করা। তাজউদ্দিন তখন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রী। বাসায় গিয়ে শুনলাম তাজউদ্দিন বাসায় নেই, পুরাতন সংসদ ভবনে এক বিশেষ মিটিংয়ে আছেন। আমি রিক্সায় করে সেখানে গেলাম। কিন্তু সংসদ ভবনের কর্তব্যরত পুলিশ কিছুতেই আমাকে ভিতরে ঢুকতে দেবে না। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষন পর তাদের( পুলিশের) একজনকে কাছে ডেকে এনে চুপিসারে বললাম , “আমি তাজউদ্দিনের শিক্ষক। বিশেষ প্রয়োজনে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি এসেছি অনন্ত এ খবরটা তার কাছে পৌছানোর ব্যবস্হা করুন।” পুলিশ আমার কথা শুনল। যে পুলিশ আমাকে ঢুকতে দেয়নি সেই পুলিশই কিছুক্ষণ পর আমাকে স্যালুট দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেল।’

‘সংসদ ভবনের কক্ষে ঢুকে দেখলাম মিটিং চলছে। আমাকে দেখামাত্র আমার স্নেহের তাজউদ্দিন তার আসন ছেড়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো। শ্রদ্ধাবনত হয়ে আমার পাঁ ছুঁয়ে সালাম করলো। এ দৃশ্য দেখে অন্যান্য সবাই দাঁড়িয়ে গেল। আমি সেই দিনের শিক্ষকভক্তির সেই স্মৃতি জীবনে কখনো ভুলতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল, সেই দিন আমার সিনা (বুক) সাত আসমান তক গর্বে ভরে গিয়েছিলো। মনে হয়েছিল শিক্ষক হয়ে আজ আমি সত্যই ধন্য। আমার সহস্র ভালোবাসা আর স্নেহের পরশ শুধু তাজউদ্দিনের জন্য, যে আমার মাধ্যমে শিক্ষক মর্যাদার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।’

লক্ষ্য করলাম, অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে স্যার অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছেন। এরপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন- ‘ওই কবিতার লাইনগুলো কি তোমার মুখস্ত আছে?’

আমি বললাম, কোনটি স্যার ?

মফিজ স্যার তখন নিজেই আবৃত্তি করে শুনালেন---

‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষা গুরুর শির

সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’

লেখকঃ শিক্ষক, কলামিস্ট ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
close
close