ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১০ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪:৩৮

প্রিন্ট

বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন

বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী

মাত্র ১০-১২ বছর ধরে আমাদের দেশে বেসরকারি খাতে উল্লেখ করার মত কিছু হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকজন উল্লেখ করার মত বিনিয়োগকারী এই খাতে বিনিয়োগ করার ফলে বেসরকারি খাত ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে। উদাহারণ হিসেবে ধানমণ্ডির মত দামি জায়গায় আনোয়ার খান বেশ কিছু জায়গা নিয়ে তাদের মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনিস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। তার পাশেই রয়েছে ল্যাব এইড হাসপাতাল, ধানমণ্ডির দুই নম্বর রোডে পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অন্যদিকে স্কয়ার হাসপাতাল, এভারকেয়ারসহ কয়েকটি হাসপাতাল উল্লেখ করার মত। আমি মনে করি বেসরকারি খাতকে যেকোন ভাবে আরও বেশি প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। প্রণোদনা বলতে আর্থিক প্রণোদনা বলছি না, তাদের যেকোন সুযোগ সুবিধা, আরো বিনিয়োগ করতে তাদের কি কি অসুবিধা সেইসব জিনিসগুলোতে যদি সরকার দৃষ্টি দেয় তাহলে আমার বিশ্বাস এই বেসরকারি খাত আরো উপরের দিকে যাবে।

আমাদের দেশে সব বেসরকারি খাতকে একই লেভেলে ভাবা হয়। কেননা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কোন শ্রেণিবিভাজন করা বা কোনটা কোন মানের এরকম ভাগ করার কোনো বন্দোবস্ত নাই। আমার মনে হয় আমাদের কতগুলো প্যারামিটার ঠিক করে দেয়া উচিত। যেমন যদি বেসরকরারি মেডিকেল কলেজ হয় তাহলে তার কতটুকু জায়গা আছে, শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরির সুযোগ সুবিধা আছে কি না, তারা অন্তত পক্ষে ইন্ডোরে খেলাধুলা করতে পারে কি না, ঢাকার বাইরে হলে অবশ্যই আউটডোরে খেলাধুলার বন্দোবস্ত আছে কি না, তাদের বইয়ের লেখা পড়ার বাইরেও তারা সঠিকভাবে মানুষ হচ্ছে কি না সেদিকে দৃষ্টি দেয়া।

এগুলো বিভিন্ন এক্সপার্টরা বসে বিভিন্ন প্যারামিটার ঠিক করে দিতে পরেন, এটা থাকলে এত পয়েন্ট, ওটা থাকলে অত পয়েন্ট। এর ফলে জনগণের কাছে সোজাসুজি, পত্র-পত্রিকা বা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে তারা জানাতে পারবে যে, কোনো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা অন্য হাসপাতাল কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে। কোনোটা হয়তো ‘এ’ কোনোটা ‘বি’ অথবা কোনোটা ‘সি’। তার ফলে যে হাসপাতাল ‘সি’ তে থাকে তার চেষ্টা থাকবে যে উন্নতির মাধ্যমে ‘বি’ তে যেতে পারবে। ‘বি’ ‘এ’ তে যেতে পারবে। ‘এ’ এর চেষ্টা থাকবে যে, সে কোন অবস্থাতে যেন ‘বি’ তে চলে না যায়। এক্ষেত্রে সরকারের নির্দিষ্ট পলিসি এবং নীতিমালা থাকা উচিত। এবং সে নীতিমালা একদিনে প্রয়োগ করা সম্ভব না। ধীরে ধীরে একটু সময় নিয়ে। আমাদের দেশের যে বর্তমান অবস্থা তাতে দুই থেকে তিন বছর সময় নিয়ে যদি একটি নীতিমালা ঠিকমত করা হয় তাহলে যেগুলো উল্লেখ করেছি এর বাইরেও অনেক বিনিয়োগকারী রয়েছে এই বেসরকারি মেডিকেল খাতে অবশ্যই আমার ধারণা তারাও বিনিয়োগ করবেন।

আমাদের দেশে গার্মেন্টস সেক্টরে অনেকের অনেক অর্থ আছে। আমারা প্রতি বছর শুনতে পাই যে, দেশের বাইরে টাকা চলে যাচ্ছে। অথচ আবার অনেকের বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্বন্ধে নেতিবাচক প্রচারণার জন্য তারা চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যান। এর ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। একদিকে দেশের টাকা বিনা কারণে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ দেশে যদি বেসরকারী খাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি হয় তাহলে দেশের বাইরে থেকেও অনেকে অবশ্যই আমাদের দেশে চিকিৎসার জন্য আসবেন। এমনকি অনেকেই আজকাল দেশের বাইরে অবকাশ যাপনে গেলে তার সাথে চিকিৎসাও করিয়ে আসেন। সুতরাং এইভাবে করলে আমাদের উন্নতি হবে।

আমাদের বর্তমান অবস্থা এই যে, বেসরকারি খাতে যারা বিনিয়োগ করবেন তারা নিশ্চিত নন যে তাদের কিভাবে চললে এই বিনিয়োগটা কাজে আসবে আবার দেশের জনগণেরও খেদমত করা যাবে। বিভিন্ন ক্যাটাগরি যখন ভাগ করা হবে, তখন অবশ্যই কিছু কিছু হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ থাকবে যেখানে খবচ বেশি পড়বে। আমরা বিদেশে গেলে কিন্তু একই ধরণের খরচ দিয়ে চিকিৎসা পাই না। এটা নির্ভর করে ওই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কি কি সুযোগ সুবিধা আছে তার উপরে। কারণ এখন যন্ত্রপাতি সবই আন্তর্জাতিক মানের এবং দক্ষ জনবল আন্তর্জাতিক মানের পাওয়া যায়। আসল সমস্যা আমাদের পলিসিগত এবং ম্যানেজিরিয়াল।

যদি সরকারের একটি চলমান নীতি থাকে এবং প্রাইভেট সেক্টরে যারা ইনভেস্ট করে তাদের ম্যানেজমেন্ট ভালো হয় তাহলে এটার উন্নতি না হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু প্রথম পদক্ষেপটা গ্রহণ করতে হবে সরকার কর্তৃক। কারণ সরকার যদি এই বেসরকারি খাতকে না জানায় যে, তোমরা এইভাবে চলো, ওইভাবে চলো তা নাহলে উন্নতি হবে কিভাবে? এক্ষেত্রে সরকারের পলিসিগত কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আছে। হঠাৎ করেই কিছু ইম্প্লিমিন্ট করা যায় না। হঠাৎ করেই হাসপাতাল উচ্চ শিখরে চলে যাবে এটা ভাবা বোকামি। বরং যারা সত্যিকারে বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রাখে তারা অনেকে দেশে বিনিয়োগ নাও করতে পারে। অথবা করলেও হয়তো এই মেডিকেল সেক্টরে করবে না। এবার করোনার সময় দেখা গেছে যে, অনেকের অনেক টাকা পয়সা থাকা সত্তেও তারা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করে নাই দেখে তারা যে মানের চিকিৎসা আশা করেন সেই মানের চিকিৎসা তারা বাংলাদেশে পাননি। সুতরাং আমি মনে করি সরকারের আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যাতে করে বেসরকারি খাতে উন্নয়ন উপরের দিকে যায়, বিনিয়োগকারীরাও আকৃষ্ট হয়।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত