ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ১১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ১০:১৩

প্রিন্ট

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -২৯)

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -২৯)
শাহজাহান সরদার

[দেশের জনপ্রিয় দুটি পত্রিকার (যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন) জন্মের পেছনের ইতিহাস, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া বিব্রতকর বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ, হস্তক্ষেপ, পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা দিয়ে অন্য একটি জনপ্রিয় পত্রিকা থেকে নিয়ে এসে পত্রিকা না বের করে হাতজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেয়া, পত্রিকা প্রকাশের পর কোন কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু দিনের মধ্যেই ছাপা সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে লাভ খোঁজা, ইচ্ছেমত সাংবাদিক-কর্মচারি ছাঁটাই করা সহ পত্রিকার অন্দর মহলের খবরা-খবর, রাজনৈতিক মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া কিছু রিপোর্ট, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির কিছু ঘটনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আমার এ বই ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’। জানতে পারবেন সংবাদপত্র জগতের অনেক অজানা ঘটনা, নেপথ্যের খবর।]

(পর্ব -২৯)

তার ক্ষোভের মধ্যেই আমরা পত্রিকা নিয়ে টুকটাক কথা বলি। তিনি জানতে চান, শামীম সাহেব সিরিয়াস কিনা। বুঝে-শুনে আসছেন তো ইত্যাদি। আমি তার কোন কথার জবাব দেইনি। শুনে গেছি। আমার কিছু বলার ছিল না। কারণ এতদিনে বুঝে গেছি আমি বিপদগ্রস্ত। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মধ্যাহ্নভোজ না করেই অধ্যাপক সাহেব চলে যান। অধ্যাপক সাহেব বিদায় নিতে না নিতেই শামীম সাহেব ফোন করলেন। জানতে চাইলেন অধ্যাপক কী বলেছেন। আলোচনা হয়েছে কিনা। আমি বলি তেমন কোন আলোচনা হয়নি। এই অধ্যাপক সংবাদপত্রে কলাম লিখে থাকেন। জনপ্রিয় কলামিস্ট। পত্রিকা বের হলে হয়তো আমাদের পত্রিকায় লিখতে বলব। আমার মনে হলো শামীম সাহেব অফিসেরই কোথাও ছিলেন। হয়তো কোন কারণে অধ্যাপকের মুখোমুখি হতে চাননি। এ কারণেই আমার কাছে পাঠিয়েছেন। তার এ-ধরনের অভ্যাস আমি পরে অনেক দেখেছি। আমার যোগদানের পাঁচ মাস কেটে গেলো। অথচ পত্রিকা প্রকাশের দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। আন্ডারগ্রাউন্ডে সপ্তাহে দু’দিন ডামি হচ্ছে। ডিক্লারেশন রক্ষার জন্য। প্রেস আনারও কোন উদ্যোগ নেই। আমি অফিস ডেকোরেশনের কাজ শুরু করতে বলি।

তাগিদ দিলে দু’একদিন পর এক আর্কিটেক্ট এসে মাপজোখ করে চলে যান। আর খবর নেই। বিভিন্ন স্থান থেকে এজেন্টরা, ঢাকার হকার্স সমিতির নেতারা যোগাযোগ করেন। সাংবাদিকরাও যোগাযোগ করেন। বন্ধু-বান্ধব খোঁজখবর নেন। কাউকে সঠিক জবাব দিতে পারছি না। এদিকে আমি মোটামুটি একটি টিম করে রাখি। আশ্বস্ত করি শীঘ্রই হবে। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের কাজ এগুচ্ছে না। আমি সকাল-বিকাল অফিস করি। আর কেউ নেই। পাশে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ও প্রশাসনের কয়েকজন বসেন। এভাবেই শামীম সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগও কমে যায়। আগে দু’একদিন পর পর কথা হতো। এখন সপ্তাহে একবার বা তার চাইতে কম। এক মহাঅস্বস্তিতে দিন চলতে থাকে। স্ত্রী-সন্তানরা উদ্বিগ্ন। ছয় মাসের মাথায় আমি তার অফিসে গিয়ে জানতে চাই আপনি কী করতে চান আমাকে স্পষ্ট বলুন। পত্রিকা বের করবেন কি করবেন না জানান। আমার বক্তব্যে তাকে বিব্রত মনে হলো। তিনি মনে করেছেন আমি চুপচাপ বসে থাকব। পরিস্থিতি সামলে বললেন, আমি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির কাজ শুরু করেছি। এটা শেষ করেই পত্রিকা শুরু করব। কয়েক মাসের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। আমি বললাম, আগামী ৬ মাস পর পত্রিকা বের করলেও এখন প্রেসের জন্য এলসি খুলতে হবে। অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করতে হবে। তিনি বললেন, শীঘ্রই শুরু করব। এরই মধ্যে আমি শুনতে থাকি, প্রতিদিনই তার অফিসে কোন না কোন সাংবাদিক আসছেন। কথা বলছেন। তিনিই ডেকে আনছেন। সাংবাদিকতা বিভাগের সেই অধ্যাপক মাঝে মধ্যে আমার কাছে আসেন। তার সঙ্গে কথা বলে মনে হয় পত্রিকার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী নন। কেননা তার সঙ্গে প্রতিদিনই শামীম সাহেবের সাক্ষাৎ হত। এতে হয়তো তিনি টের পেয়ে থাকতে পারেন।

ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যরা অনেকেই বলতে থাকেন, শামীম সাহেব পত্রিকা আসলে বের করবে না। তার এমন একধরনের স্বভাব, ভাল কিছু কোথাও দেখলে লাফিয়ে পড়েন। তেমন কিছু করার অপচেষ্টা! কিন্তু করতে পারেন না। পিছিয়ে যান। মাঝে কিছু লোকের ক্ষতি করেন। আমারও এমন অবস্থা হতে যাচ্ছে। আমি লা-জওয়াব। ততক্ষণে তো আমিও সব বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কিছু করার নেই। হতাশা বাড়ছেই। মাঝে মধ্যে সকালে আমি সোনারগাঁ হোটেলের লবিতে বসি। এটা আমার দীর্ঘকালের অভ্যাস। সেই ইত্তেফাকে থেকে। ইত্তেফাকের মালিক মঞ্জু সাহেব বলতেন, আড্ডা মারবা তো ভাল জায়গায় মারবা। সেই থেকেই মাঝে মধ্যেই সকালে সোনারগাঁর লবির আড্ডায়। এইসব আড্ডায় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আমলাসহ বিভিন্ন পেশার লোক আসত। দেশ, সমাজ, রাজনীতি নিয়েই কথা হতো। একদিন এমনি এক আড্ডায় আমার স্নেহভাজন একজন জিজ্ঞেস করলেন, আপনার পত্রিকা কবে আসছে? তিনি আগে সাংবাদিকতা করেছেন। খুবই ভাল রিপোর্টার ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় লেখালেখির কারণে গ্রেফতারও হয়েছিলেন। এখন একটি বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থার কর্ণধার। ব্যবসা ভাল। আমার জানা মতে তার সাথেও শামীম সাহেবের ভাল সম্পর্ক। কারণে-অকারণে তাকেও অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়ে আপ্যায়ন করেন। কেননা তার সঙ্গে মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, আমলাদের যোগাযোগ ভাল। তার প্রশ্ন শুনে আমি উত্তর এভাবে দিলাম, আমার চাইতে তো তুমিই ভাল জানো। আমার খুবই স্নেহাস্পদ ছোট ভাইয়ের মত। আমি তাকে তুমি বলেই সম্বোধন করি। তোমার সাথে ভাল যোগাযোগ আছে। তখন তিনি বললেন, উনি কি কাগজ বের করবেন? সেই সাহস আছে, আপনাকে বিপদে ফেলে কিনা দেখেন? তখন তিনি বললেন, সেই বোমা ফাটানো গল্প। ডা. এ এম শামীমের প্রতারণার কাহিনী। কীভাবে আমাকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হলো।

বিজ্ঞাপনী সংস্থার সেই কর্ণধারকে শামীম সাহেব একদিন অফিসে আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি গেলেন, শামীম সাহেব বললেন আমার কথা। আমাকে সম্পাদক করে পত্রিকা বের করতে চান। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে আনা কীভাবে সম্ভব? জানতে চান। তিনি বললেন, আমি কথা বলে দেখতে পারি। শামীম সাহেব বললেন, না আমি বুদ্ধি করেছি। কী, জানতে চাইলে বলেন, শাহ আলম সাহেবের ঘনিষ্ঠ অথবা বসুন্ধরার প্রভাবশালী কাউকে ফোন করে জানাতে হবে শাহজাহান সাহেব বাংলাদেশ প্রতিদিন ছেড়ে দিচ্ছেন। ল্যাবএইডের সঙ্গে কথা বলছেন। এমন কে আছেন তার কাছে জানতে চান। তিনি কারও নাম বলেছিলেন কি না জানি না। তবে বসুন্ধরা গ্রুপের এক উপদেষ্টাকে ল্যাবএইডের পক্ষ থেকে কেউ একজন ফোন করে এমনভাবে জানান যে, আপনারা কি খবর রাখেন, আপনাদের সম্পাদক অন্য পত্রিকায় চলে যাচ্ছেন। এর কয়েক মাস আগে আবেদ খান কালের কণ্ঠের সম্পাদক থেকে পদত্যাগ করেন। এখন বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক পদত্যাগ করবেন। এমনভাবে কথাগুলো তাকে বলা হলো যাতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে শাহ আলম সাহেবকে জানান। অপর প্রান্ত থেকে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা আমাকে জানানো হয়নি। আমার জানার ইচ্ছাও ছিল না। মনে হলো আকাশ ভেঙে আমার মাথার ওপর পড়েছে। আমাকে বলা হলো, শাহ আলম সাহেব নিজে ফোন করেছিলেন। এখন কিনা শুনি বসুন্ধরা গ্রুপের এক উপদেষ্টাকে শামীম সাহেব আরেকজনকে দিয়ে ফোন করিয়েছেন। মানুষ এতটা নিচে নামতে পারে। এতটা অসত্য বলতে পারে আমার আগে ধারণা ছিল না। শামীম সাহেব যা করেছেন তা সকল অসত্যের যেন রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন। একবার না দু’বার। এটাকে প্রতারণা ছাড়া আর কী বলা যায়। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। একথা শুনে আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। অন্যদিন কথা হবে বলে সোনারগাঁ থেকে বাসায় চলে আসি। সেদিন আর ল্যাবএইডের অফিসে যাইনি।

আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছি শামীম সাহেব পত্রিকা প্রকাশ করবেন না। রাতে ভেবেছি সকালে তাকে জিজ্ঞেস করব এভাবে অসত্য বললেন কেন? পরে আবার ভেবেছি, না এমন ধরনের লোকদের সঙ্গে কথা কম বলাই ভাল। এভাবে দিন যেতে থাকে। অফিস করছি বেতন-ভাতা পাচ্ছি। কাজ নেই। শামীম সাহেবও পত্রিকা নিয়ে কথা বলেন না। পক্ষকাল পর তিনি ফোন করে তার অফিসে যেতে বললেন। আমি গেলাম, তখন দুপুর। তিনি কথায় কথায় জানালেন, পত্রিকার অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে তার কথা হচ্ছে। তাদের কারো কারো নাম উল্লেখ করে বললেন, ভাই এরা কেমন মানুষ? কি বলে না বলে! সুযোগ-সুবিধা চায়। আমি জানতে চাইলাম কারা। কিন্তু এদের নাম না বলে জানালেন, আপনি চেনেন। আমি বললাম তাদের সাথে কী এমন জরুরি বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন? কী কথা বলেন? তিনি বললেন, না তারাই বসতে চেয়েছে। তাই বসা আর কি। আমি এ বিষয়ে কিছু বললাম না। তার এসব আবোল-তাবোল কথা শুনে আমি একটু কঠিন ভাবেই বললাম, এসব না বলে সোজাসুজি জানান, পত্রিকা বের করবেন কিনা? এভাবে আর বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

চলবে...

বইটি পড়তে হলে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতিবার চোখ রাখুন ‘বাংলাদেশ জার্নাল’ অনলাইনে।

বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন

আজিজ সুপার মার্কেট (তৃতীয় তলা), ঢাকা।

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত