ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২০:১৯

প্রিন্ট

দুস্থ সাংবাদিক সেজে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চেক নিলেন জামায়াত নেতা

দুস্থ সাংবাদিক সেজে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে চেক নিলেন জামায়াত নেতা
অনলাইন ডেস্ক

দুস্থ সাংবাদিক পরিচয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে অনুদানের চেক নিয়েছেন জামায়াত নেতা সাদাত উল্লাহ। এমনটিই জানিয়েছেন বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাদেক হোসেন চৌধুরী। শুক্রবার এক পাঠানো বিবৃতির মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এ তথ্য জানান তিনি।

লিখিত বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, দুস্থ সাংবাদিকতার পরিচয়ের আড়ালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চিহ্নিত জামায়াতের শিবির ক্যাডার চরম্বা ইউনিয়নে জামায়াত থেকে নির্বাচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত উল্লাহ গণভবনে প্রবেশ এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে অনুদান গ্রহণের মতো সুযোগ পাওয়ার ঘটনায় আমরা বিস্মিত ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এর আগেও প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত সাদাত উল্লাহ তার জামায়াতের পরিচয় গোপন রেখে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রধানমন্ত্রীর বহরে সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ ঘুরে এসে আলোচনার জন্ম দেন।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, চিহ্নিত এ জামায়াত নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কীভাবে একজন দুস্থ সাংবাদিক হিসেবে অনুদানের তালিকায় স্থান পেয়েছে আর এর সুবাধে গণভবনে প্রবেশ করে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে অনুদান গ্রহণের সুযোগ পেল? কে বা কারা এ ঘটনায় জড়িত তা তদন্ত পূর্বক চিহ্নিত ও দোষীদের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে বাতিল হতে যাচ্ছে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল থেকে অনুদান পাওয়া জামায়াত নেতা ও কথিত সাংবাদিক সাদাত উল্লাহর চেক। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ।

তিনি বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে সাংবাদিকদের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সাদাত উল্লাহ নামে একজন চেক পান। পরে জানতে পারি উনি জামায়াত নেতা ও জামায়াতের ব্যানারে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। জানতে পারি তিনি মূলধারার কোনো সাংবাদিক নন। আমি দায়িত্ব নেয়ার আগে ২০১৮ সালে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অনুদান প্রাপ্তির জন্য তার ফাইল তৈরী হয়। আর তাতে সুপারিশ ছিলো বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্তে নেমেছি। আগামী সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই চেকটি বাতিল করা হবে।

একজন জামায়াত নেতা কীভাবে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের সুপারিশপ্রাপ্ত হলো এ বিষয়ে জানতে কথা হয় বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমি কোনো জামায়াত নেতার পক্ষে সুপারিশ করিনি।

বিষয়টি জানতে আরও কথা হয় বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বাচ্চুর সাথে। তিনি জানান, সাদাত উল্লাহ বান্দরবানের বাসিন্দা না হলেও এক এসময় সে দৈনিক ইনকিলাবের জেলা প্রতিনিধির পরিচয়ে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেছিলো। তবে সে মূল ধারার সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত নয় এবং সে কখনো প্রেস ক্লাবেরও সদস্য ছিলো না। সে ২০১২ সালে লোহাগাড়ার চরম্বা ইউনিয়নে জামায়াতের ব্যানারে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। বর্তমানে সে বান্দরবানে সাংবাদিকতা করে না।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রায় তিন বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবে ইফতার-পরবর্তী ক্লোজডোর মিটিংয়ে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) সেদিন এ ব্যাপারে তার বক্তব্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণা অনুযায়ী যদি কল্যাণ ট্রাস্টের ঢাকার বাইরের অন্তত চট্টগ্রাম থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকতো তাতে এমন করে আজ বিতর্ক হতো না। কল্যাণ ট্রাস্টে পাঁচজন থাকলেও পাঁচজনই ঢাকার। ঢাকার নেতৃত্বের সিন্ডিকেট প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সেটি হতে দেয়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী বলেন, গতকাল গণভবনে অনুষ্ঠানের ঘোষক যখন সাদাত উল্লাহর নামটি উচ্চারণ করে তখন থমকে যাই। দেখি চেক নিতে এগিয়ে যায় সেই চিহ্নিত লোক। পাশের একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে বললাম, ও তো জামায়াতের লোক। জামাতের ব্যানারে নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান। সে কীভাবে এখানে এল। তার জন্য অনুদানের সুপারিশই বা কে করলেন। চেক বিতরণপর্ব শেষে চাচক্রে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কয়েকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি জাফর ওয়াজেদ ভাইকে জানাই। এরই মধ্যে ওই লোককে কাছে পেয়ে তার দলের পরিচয় তুলে ধরে বললাম, আপনি একজন ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে কীভাবে অসহায়, অসুস্থদের তহবিলের টাকা নিলেন। কে আপনার জন্য সুপারিশ করেছে। এ প্রশ্নের জবাবে সে বলে, তার ছেলে অটিস্টিক। তার চিকিৎসার জন্য নিয়েছেন। এসময় কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি তাকে বলেন, সুটেট-ব্যুটেড হয়ে সাহায্য নিতে এসেছেন। বিষয়টি দৃষ্টিকটু হল না।

চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস জানান, একজন জামায়াত নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাদাত উল্লাহর দুঃস্থ সাংবাদিক সেজে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের চেক গ্রহণ করা খুবই দু‍ঃখজনক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকা সাংবাদিকদের কল্যাণে দিয়ে থাকেন। কিন্তু একটি সিন্ডিকেট এসব টাকা নিয়ে নয়ছয় করছে। এরা কারা? এই জামায়াত নেতা আগেও প্রধানমন্ত্রীর অনুদান থেকে চেক পেয়েছিলো। কার ইন্ধনে কার সহযোগিতায় এসব হচ্ছে? আমি দাবি জানিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে যেসব বিভাগ বা জেলা রয়েছে সেখানে সাংবাদিক ইউনিয়ন বা যেখানে সাংবাদিক ইউনিয়ন নেই সেখানে প্রেস ক্লাবের মাধ্যমে সাংবাদিক বাছাই করতে। কিন্তু এই দাবি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এটা হলে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটতো না।

গত বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, জামায়াতে ইসলামীর ‘ডোনার’ সাদাত উল্লাহ দুস্থ সাংবাদিক হিসেবে দুই লাখ টাকার অনুদান পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে এ অনুদান তুলে দেন। সাদাত উল্লাহ দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক হিসেবে ওই অনুদান পেয়েছেন বলে জানা গেছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত