ঢাকা, শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ আপডেট : ৪ মিনিট আগে

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২০, ১০:৪৭

প্রিন্ট

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -৩২)

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -৩২)

শাহজাহান সরদার

[দেশের জনপ্রিয় দুটি পত্রিকার (যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন) জন্মের পেছনের ইতিহাস, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া বিব্রতকর বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ, হস্তক্ষেপ, পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা দিয়ে অন্য একটি জনপ্রিয় পত্রিকা থেকে নিয়ে এসে পত্রিকা না বের করে হাতজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেয়া, পত্রিকা প্রকাশের পর কোন কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু দিনের মধ্যেই ছাপা সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে লাভ খোঁজা, ইচ্ছেমত সাংবাদিক-কর্মচারি ছাঁটাই করা সহ পত্রিকার অন্দর মহলের খবরা-খবর, রাজনৈতিক মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া কিছু রিপোর্ট, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির কিছু ঘটনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আমার এ বই ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’। জানতে পারবেন সংবাদপত্র জগতের অনেক অজানা ঘটনা, নেপথ্যের খবর।]

(পর্ব -৩২)

পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার আমরা প্রেসে গেলাম। সাইফুল সাহেব তার সঙ্গীদের নিয়ে চলে আসেন। আমি আর উপদেষ্টা হারুন সাহেব সকাল পর্যন্ত থেকে ছাপার ব্যবস্থা করি। যাতে প্রথম দিন শহরের অনেক জায়গায় দেরিতে হলেও কাগজ যায়। নতুন কাগজ বলে হকাররা পরেও আমাদের পত্রিকা গ্রহণ করে। অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মানবকণ্ঠ এভাবেই বাজারে এলো। সমাধিককাল পর অবশ্য ইত্তেফাক প্রেস থেকে মানবকণ্ঠ তেজগাঁও আরেক প্রেসে থেকে ছাপা শুরু হয়। সেখানকার ভোগান্তির কাহিনী আরও লম্বা। তা আর বলতে চাই না।

প্রথম দিন থেকেই মানবকণ্ঠ ভাল চলছিল। বাজারে অল্পসময়েই বেশ সাড়া ফেলে। এখানে বলে রাখি, মানবকণ্ঠ প্রকাশের আগের দিন দুপুরে হঠাৎ করে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহ আলম সাহেব ফোন করেন। জানতে চাইলেন প্রস্তুতি কেমন ইত্যাদি। তিনি শুভ কামনা জানালেন। পত্রিকা বাজারজাতের একমাস পরও আবার ফোন করেন তিনি। আবারও চানতে চান কেমন চলছে। আমি বললাম ভাল। তিনি বললেন, আমরাও কিছুদিনের মধ্যে বিজ্ঞাপন দিব। তিনমাসের মধ্যেই পত্রিকার প্রচারসংখ্যা সোয়া লক্ষ দাঁড়াল। চাহিদা আরও বেশি। তবে সিলেট, খুলনাসহ কয়েকটি জেলায় বিক্রিতে সমস্যা দেখা দেয়। প্রেসের জন্য চাহিদামতো ছাপানো সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নিজস্ব প্রেসের জন্য এলসি খোলা হয়। আমরা তখন যে প্রেসে ছাপাচ্ছি তাতে নির্ধারিত সংখ্যা ছাপাতে সমস্যা হয়। কাগজ ছাপাতে দেরি এবং বাইরে পাঠাতে দেরি। এসব কারণে হকার্স সমিতি আর এজেন্টদের কথা শুনতে হচ্ছে। পত্রিকার চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিজ্ঞাপনও কমবেশি আসছে। সব মিলিয়ে বাজার ভাল। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো খোদ মালিকপক্ষ।

একরাতে আমি অফিসের কাজ শেষে বাসায় ফিরে এলে সার্কুলেশন বিভাগের এক কর্মকর্তার ফোন পাই। তিনি জানান, সোয়া লাক্ষ ছাপার অর্ডার ছিল। কিন্তু ডিএমডি সাহেব বলেছেন ৫০ হাজার ছাপাতে। এখন কী করা? কার কাগজ কমাব, কীভাবে কমাব ইত্যাদি। আমি বোকা বনে গেলাম। পত্রিকাটি উঠছে, এখন প্রচারে বাধা দেয়া হলে বাজার নষ্ট হয়ে যাবে। আমি সাইফুল সাহেবকে ফোন করে না পেয়ে সার্কুলেশনের কর্মকর্তাকে কিছু নির্দেশনা দিলাম। সারারাত ঘুমাতে পারিনি।

সকাল থেকেই ফোন আর ফোন। এজেন্ট, সমিতির নেতারা চাহিদা মোতাবেক কাগজ না পেয়ে জানতে চান কী হচ্ছে। কেউ কেউ অফিসে এসেও হাজির। আমি নিউজপ্রিন্ট সংকটের কথা বলে কোনরকমে পরিস্থিতি সামাল দিলাম। বিকালে ডিএমডি’র সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন কয়েকদিন এভাবেই চালান। কিছুদিন পর আবার বেশি ছাপানো যাবে। আমি বললাম একবার মার্কেট হারালে আর পাওয়া যাবে না। আমি যোগাযোগ করলাম এমডি নজরুল সাহেবের সঙ্গে। তিনি বললেন, কম ছাপাবেন কেন? চাহিদামতো ছাপান। আমি সাইফুলকে বলে দিচ্ছি। কিন্তু রাতে দেখলাম সেই একই। আবার সাইফুল সাহেব বলে দিয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, মানবকণ্ঠ প্রকাশের দুই মাসের মধ্যেই আশিয়ান সিটির জমি বিকিকিনির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

আমার জানা মতে, আশিয়ান গ্রুপের একটিমাত্র ব্যবসা। জমির ব্যবসা। তাদের প্রকল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অর্থসংকট দেখা দেয়। যে কারণে গ্রুপের সবকিছুতেই সংকট। আমি যোগদানের সময়ই তাদের বলেছিলাম পত্রিকার জন্য আলাদা একটি ফান্ড রাখার জন্য। তারা তা করেননি। এখন পড়েছেন সমস্যায়। পত্রিকার প্রচারসংখ্যা আর বৃদ্ধি সম্ভব হয় না। এজেন্ট, হকার, সমিতির নেতারা বিরক্ত। আমিও বিরক্ত। এত কম প্রচারের কাগজে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। নিজেকেই মনে মনে ধিক্কার জানাতে থাকি। এর মধ্যে আবার যে প্রেসে ছাপা হচ্ছে এর ছাপা-বিল বাকি থাকে। পাওনার জন্য প্রেসের লোক বসে থাকেন। মালিকপক্ষের খোঁজ পাওয়া যায় না। অনেক চেষ্টার পর কিছু টাকা আসে। প্রেসে এই টাকা পৌঁছার পর পত্রিকা ছাপা হয়। এমন সমস্যা তখন নিয়মিত। এরমধ্যে নিজস্ব প্রেস এলেও কালি, কাগজ ক্রয়ের টাকার সংকট প্রতিনিয়ত। আমাকে বারবার বলা হয় ধৈর্য ধরতে। শীঘ্রই সমাধান হয়ে যাবে। তখন সমস্যা হবে না। কিন্তু উচ্চ আদালতেও রায় তাদের বিপক্ষে যায়। এর মধ্যে আবার মালিকপক্ষ বিভিন্ন মামলায় মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে।

আইশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী খুঁজতে থাকে। আর তারা পত্রিকা অফিসকে নিরাপদ আশ্রয় করে এখানেই অবস্থান নিতে থাকেন। এরই মধ্যে কাগজের সার্কুলেশন আরও কিছু কমিয়ে দেন। স্বাভাবিকভাবেই আয় কমে যায়। আর আয় যেটুকু আসে মালিকরা নিয়ে অন্য কাজে ব্যয় করেন। সাংবাদিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাকি পড়তে থাকে। আমি পড়ি বিরাট সমস্যায়। কাগজের টাকা বাকি, বেতন বাকি তারপর চাহিদামতো কাগজ দেয়া যাচ্ছে না। মালিকদেরও কিছু বলা যাচ্ছে না। পালিয়ে বেড়ান। যে-কারণে পালিয়ে বেড়াতে হয় সে সমস্যা মালিকপক্ষেরই সৃষ্টি। যে কারণে তাদের অনেকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আর এ জন্য পরোক্ষ শাস্তি ভোগ করতে হয়। মাত্র কয়েক বছর আশিয়ান গ্রুপ জমি বিকিকিনিতে অনেক বড় হয়ে ওঠে। এখন যারা মালিক প্রথম দিকে তারা পূর্ণ মালিক ছিলেন না। পরে পূর্ণ মালিকানা পেয়েছেন। কিন্তু নিজেদের বেশি বড় ভাবতে গিয়ে আর বেশি উগ্রতার কারণে নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনেন। যার পরিণাম আজও তারা ভোগ করছেন।

এমনি বিশৃংখলার মধ্যেই হঠাৎ একদিন মানবকণ্ঠ অফিসে ভ্যান দিয়ে কিছু নিমার্ণসামগ্রী ও কাঠ নিয়ে আসা হয়। কয়েকজন লোক অফিসের ভিতরের ফাঁকা স্থান মাপজোখ করতে থাকেন। আমি এ-সময় বাইরে ছিলাম। অফিস থেকে ফোনে জানানো হয়। অফিসের কেউ জানে না এরা কারা। বাইরে থেকেই আমি ফোন করি এমডি নজরুল সাহেবের কাছে। তিনি বললেন আমি তো এ-বিষয়ে কিছু জানি না। ফোন করলাম ডিএমডি সাইফুল সাহেবের কাছে। তাকে পাওয়া গেল না। এরপর অফিসে জানতে চাইলাম বিষয়টি কী? যারা নিয়ে এসেছেন তাদের সাথে কথা বলে যেন জানায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারি অন্য এক নামসর্বস্ব পত্রিকার মালিক এগুলো পাঠিয়েছেন। তার লোকজন জানান, ওই পত্রিকার মালিক মানবকণ্ঠের অংশীদার। এ-অফিসে তার অফিসও আসবে। সাইনবোর্ড লাগানো হবে। আর ডেকোরেশন করা হবে নতুনভাবে। আমার মনে পড়ল কিছুদিনের আগের এক ঘটনা। ওই পত্রিকার মালিক-সম্পাদক আরব দেশের বাংলাদেশি দূতবাসের তৃতীয় শ্রেণীর এক কূটনীতিককে নিয়ে মানবকণ্ঠে আসেন। এ-সময় ডিএমডি সাইফুল সাহেবের সাথে ওই সম্পাদক আর কূটনীতিক অনেকক্ষণ আলোচনা করেন। পুরো অফিস ঘুরে দেখেন। এমনকি মাফজোখও করা হয়। পরদিন ওই পত্রিকায় কূটনীতিকের মানবকণ্ঠ অফিস-পরিদর্শনের খবর হয়। খবরে উল্লেখ করা হয়, ওই পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক মানবকণ্ঠের উপদেষ্টা। পত্রিকাটি বাজারে বেশি পাওয়া যেত না বলে আমরা দু’তিন দিন পর্যন্ত ঘটনা জানতাম না। কয়েকদিন পর জানলাম। পরে তাদের অফিস থেকে পত্রিকা আনালাম।

খবর পড়ে যোগাযোগ করলাম নজরুল সাহেবের সঙ্গে। তিনি বললেন, এ খবর সত্য নয়। আমি বললাম তাহলে প্রতিবাদ দিতে হবে। না হলে পত্রিকা নিজেরাই লিখুক এ তথ্য সঠিক নয়। নজরুল সাহেব বললেন, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। সাইফুল সাহেবকে বললাম তিনি না বোঝার ভান করে রইলেন। এই নিয়ে মানবকণ্ঠ অফিসে সাংবাদিক-কর্মচারীদের মধ্যে নানা গুঞ্জন। কিন্তু প্রতিবাদ গেল না। সংশোধনীও এলো না। একদিন নজরুল সাহেব বললেন, আমরা সমস্যায় আছি। তিনি আমাদের হয়ে কিছু কাজ করছেন ইত্যাদি। ওই মালিকের লোকেরাই যখন আবার কেউ কেউ অফিসে ডেকোরেশন সামগ্রী নিয়ে এসেছে আমার সন্দেহ হল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। আবার ফোন করলাম নজরুল সাহেবকে। জানালাম ঘটনা। তিনি এসব মালামাল অফিস থেকে বের করে দিতে বললেন। তাদের বলা হলো। কিন্তু তারা মালসামগ্রী নিলেন না। লোকজন যারা এসেছিলেন তারা চলে গেলেন। আর সাইফুল সাহেবকে ফোনে ধরা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তিনি সব ঘটনা জানেন। অফিসে নানা ধরনের কানাঘুষা, আশিয়ান গ্রুপেও কানাঘুষা। মানবকণ্ঠে বেতনভাতা বন্ধ। আমি বারবার মালিকদের কাছে জানতে চাই সমস্যা কী আমাদের বলেন। সাংবাদিক কর্মচারীদের বুঝিয়ে বলি। সবাই মিলে সমাধান করতে পারি কিনা দেখি।

নজরুল সাহেব বলেন, কোন সমস্যা নেই। আর সাইফুল সাহেব ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুনি এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন। আর ওই পত্রিকার মালিক-সম্পাদকের কাছে যেন আত্মসমর্পণ। তার সঙ্গে বিভিন্ন মহলের সু-সম্পর্ক আছে এমন ধারণায় তার পেছনে ঘুরছেন মালিকের ছোটভাই। ছোটভাই যা বলেন বড়ভাই তাই করছেন। মনে হয় সবকিছু জেনেও বড়ভাই ঘটনা লুকাচ্ছেন। আমি বারবার দুই ভাইয়ের কাছে ধর্না দিয়ে কোনো তথ্য জানতে না পেরে আসলে হতাশ হয়ে পড়ি। পত্রিকাটি ভাল চলছিল। অথচ মালিক পক্ষের কারণে আজ করুন অবস্থা। পত্রিকার আয়ও নিয়ে যায়। আর আমাদের বলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর হয় না। দিন-দিন সংকট বাড়তে থাকে। এরকম সংকটাপন্ন সময়ে একরাতে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশে কর্মরত আমার এক অনুজ সাংবাদিক ফোন করলেন। এক-দু’কথা বলেই তিনি ফোনটি দিলেন ঢাকা আহসানিয়া মিশনের সভাপতি কাজী রফিকুল আলমকে। তিনি নব প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক। এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না।

তিনি ফোনে বললেন, ‘ভাই আপনার কথা অনেক শুনি। আমার অফিসের সাংবাদিক-কর্মচারীরা আপনার খুব প্রশংসা করে। আপনার সঙ্গে কি কাল দেখা হতে পারে। জানতে চাইলাম কেন, কখন? তিনি বললেন একটি বিষয়ে আলোচনা করব। সময় দুপুর ১২টা হলে ভাল হয়। আমি বললাম সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে আমি অফিসে আসি। এর আগে বসতে হবে। আলোচনার পর ঠিক হলো পরদিন নয়, এর পর দিন সকাল ১০টায় আমরা আহসানিয়া মিশনের ধানমন্ডি অফিসে বসবো। আমার বাসা আর আহসানিয়া মিশন অফিস কাছাকাছি। এ প্রতিষ্ঠানের বেশ সুনাম শুনেছি। বিশেষ করে ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের সঙ্গে যৌথ প্রচারণা চোখে পড়েছে। তাছাড়া আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিও বেশ প্রতিষ্ঠিত। আরও সমাজসেবামূলক কাজ করে থাকে। কিন্তু আমার সাথে তাদের কারো আগে কোনো যোগাযোগ ছিল না। জানাশোনাও ছিলা না। কারো সাথে আগে কোনদিন কথাও হয়নি। এই প্রথম প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা। বুঝলাম আলোচনা মানে পত্রিকা নিয়েই আলোচনা করতে পারেন। কেননা যে অনুজ সাংবাদিক ফোনে ধরিয়ে দেন তিনি আগে দু’একবার আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। পত্রিকা ভালভাবে কর্তৃপক্ষ চালাতে চায়, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরাসরি আমাকে এ পত্রিকায় যোগদানের বিষয় তিনি আগে কিছু বলেননি।

