ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ২০ মিনিট আগে

রাজধানীর যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই

  ওমর ফারুক

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৩২  
আপডেট :
 ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৪০

রাজধানীর যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই
ওমর ফারুক

রাজধানী ঢাকায় এখন ট্র্যাফিক জ্যামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চল অবস্থায় যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। কয়েক ঘণ্টা ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে থাকাই যেন এ শহরে সাধারণ নিয়ম। অর্থাৎ, তেমনটা যদি না ঘটে তাহলেই তা ব্যতিক্রম এবং বিস্ময়কর।

এ যানজট নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। যানজট নিরসনে নেয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা এবং মহাপরিকল্পনা। যেমন দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন রাজধানী শহরের মধ্যে হওয়ায় রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে অনেক ব্যস্ত রাস্তা একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে বন্ধ থাকে। ফলে ট্রেন চলাচলের সময় বদলানো হয়েছে, দূরগামী যাত্রীর সুবিধা-অসুবিধার কথা খেয়াল না রেখে।

বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলা বন্ধ করা হয়েছে। পথচারী পারাপারের জন্য রাস্তায় যে জেব্রা ক্রসিং ছিল, সেগুলো বাতিল করে ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি চালু করা হয়েছে, সর্বশেষ সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে। তাহলে কেন যানজট কমছে না?

রাজধানীতে যানজটের কারণ

যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে অতিরিক্ত প্রাইভেট কারের উপস্থিতি। রাস্তার যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাইভেট কার। কোনো কোনো পরিবারের ৩-৪টি প্রাইভেট কার রয়েছে। কোনো কোনো সময় দেখা যায়, কার ড্রাইভার ও একজন যাত্রী। কটি রিপোর্টে দেখা যায়, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪.২ শতাংশ জায়গা দখলে রাখে প্রাইভেট কার।

ট্রাফিক অব্যবস্থাপনাও যানজটের কারণ। ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যালের তোয়াক্কা না করে একই পয়েন্টে আধাঘণ্টা পর্যন্ত একদিকের যানবাহন আটকে রাখে। অনেক সময় অটো সিগন্যাল বাতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সবুজ বাতির বদলে ট্রাফিক পুলিশের হাত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে।

ট্রাফিক বিভাগের হিসাবমতে, সড়কের কম করে হলেও ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। এ ছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রধান সড়কেই হেঁটে চলেন নগরবাসী। ফলে যানজটের সঙ্গে আছে জনজট। আরেকটি মজার হিসাবও আছে।

স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি-র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কম-বেশি ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট গাড়িতে যাতায়াত করেন৷ এই প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগেরও বেশি রাস্তা৷ বাকি ৮৫ ভাগ যাত্রী অন্য কোনো ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন৷ অর্থাৎ তারা গণপরিবহন সড়কের মাত্র ৩০ ভাগ এলাকা ব্যবহারের সুযোগ পান৷

ব্যস্ত সড়কেই পাকিং

বসতবাড়ি এবং কিছু কিছু অফিসে নিজস্ব গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আছে৷ এর বাইরে পুরো রাজধানীতে আর কোনো সুনির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা নেই৷ তাই অফিস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য চলাকালীন সময়ে ৮০ ভাগ গাড়ি রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং করা হয়৷ শুধু তাই নয়, সেগুলো থেকে নিয়মিত টোলও আদায় করা হয়৷

শহরের মধ্যে রেল ক্রসিং, ভিআইপি মুভমেন্ট

ঢাকা শহরের মধ্য দিয়ে এখনো রেলগাড়ি চলাচল করে৷ ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে রেল লাইন যাওয়ার ফলে ১৭টি পয়েন্টে রাস্তা বন্ধ করে ট্রেন যাওয়ার ব্যবস্থা করায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়৷ এ সব পয়েন্টে দিনে কমপক্ষে ১০ বার যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়৷ এরসঙ্গে আছে ভিআইপি মুভমেন্টো৷ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনীতিবিদদের মুভমেন্টের সময় দীর্ঘক্ষণ কিছু কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে শুধু তাদের চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হয়৷ স্বাভাবিকভাবেই তখন পার্শ্ববর্তী সরকগুলোতে সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট৷

ঠেলাগাড়ি-বাস একই রাস্তায়

একই রাস্তায় দ্রুতগামী যানবাহন আর ধীর গতির যানবাহন চলাচল করে, তাও আবার একসঙ্গে৷ একই সড়কে বাস-মিনিবাস, রিকশা, ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, এমনকি ঘোড়ার গাড়িও চলে৷ ফলে যানবাহনের গতি যায় কমে৷

আইন মানতে চায় না কেউ

সড়ক ব্যবহারকারীরা মানে যানবাহন ও পথচারী কেউ-ই আইন মানে না৷ সুযোগ পেলেই ট্র্যাফিক আইন লঙ্ঘন করে তারা৷ ভুল দিক বা ‘রং সাইড' দিয়ে যানবাহন চালানো, ট্র্যাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, ফুটপাথ দিয়ে যানবাহন চালানো ঢাকার একটি পরিচিত চিত্র৷ সবাই আগে যেতে চায়, তা সে যেভাবেই হোক না কেন৷ এর ফলাফল হলো, কেউই আর শেষ পর্যন্ত আগে যেতে পারে না৷ তার ওপর ফুটওভার ব্রিজ বা ফুট ব্রিজ ব্যবহার না করে পথচারীরা মূল সড়কের মাঝখান দিয়ে রাস্তা পারাপার করে সড়কের গতি স্লথ করে দেন৷

যানজটের ক্ষতি

বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট বা বিওআই-র গবেষণায় বলা হয়েছে, যানজটের কারণে বাংলাদেশে বছরে যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, তার মূল্য ৪৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা৷ এছাড়া উৎপাদন খাতে আর্থিক ক্ষতি ৩০ হাজার ৬৮২ কোটি, স্বাস্থ্যগত ২১ হাজার ৯১৮ কোটি, জ্বালানি ও যানবাহন মেরামত বাবদ ১ হাজার ৩৯৩ কোটি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতি ১৫৪ কোটি টাকা৷ সব মিলিয়ে বছরে যানজটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৯৭ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা৷

তবে ঢাকার যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে মনে করছে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি বা ডিটিসিএ৷ তাদের মতে, এক বছরে যানজটে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার আর্থিক ক্ষতি ৮১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা৷ আর তার সঙ্গে উৎপাদন খাত, স্বাস্থ্যগত ও দুর্ঘটনার ক্ষতি যোগ করলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে৷

তাই ঢাকা মহানগরীর এ যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই। রাজধানীকে সবার জন্য বসবাসের উপযোগী করতে হলে সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

বাংলাদেশ জার্নাল/এমএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত