ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬ অাপডেট : ১৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ১৮:৫৫

প্রিন্ট

দৃষ্টিভঙ্গি না পাল্টালে, বিপ্লব ঘটবে না প্রাথমিক শিক্ষায়

দৃষ্টিভঙ্গি না পাল্টালে, বিপ্লব ঘটবে না প্রাথমিক শিক্ষায়
জাকির হোসেন

দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে, নইলে বিপ্লব ঘটবে না প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে। ছোট ছোট শিশুদের পড়াতে উচ্চশিক্ষিত বা মেধাবী শিক্ষক দরকার নেই, অষ্টম থেকে এসএসসি পাসেই যথেষ্ট- এমন মুখস্থ কথা বাদ দিতে হবে।

মেধাবী শিক্ষার্থী না হলে মেধাবী শিক্ষক হওয়া যায় না। যেমন- পরের ধার করা কথা নিয়ে বক্তব্য দেওয়া যায় না। এ ছাড়া প্রাথমিক শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা না বাড়ালে এ পেশায় আন্তরিক হয়ে কেউ আসবে না। আর যদি নিরুপায় হয়ে কেউ আসেও, তখন দিন গণনা করে মাস পাড়ি দিবে। আর লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাবে।

একান্ত নিবেদিত হতে হবে পেশায় আর সচেতন হতে হবে নৈতিকতায়। নইলে এ পেশায় উন্নতি ঘটবে না। মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে যে কাজ করে আর সেই সমাজে যদি শিক্ষকদের অভিভাবকেরা অবহেলার চোখে দেখে তাহলে কিভাবে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আন্তরিকতা বাড়বে তার পেশাদারিত্বে।

কঠিন পরিপত্রের চাপে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকবে ঠিকই কিন্তু থাকবে না আন্তরিকতা। প্রশাসনের চোখ এড়াতে যথাসময়ে বিদ্যালয়ে পৌছাবে হয়তো কিন্তু শিক্ষা দেওয়ার মূলমন্ত্র পৌছাবে না শিক্ষার্থীদের কাছে।

যে পরিবার শিক্ষকের সমালোচনা করে, সেই পরিবারের শিশুরাও শিক্ষকের সমালোচনা করতে শেখে। এমনটা হলে তার প্রভাব তাদেরই সন্তানের উপরে পড়বে। মুখফুটে বলতে না পারলেও বুক চাপড়িয়ে ঠিকই বলে ‘তোর সন্তানের পড়ালেখা না হলে আমার কি?’

প্রাথমিক শিক্ষকেরা যে কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে তা বোঝাতে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা গল্প বলি- তখন শিক্ষকতা করতাম ভানুরকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিশুটির নাম এখন মনে পড়ছে না। দু-দিন থেকে স্কুলে আসেনি, হোম ভিজিট দিলাম। মা কথা দিল, পরের দিন থেকে আসবে। তারপরও আসল না। ৫-৬ দিন পর যখন সে স্কুলে আসলো, তখন অন্যান্য শিক্ষার্থী তাকে বলল, তুই এতদিন স্কুলে আসিসনি, জাকির স্যার আজ পিটাবে।

প্রতিউত্তরে সে তাদেরকে বলেছিল, জাকির মাস্টার আজ মারুক, স্যারেরও মাইর হবে। বাড়িতে সবাই প্রস্তুত হয়ে আছে। এমন সময় আমার বাইকটি স্কুলের মাঠে ঢুকতেই ক্লাসের অন্যান্য সকল শিক্ষার্থী দৌড়ে এসে আমাকে ঘিরেই বলল, স্যার - - - কে মারবেন না।

কেন?

মারলে ওর বাবা, চাচারা এসে আপনাকে মারবে!

তবুও সব ভুলে গিয়ে হাসি দিয়ে তাদেরকে সরল পথ দেখাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাই।

সমাজে আজও প্রবণতা আছে প্রাইমারি মাস্টারের মন ছোট, ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে থেকে ওদের মনও ছোট হয়ে গেছে। কথাটি মোটেও ভুল নয়। তবে ছোট বাচ্চাদের মন ছোট না। ওদের সাথে মিশতে গেলে ওদের মতো সরল মন নিয়ে বন্ধু হয়ে যেতে হয়।

বেশির ভাগ সাধারণ মানুষই জানে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টাররা খাঁটি সরকারি চাকরি করে। তারপরও মাস্টারের সঠিক সময়ে বিনোদন ভাতা পায় না, বিলম্বে পেলেও ছুটি দেওয়া হয় না, ছুটির দিনে কাজ করে ছুটির স্বাদ নিতে পারে না।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, সপ্তাহে একটি দিন বেশি শ্রম দিলেও মজুরি দেওয়া হয় না। শিশু বিকাশের বাধা না দেওয়ার সব দায়িত্ব প্রাইমারি মাস্টারেরা নিলেও নীতিনির্ধারক কলেজ, হাইস্কুলের চেয়ে ১০ দিন ছুটি কম ভোগ করা হয়।

সব কিছুর মিল থাকলেও শুধুমাত্র পিটিআই এর সাথে থাকে বলে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা বেশি হওয়া। এতকিছু বৈশাদৃশ্য কি করে বুঝাই যে, এরপরও প্রাইমারির মাস্টাররা, ইনারা এক একজন সোনার হরিণ।

বাজারে ঢুকলেই বলে মাস্টারদের বেতন সরকার বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারের বড় মাছটা এরাই কিনবে এখন। কিন্তু সাধারণ মানুষেরা জানে না যে, ১৪-১৫ গ্রেডের মাস্টারদের পে স্কেলে ৫০০-৭০০ টাকা বাড়লে ১০ম গ্রেডের উপরের সরকারি কর্মচারীদের বাড়িয়েছে ৫০০০-১০০০০ টাকা।

ওরা জানে না এক একজন কৃষি ব্লক সুপার ভাইজারের বেতন কত, জানে না একজন নার্স কত বেতন পায়।

শুধু সমাজে মাথা উঁচু করে থাকতে, শিরটা নত না করতে ছেঁড়া প্যান্ট বা পায়জামা সুন্দর করে নিজ হাতে পরিষ্কার করে ক্যালেন্ডার করে সযত্নে বের হয় স্কুলে যেতে। শুধুমাত্র একটা পরিচ্ছন্ন মানুষের একটা ভক্তির সালাম পাবে আশায়।

এরা মুখ ফুটে বলতে পারে না কারো কাছে, মাস শেষে আমি মাত্র এত টাকা পাই। তবে শুনতে হয় মাস্টারদের টাকার অভাব নেই। কিন্তু কেন? বিদেশিদের ভালো কিছু দেখে এদেশে সবকিছু চালু করে। দেশটাকে পাল্লা দিয়ে চলার চেষ্টা করছে সরকার, শুধু করছে না অনান্য দেশের শিক্ষকদের মতো সমমর্যাদা দিতে। এ যেন আজন্মকাল শত্রু হয়ে ঠাঁই নিয়েছে নীতিনির্ধারণীদের কাছে।

দেশে একটা নয়, শত শত পদ্মা সেতু নির্মিত হলেও শুধু বক্তৃতায় বলা যাবে আমার দেশের উন্নতি হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে দেশের উন্নতির কথা ভাবতে হলে ভাবতে হবে প্রাথমিক শিক্ষার কথা, শিক্ষকদের কথা। কেন না একমাত্র সুশিক্ষাই পারে মানুষকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে দাঁড় করাতে। আর সেই দায়িত্ব আছে শিক্ষকের ঘাড়ে।

তাই পুরাতন ঘুনেধরা কিছু তহবিল না নিয়ে সৃজনশীল মনোবৃত্তি নিয়ে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে অন্যান্য দেশের মতো প্রতিযোগিতা করে বেতন বৈষম্য দূর করে শিক্ষকদের মনে স্বস্তির বাতাস দ্রুত ফিরিয়ে আনতে বেতন বৈষম্য দূরীকরণ কমিটির আহ্বায়ক ও অন্যান্য সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ আহ্বানে সকল শিক্ষকের পক্ষে থেকে আবেদন করছি।

লেখক: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক

ডিপি/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close