নির্ধারিত দিনে ঠিক সময়ে আমি আহসানিয়া মিশন অফিসে পৌঁছি। এ অফিসে আগে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অভ্যর্থনা কেন্দ্রে তখনও কেউ আসেনি। আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। দেখি লিফটের কাছে একটি দানবাক্স। ক্যান্সার হাসপাতালের সহায়তার জন্য। আমি বাক্সে কিছু টাকা রাখলাম। তারপর সংগঠনের প্রেসিডেন্ট সাহেবের রুমে। তিনি তখনও পৌঁছেননি। পনেরো মিনিট পর এলেন। আমি তাকে আগে দেখেছি বলেও মনে হয় না। শুনেছি একসময় ওকালতি করতেন। সেখান থেকেই এই মিশনের সঙ্গে আছেন। দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট পদে আসীন। তার এক ভাই এবং ছেলেও মিশনের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। আরেক ভাই আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির কোষাধ্যক্ষ। আর তিনি চেয়ারম্যান। এক বোন মহিলা মিশনের সভাপতি। কথা শুরু করলেন তিনিই। কুশল বিনিময়। টুকটাক কিছু কথা। একপর্যায়ে আমি বললাম, আজ সময় কম অফিসে যেতে হবে। তখন তিনি বললেন, ভাই আপনি তো জানেন আমরা একটি পত্রিকা বের করেছি। এটি পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ লোক প্রয়োজন। আপনার কথা অনেক শুনেছি। আমাদের অফিসের অনেকেই বলছে। আপনি কি আমাদের সাথে আসবেন? জবাবে বললাম, আপনি তো সম্পাদক এবং প্রকাশক। দু’পদেই আপনি অধিষ্ঠিত। আমি এলে পদ কী হবে? এ প্রশ্ন তিনি একটু নড়েচড়ে বসলেন। এরপর বললেন, অসুবিধা হবে না। আপনাকে উপযুক্ত পদই দেয়া হবে। এবার আমি সরাসরি জানতে চাইলাম, আপনি কি সম্পাদক পদ ছাড়বেন। তিনি বললেন, প্রয়োজনে ছাড়ব। এরপর পত্রিকার বিভিন্ন বিষয়, প্রচার, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি নিয়ে কথা হলো। বিদায় নিয়ে আসার আগে আমি বললাম, দু’দিন পর আমি জানাব। তিনি বললেন, আপনার কোন অসুবিধা হবে না। আপনার মত করেই চালাবেন। সেদিন এ পর্যন্তই।

আমি চলে আসি অফিসে। মানবকণ্ঠের অবস্থা তখন খুবই খারাপ। কাজ করা আসলেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম দেখি নতুন জায়গায় গিয়ে ভাল কিছু করা যায় কিনা? কেননা রফিকুল আলম সাহেব বলেছেন তাদের ফান্ডের কোন সমস্যা নেই। ভাল পত্রিকা করবেন। এর জন্য চাই ভাল দক্ষ লোক। তার চেহারা দেখে এ-কথা বিশ্বাস না করার কোন কারণ ছিল না। দুপুরের দিকে আমি মানবকণ্ঠের তৎকালীন উপদেষ্টা হারুন সাহেবকে জানাই আমি পদত্যাগ করতে চাই। বিদ্যমান অবস্থায় মানবকন্ঠে কাজ করা সম্ভব নয়। তাকে অনুরোধ করি মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে যেন আমাকে জানান। আমি এখন মালিকপক্ষের সাথে কথা বলতে চাই না। কারণ, তারা আমাকে সহজে ছাড়তে চাইবে না। আশাবাদের কথা শোনাবেন। কিন্তু সত্যিকার সমস্যা বলবেন না। এমনিভাবে ঘোরাবে। আমি জানি উপদেষ্টা সাহেব নিজেও বিরক্ত। তিনিও তাদের মনোভাব বুঝতে পারছেন না। বেতন-ভাতার জন্য কর্মচারীদের কাছে, বিভিন্ন বকেয়া বিলের জন্য পাওনাদারের কাছে তিনিও আমার মতো প্রতিনিয়ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

উপদেষ্টা সাহেব বললেন, আসলেও আপনার মত লোক এখানে থেকে কোন লাভ হবে না। তাদের সমস্যাও শেষ হবে না। কাগজও ভাল হবে না। তিনি জানালেন আজই তিনি কথা বললেন। অবশ্য বিরক্তিকর এ পরিস্থিতিতে আগেই ডিএমডি সাইফুল সাহেবকে আমি দু’একবার বলেছিলাম কাগজ ভালভাবে না চালালে আমার থেকে লাভ নেই। তিনি বারবার অশ্বস্ত করেন। হয়তো ভাবেননি সত্যসত্যিই আমি চলে আসব। হারুন সাহেব পরদিন জানালেন। চলে যাওয়াই আপনার জন্য মঙ্গলজনক। আমি জানতে চাই কথা বলেছিলেন কিনা? তিনি বলেন, আমি জানিয়েছি। তারা কিছু বলেননি। পরদিন রাতে সাইফুল সাহেব এলে আবার তাকে জানাই এ অবস্থায় মানবকণ্ঠে আমার কাজ করা সম্ভব নয়। আমি পদত্যাগ করতে চাই। তিনি খুব গুরুত্ব দিলেন না। এর পরদিনই রফিকুল আলম সাহেবের সাথে আবার কথা বলতে হবে। সাইফুল সাহেবের সঙ্গে কথা শেষ করে নিজ রুমে আসার পর ফোন। আহছানিয়া মিশনের একজন পরের দিনের কর্মসূচির কথা মনে করিয়ে দেন। আমি বললাম, সকালেই আমি এসে যাব। কথামত পরদিন আবার আহসানিয়া মিশন।

আহসানিয়া মিশন প্রধান জানতে চান আমি রাজি কিনা? বললাম ঠিক আছে। বেতন-ভাতা নিয়ে কথা হলো। ঠিক হলো দু’একদিনের মধ্যে নিয়োগপত্র দেবেন। তিনি দেশের বাইরে যাবেন। আমিও বললাম নিয়োগপত্র পেলেই আমি অফিসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে আসব। সব ঠিক ঠাক। আমি উঠব এমন সময় তিনি বললেন, ভাই একটা কথা। আপনাকে একটু সেক্রিফাইস করতে হবে। আমি বললাম, কী? তিনি বললেন, বোর্ড মেম্বারদের সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা চায় আমিই সম্পাদক থাকি। সব কথা ঠিক হওয়ার পর একথা শুনে আমি হতভম্ব। আমি অফিসে জানিয়েছি। বাসায়ও বলেছি পদত্যাগের কথা। বেইজ্জতির সীমা রইলো না। আমি একটু ক্ষিপ্ত হয়েই বললাম, আপনি আগে তাদের সাথে কথা বলেননি, জানাননি? আমি আসব না। তিনি বিনয়ের সাথে বললেন, আপনি প্রধান সম্পাদক হোন। আমি সম্পাদক থাকি। আমি বললাম, আমাকে ভাবতে হবে। এই বলে আমি মানবকণ্ঠে চলে আসি। নিজের প্রতি নিজেরই রাগ হলো। রাতে আবার আলোকিত বাংলাদেশ থেকে আমার অনুজ সেই সাংবাদিকের ফোন। দু’কথা বলে দিলেন রফিকুল আলমকে। তিনি বললেন, আমি আজ চিন্তা করি আপনিও চিন্তা করেন। চলেন আগামীকাল আবার বসি। কথা বলি। সত্যি-সত্যিই আমি বেকায়দায় পড়ে যাই।

পরদিন আবার তার অফিসে গেলে তিনি অনেক কাকুতি-মিনতি করে বলেলেন, ভাই কাগজতো আপনিই চালাবেন। প্রধান সম্পাদক হিসাবে আপনার নাম আমার আগে ছাপা হবে। যেহেতু আমার নাম এখন সম্পাদক হিসাবে আছে তাই আপনার কাছে অনুরোধ। আমি সম্পাদক থাকি আপনি প্রধান সম্পাদক হোন। তার এ অনুরোধ আমি রক্ষা করি। তিনি জানালেন, কালই দেশের বাইরে যাচ্ছেন। যাওয়ার আগেই চুক্তিপত্র করতে চান। আমি বললাম ঠিক আছে আপনি কাগজপত্র তৈরি করে সই করে পাঠান। আমি দেখে নেব। বিকালের দিকে আলোকিত বাংলাদেশের প্রশাসন বিভাগ থেকে ফোন করে আমার পূর্ণ নাম-ঠিকানা ইত্যাদি নেয়া হয়। সন্ধায় আরেকজন খবর দেন চুক্তিপত্রটি আজ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা প্রেসিডেন্ট বাইরে আছেন। এখনও আসেননি আর কাল সকালে বিদেশ যাবেন। আমি জানালাম যা-কিছু করবেন আজই করতে হবে। কেননা অফিসের অনেকেই জেনে ফেলেছেন। রাতে রফিক সাহেব ফোন করে বলেন, আমি একটা অফার লেটার তৈরি করেছি। আপনাকে কাল পৌঁছে দেবে। আমি দেশে ফিরলে চুক্তিপত্র তৈরি হবে। আপনি অফিসে নোটিশ দিয়ে দিতে পারেন। আমি তার কথা বিশ্বাস করেছি। পরদিন দুপুরে আমার কাছে ঠিকই অফার লেটার পৌঁছে দেয়া হলো।

চলবে...

বইটি পড়তে হলে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতিবার চোখ রাখুন ‘বাংলাদেশ জার্নাল’ অনলাইনে।

বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন

আজিজ সুপার মার্কেট (তৃতীয় তলা), ঢাকা।

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত