ঢাকা, রোববার, ০৭ মার্চ ২০২১, ২২ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ১১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:২৪

প্রিন্ট

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন: প্রচারণায় উত্তাপ, নিহত ২

চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন: প্রচারণায় উত্তাপ, নিহত ২
ছবি: সংগৃহীত

মোস্তফা কামাল পাশা

কোভিড-১৯ ঝড়ের তাণ্ডবে উড়ে যায় গত বছর মার্চ শেষের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। টানা দশমাস অপেক্ষার পর নতুন তারিখ ঘোষিত হওয়ার পরপরই ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে জমজমাট নির্বাচনী প্রচারণা।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সংসদ সদস্যের শূন্য আসনের পাশাপাশি পৌর ও ইউপি নির্বাচন শুরু করলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঝুলে যায়। ৬০ পৌরসভার নির্বাচন এর মাঝে শেষ। ফলাফল আওয়ামী লীগের বিপুল জয়। বিপরীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঝুলতে ঝুলতে অনিশ্চয়তার গর্তে প্রায় তলিয়েই যাচ্ছিল। এর মাঝে মারাও গেছেন কয়েক কাউন্সিলর প্রার্থী।

সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মেয়াদ শেষে হয় ৫ আগস্টে। এর আগেই নগর আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজনকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তী সিটি প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তিনি বিদায়ী নির্বাচিত মেয়র থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন। নির্বাচন কমিশন কোভিড-১৯ দূরের অপেক্ষায় থাকে।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী অতিমারিটি তাণ্ডব চালু রাখে। কোভিড-১৯ তো ২০ পেরিয়ে ২১-এ ঢুকে পড়েছে জবরদস্তি। তাও মহাবিক্রমে! কখনো হালকা কখনো জোরালো সংক্রমণ, আবার কখনো চরিত্র বদল করে ভাইরাসটি পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে চরম অস্বস্তিতে ঠেলে দিয়েছে। টিকা উদ্ভাবন ও টানা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফাইজার এনটেক এর টিকা প্রয়োগ শুরু হয় ইংল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশে। যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কিছু দেশে ঝুঁকির মাত্রা বুঝে টিকা দেয়া হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। আমাদের দেশেও ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে। এর আগে কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় প্রবাহ শুরু হয় গত নভেম্বরে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষেধক ও ওষুধ আবিষ্কার ছাড়াই অতিমারিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। বাংলাদেশেও মৃতের সংখ্যা ৮ হাজার ছুঁই ছুঁই। নমুনা টেস্ট ছাড়া যারা মৃতদের কোন হিসেবও নেই। সব মিলিয়ে ২০২০ সাল ছিল করোনা আতঙ্কের বছর। এখনো ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপের দেশে দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ঙ্কর। অর্থনীতি, বেসামরিক বিমান পরিষেবা ও পর্যটন খাতকে বছর ধরে পুরোই লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে করোনা। এই ক্ষত এখনো বিশ্ব অর্থনীতির রক্ত ঝরাচ্ছে।

কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন। আমাদের দেশও বাইরে নয়। দেশে প্রায় ১৭ মিলিয়ন (এক কোটি ৭০ লাখের কাছাকাছি) মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দেয় অতিমারি করোনা। এতে দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা এক লাফে আরো ১০ শতাংশ বেড়ে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। সীমিত সামর্থ্যে সরকার মোটামুটি পরিস্থিতি সামাল দিলেও সংক্রমণ থামেনি।

সুখবর হচ্ছে, দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু হার কমেছে। এদিকে ভাইরাসটি দ্রুত চরিত্র বদলের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের উপর পুরো আস্থাও রাখতে পারছে না। টিকা দেয়ার পরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানতে হচ্ছে।

করোনা ক্ষতের মাঝেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরীর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২৭ জানুয়ারি। প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের মেয়াদ ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শেষ। করোনা কখন নির্মূল হবে তার নিশ্চিত কোন বার্তা নেই। প্রশাসকের মেয়াদের আগে নির্বাচন না হলে তৈরি হতো নতুন জট। পুরানো তফসিলে নির্বাচনও সম্ভব হতো না। নিয়োগ দিতে হতো নয়া প্রশাসক। নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হলে বিভিন্ন দলের প্রার্থী বাছাইসহ বহুবিধ জটিলতা তৈরি হতো। নির্বাচন কমিশনের সামনে নির্বাচন ছাড়া সহজ কোন বিকল্প ছিলই না। তাছাড়া প্রার্থীরা করোনাকালে সুরক্ষা সামগ্রী, ত্রাণ সহযোগিতা নিয়ে নানাভাবে সীমিত আকারে দীর্ঘদিন নির্বাচনী মাঠে আছেন।

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় সবার মাঝে স্বস্তি এসেছে। নতুন করে সতর্কতার সাথে প্রচারণাসহ নির্বাচনী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার কোন বিকল্প নেই। দলীয় ব্যানারে নির্বাচন হওয়ায় প্রচারণায় দলের প্রভাব থাকছেই। সরকারি দল যেমন জয়ের বিকল্প চিন্তা করছে না। তেমনি বিরোধী দল বিএনপিও জয়ের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয় ৮ জানুয়ারি থেকে। প্রতিদিন বিকাল ২টা থেকে সীমিত সময়ের প্রচারণা নির্ধারণ করে দিয়েছে কমিশন। সেভাবেই এখন পুরোদমে প্রচারণা চলছে। শীতের আমেজের মাঝে প্রচারণা জমেছে বেশ। প্রধান দু’দলের প্রার্থীই এবার নতুন। সরকারি দল মনোনয়ন দিয়েছে, সজ্জন ও স্বচ্ছ রাজনীতিক মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে। তার পক্ষে সব ভেদাভেদ ভুলে নগর আওয়ামী লীগ ও ভ্রাতৃ সংগঠনগুলো পুরো শক্তি নিয়ে মাঠে আছে। কিন্তু বিভিন্ন ওয়ার্ডে দলের বহু বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সংঘাত সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দলের দু’জন কর্মী। বিদ্রোহীদের থামাতে নগর আওয়ামী লীগ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছে কেন্দ্র। চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। জাতীয় রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ যোগান দেয় চট্টগ্রাম। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি। গত ১২ বছরে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার বন্দরসহ চট্টগ্রামের উন্নয়নে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেন। নির্মিত হচ্ছে বহিঃসমুদ্র বন্দরও। কর্ণফুলী তলদেশে টানেলওয়ে তৈরির কাজ অনেক এগিয়েছে। বেশকটি উড়াল সড়কসহ লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হচ্ছে। এর বাইরেও মিরসরাইতে দেশের বৃহত্তম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলসহ নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে ৮ হাজার কোটি টাকার মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক মেগাসিটি হিসাবে গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। বিশাল কর্মযজ্ঞের সুফল ২৭ জানুয়ারির মেয়র নির্বাচনে দলের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে আসবে বলে দল ও সচেতন নগরবাসীর বিশ্বাস।

বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের ব্যক্তি ইমেজও পরিচ্ছন্ন। বিএনপি চট্টগ্রামের হারানো দুর্গ ফিরে পেতে তার পক্ষে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দলটির সাংগঠনিক কাঠামো অগোছালো হলেও নগরবাসী তাদের রায় দেবে বলে আশা করছে।

দুই প্রধান প্রার্থীই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের আশা দেখছেন। তুলনায় রেজাউল করিমের চেয়ে শাহাদাত একটু দ্বিধায়। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না তিনি এবং তাঁর দল। ইতোমধ্যে রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ এনে কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন।

নগরবাসী সংঘাত ও সহিংসতামুক্ত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। বিশ্বাস, নির্বাচন কমিশনও তাই চাইছে। প্রচারণার প্রথম দিনে চকবাজারে ছোট সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পাঠানটুলি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরের নির্বাচনী মিছিলের সাথে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বিদায়ী কাউন্সিলর আব্দুল কাদের প্রকাশ মাছ কাদেরের কর্মীদের সংঘর্ষে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ও বেশ ক’জন আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই মাছ কাদেরসহ তার ডজনের বেশি সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকলিয়ায়ও ছাত্রলীগের এক নেতা ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এছাড়াও লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সম্পাদক ও আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা হত্যা মামলার আসামি বিদ্রোহী প্রার্থী দিলদারুল আলম মাসুমের সাথে নৌকার প্রার্থী বেলালের মাঝেও নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। যা রক্তাক্ত সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে স্থানীয় অধিবাসীদের আশঙ্কা।

আশার কথা হচ্ছে, প্রচারণায় সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ। প্রতি বিকালেই মিছিল মিটিং-এ সরব রাজপথ। প্রচুর পোস্টার উড়ছে রাজপথ ও অলিগলিতে। স্বাভাবিক কারণে প্রচারণা জমে উঠার সাথে সাথে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সর্বোচ্চ সংযম দেখানো জরুরি। নগরবাসী চায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন। করোনা ক্ষত এবং নির্বাচনী আমেজ পুনরুদ্ধারে সব প্রার্থীরাও সচেতন ও সতর্ক হবেন বলে সচেতন নগরবাসী আস্থাশীল। প্রচারণার বিধিনিষেধ মেনে নিজের, প্রচারকর্মী ও নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়ার দায়ও প্রার্থীদের টানতে হবে। সামনে যেকোনো মূল্যে সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত তৈরি করাও দরকার। করোনা আতঙ্কের মাঝে বিলম্বিত নির্বাচনে যেন আর কোন সংঘাত ও আতঙ্কের মেঘ ভারী না হয়, অবশ্যই যত্নশীল হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে। বিশ্বাস, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার পাবে নগরবাসী।

২৭ জানুয়ারি মেয়রসহ একসেট নতুন নেতৃত্ব উপহার পাচ্ছে চট্টগ্রাম। এবার ২০ লাখের বেশি ভোটার সরাসরি ইভিএম মেশিনে ভোট দেবেন। এদের অর্ধেকই মহিলা। ইভিএম ব্যবহার বিধি সাধারণ ভোটারদের ডেমোনস্ট্রেন দিয়ে বুঝিয়ে দেয়ার বাড়তি দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।

নির্বাচন আমেজ ধরে রেখে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হবে বলে নগরবাসী আস্থা। ২৭ জানুয়ারির পর নতুন মেয়র ও কাউন্সিলরদের নেতৃত্বে দেশের বৃহত্তম বন্দর নগরীর উন্নয়ন অভিযাত্রা আরো জোরদার হবে বলে সবাই আশাবাদী। এভাবে পারস্পরিক সহমর্মিতার নতুন উচ্চতায় উঠে আসবে চট্টগ্রাম।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক-কলামিস্ট

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত