ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ৫৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০১৯, ২২:৩১

প্রিন্ট

নাস্তিক বিজ্ঞানীর গল্প ও মিন্নির অসাধুতা

নাস্তিক বিজ্ঞানীর গল্প ও মিন্নির অসাধুতা
জব্বার আল নাঈম

বিদেশ থেকে একজন বিজ্ঞানী বাংলাদেশে আসবেন বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য দিতে। কথা মতে দিন, তারিখ ঠিক করে বিমানের ওঠেন তিনি। মনে অনেক কৌতূহল, একটা দেশে প্রথম যাচ্ছে ভ্রমণটা খুবই উপভোগ্য করতে হবে। বিভিন্ন জনের কাছে শুনেছেন বাংলাদেশের মানুষ অতিথিপরায়ন। ভোজনপ্রিয় এবং আড্ডাবাজ। আড্ডাবাজরা বেশিরভাগ সময়ই প্রাণখোলা স্বভাবের হয়। সহজেই অন্যের সঙ্গে মিশতে পারে। বিজ্ঞানীর চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক। নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকার আকাশে বিমান পৌঁছে। ভালোই হলো বিকালের শহরটা ঘুরে-ফিরে দেখা যাবে। কিন্তু বিমান তখনও নামছে না। সমস্যা কোথায়? জানতে পারে অতিরিক্ত জটলার কারণে বিমান ল্যান্ড করার সুযোগ হচ্ছিল না। নির্ধারিত সময়ের অনেক পর বিমান ল্যান্ড করে।

সমস্যা যেন কমছেই না। ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে আরো সমস্যার মুখোমুখি হয়। ব্যাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিস হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানীর মেজাজ খারাপ হয়! বাইরে মাত্রাতিরিক্ত গরম। গরম বাতাসে প্রবলভাবে ধূলাবালি ভাসছে। তাড়াতাড়ি সিএনজি বা প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে হোটেলে পৌঁছা দরকার। তাহলেই শান্তি। গাড়ি খুঁজতে গিয়ে তো আরো অবাক! অনেক ড্রাইভার। বিজ্ঞানী কিছুটা অবাক হয়ে সামনের গাড়িতে উঠে বসে। এখানেও সমস্যা গাড়ি চলে না। রাস্তায় জ্যাম! কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। সন্ধ্যার আগে হোটেলে পৌঁছা খুবই কঠিন। ততক্ষণে বাংলাদেশ নিয়ে বিজ্ঞানীর যত আগ্রহ ছিল সব ভাটা। সন্ধ্যার পর কোনোরকমভাবে হোটেলে পৌঁছে। ততক্ষণে মেজাজ আরো খারাপ হয়। হোটেলে বিদ্যুৎ নেই। এসিরও সমস্যা। পানি নেই। ফ্রেশ হতে পারছে না। কোনোরকম পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন সমস্যা গ্যাস নেই। এখানে কেবল নেই আর নেই। কষ্টে রাতটা পার করেন তিনি। সকালে বিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য দেয়ার আগেই সংবাদ সম্মেলন করেন। সাংবাদিকদের কোনো কথা বলতে না দিয়েই তিনি বলেন, আমার কথা শোনেন, আমি একজন নাস্তিক। ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। এখানে আসার পর সেই ভুল ভেঙেছে। নিশ্চয়ই পৃথিবীতে একজন ঈশ্বর আছেন। না হয় এত এত সমস্যাগ্রস্ত একটি দেশ চলতে পারে না। ঈশ্বর নিজে দায়িত্ব নিয়েই পৃথিবী পরিচালনা করেন। না হয় এদেশ চলতে পারে না।

সকালের পত্রিকার উল্টালেই দেখা যায়, বাবার হাতে মেয়ে খুন, পরকীয়ার কারণে স্ত্রীকে খুন। জোরপূর্বক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে বাবা। শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্চিত। নুসরাতের গায়ে আগুন; উদাসীন প্রশাসন। ছেলেধরা সন্দেহে সারা দেশে ১৭ জনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইয়াবা সম্রাটরা। দুধ, চিনি, লবণ, হলুদ, মরিচ সব কিছুতেই ভেজাল। কারো প্রতি কারো বিশ্বাস নেই। আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা নেই। কেবল নেই আর নেই। ফলে সম্পর্কটা হয়ে গেছে আরো হিংসাত্মক। চারপাশের পরিবেশ যখন দুঃখের রংয়ে আরো মলিন ঠিক তখনই ঘটে নতুন নতুন ঘটনা। স্ত্রীর সামনেই প্রকাশ্যে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক দল সন্ত্রাসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। সবাই দেখতে পায় বরগুনায় ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনা। স্ত্রী তার স্বামীকে বাঁচাতে প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের বিপক্ষে। অস্ত্র সন্ত্রাসের বিপক্ষে মেয়েটি একা কূলিয়ে স্বামীকে শেষ রক্ষা করতে পারেনি। রিফাত শরীফ মারা যায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ মিন্নিকে প্রধান সাক্ষী করে মামলা দায়ের করেন। সেখানে ১২ জন আসামির মধ্যে নয়ন বন্ড নাম্বার ওয়ান। দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজি, তিন রিশান ফরাজি, চার চন্দন। নয়ন ও রিফাতের বিষয়ে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগী। এলাকায় মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের যুক্ত রিফাত ফরাজী।

স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের নাম রিফাত ফরাজী। রিফাতের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দেখা যায়, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে ফরাজী। এসব কারণে কয়েকবার গ্রেপ্তার হলেও রিফাত ফরাজীর প্রভাবশালী আত্মীয়ের প্রভাবে স্বল্প সময়েই মুক্তি পেয়ে যেত।

রিফাত ফরাজীর সঙ্গে থেকে নয়ন নিজেকে আরো ভয়ংকর করে তোলে। ২০১৭ সালের ৫ই মার্চ রাত ১১টার দিকে নয়ন বন্ডের বাসায় অভিযান চালায় বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। উদ্ধার করে বিপুল পরিমাণ মাদক, দুটি দেশিয় অস্ত্র। গ্রেফতার হয় এক সহযোগীসহ নয়ন বন্ড। ফলে তাদের নামে মামলা থাকা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু মামলা থাকলে কী হবে? তাদের জন্য রয়েছে জেলা পরিষদের দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালী আত্মীয়। কারণ, এই নয়ন আর রিফাত ফরাজী ছিল উক্ত ব্যক্তির ডান হাত, বাম হাত ছিল। তার সব অবৈধ ও অন্যায় কাজগুলো হমকি ধমকি দিয়েই করে যেত নয়ন ফরাজীরা। এর কারণ রিফাত ও রিশান ফরাজি ওই ক্ষমতাশালীর ভায়রা ভাইয়ের ছেলে হওয়ার সুবাধে নয়নসহ একই বাসায় থাকতো।

কোনো ধরনের ক্রসফায়ারেই আমার সমর্থন নেই। নয়নকে যখন ক্রসফায়ার দেয়া হল তখন আমার ভেতর ভেতরে একটা সন্দেহ গুটি বাধতে শুরু করে। এর মাধ্যমে সত্যিকারের অপরাধী কিংবা ইন্দনদাতারা পার পেয়ে গেল। যদিও ক্রসফায়ারে অনেকেই খুশি হয়েছে। বরগুনার বেশ কয়েকটি স্থানে মিষ্টিও বিতরণ করা হয়। কিন্তু বিচার বিভাগের প্রতি আমার প্রশ্ন থেকেই যাবে।

ততদিনে সোস্যাল মিডিয়াতে আরেকটি ভিডিও ভাইরাল। মিন্নি-রিফাত কলেজের গেট দিয়ে হেঁটে বের হয়ে আসে। তার সেই হাঁটায় রহস্য লুকিয়ে আছে। সারাদেশের মানুষ মিন্নির দিকে আঙুল তোলে। এই ঘটনার সঙ্গে মিন্নি জড়িত। পরের দিন মিন্নির শ্বশুর সংবাদ সম্মেলন করে জানান, রিফাত হত্যায় পূত্রবধু জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। নয়ন বন্ড এবং রিফাত শরীফ দু জনেই মিন্নির স্বামী। প্রশাসন তথা সারা বাংলার মানুষ নড়েচড়ে বসে। অনেক শুনেছি এক স্বামীর দুই স্ত্রী। মিন্নির কল্যানে শুনছি এক স্ত্রীর দুই স্বামী! দু’জনের সঙ্গেই সম্পর্ক কন্টিনিউ করেছে সে। নয়নকে বিয়ের পর তালাক না দিয়েই রিফাত শরীফকে বিয়ে করে তথ্য গোপন করেছে। যা অপরাধের শামিল। সেই অপরাধ বগলে নিয়ে দুজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কও বজায় রেখেছে মেয়েটি। ফলাফল দাঁড়াল দ্বিতীয় স্বামী প্রথম স্বামীর হাতে খুন! এই খুনের দায় ভার কে নেবে? ইন্দনদাতা। নাকি আশ্রয়দাতা? এই সময়ে আমাদের ভরসার একটি জায়গা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এটার নায্য বিচার করার জন্য বিচার বিভাগকে সহযোগিতা করবেন বলে আমার বিশ্বাস। ঘটনা এখানেই থেমে যেত পারত। মিন্নি গ্রেফতার। রিফাত ফরাজি, রিশান ফরাজি, চন্দন পুলিশের হাতে গ্রেফতার। মামলা চলবে। রায় দেবে আদালত।

আমি লিখতে বসেছি নয়নের মায়ের কিছু প্রশ্নকে সামনে রেখে। নয়ন বন্ডের মায়ের প্রশ্ন নয়নকে ১২ লাখ টাকা কে দিয়েছিল? কিসের জন্য এত টাকা? নয়ন বন্ডের মায়ের আরো কিছু প্রশ্ন ‘কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো।’

তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে দোষী, এটা আমি জানি। কিন্তু সে তো একদিনে নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। তাকে তৈরি করা হয়েছে ক্ষমতাবানদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। অপব্যবহার করার জন্য নয়ন বন্ড হিসেবে তৈরি করেছে।’

এখানে অনেক প্রশ্ন অনেক উত্তর থাকে। নয়ন থাকতো রিফাত ও রিশান ফরাজির সঙ্গে তাদের খালুর বাসায়। সেই খালু আবার ক্ষমতাশীল দলের স্থানীয় রাজনীতিবিদ। যে ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নমিনেশনের জন্য জোর চেষ্টা করেছে। স্থানীয় সাংসদকে কৌশলে অবাঞ্চিত করেছে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের সঙ্গে হাত মিলিয়। এত কিছু করেও সাংসদের জনসমর্থনের কাছে ব্যর্থ হয়েছে চক্রান্তকারীরা। ফলে স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু’র বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভ রয়েই গেছে তাদের। নমিনেশন বঞ্চিতগ্রুফের একজন আবার যৌথভাবে ২০১৮ সংসদ নির্বাচনে বর্তমান এমপির সঙ্গে নমিনেশন পেয়েছিলেন। যদিও কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সৈনিক ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু’র উপর ভরসা রাখে।

শম্ভু’র চাওয়া মিলে মিশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বরগুনাকে এগিয়ে নেয়া। সম্প্রীতি বজায় রেখে কর্ম সম্পাদন করা। বাস্তবে শম্ভুকে সেটা করতে দেয়া হচ্ছে না। এর কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। ক্ষমতা। অর্থ। প্রভাব। এসব সবাই চায়। যদিও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের চাওয়া জনহিতকর একজন মানুষ। যে বরগুনার মানুষের পাশে সব সময় থাকবে। এসব ইমেজ সঙ্কটে ফেলতে স্থানীয় তরুণ নেতারা অবৈধ পথে আয়ের অর্থ দিয়ে একের পর এক অপ্রচার চালায়। কাজে লাগায় উঠতি তরুণদের। ফলে সহজেই বিপদগামী হয়ে যায় তারা। জড়িয়ে পড়ে অসামাজিক বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে।

পিতৃপ্রধান পরিবারে সংসারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বাবা। সন্তান যখনই দোষ করবে এর দায়ভার বাবার উপর বর্তায়। কিন্তু বাবাকে যখন আমরা বিপদে ফেলে দেই তখন সন্তানদের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। এটা মাথায় রেখে অগ্রগতি হলে বিপদ সীমা সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। অথচ উল্টো স্রোতে তাল মিলিয়ে সুবিধাভোগী শিহাবগংরা বলছে, শম্ভু হটাও? নাকি ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত? হতে পারে দুটোই। এজন্যই নয়ন, রিফাত ফরাজি, রিশান ফরাজি ও চন্দনদের দিয়ে বরগুনাকে সন্ত্রাসের অভয়ারন্য বানিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে বিপদে ফেলতে চাইছে তারা। এখন আমাদের জানতে চাওয়া নয়ন বন্ডের মায়ের সুরে সুর মিলিয়ে, ‘কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো।’ আমাদের সর্বশেষ আশ্রয় প্রশাসন। প্রশাসনের প্রতি বিনীত অনুরোধ- চক্রান্তকারীদের মূল উৎপাটন না করলে এরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বইরে থেকে সন্ত্রাসীদের উৎসাহ দিয়ে যাবে। বাড়তে থাকবে অপরাধ। স্বামী হারাবে মিন্নি। ক্রসফায়ারে যাবে নয়ন। আড়ালে বসে হাসবে এদের আশ্রয়দাতারা। বিপদে বাড়বে নির্বাচিত নেতাদের। আমরা চাই, সঠিক বিচার। অপরাধী যেন অপরাধ করে পার পেয়ে না যায়। আর নিরাপরাধ সাজা ভোগ করুক।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত