ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১২ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ১৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:০০

প্রিন্ট

যখন কর্মক্ষেত্রে নারীরাও ‘পুরুষ’

যখন কর্মক্ষেত্রে নারীরাও ‘পুরুষ’
নারী ডেস্ক

শিরোনাম দেখে অনেকেরই চোখ কুঁচকে যেতে পারে। নারীবাদের উত্থানের এই যুগে কেউ কেউ হয়তো আগেই কিছু একটা আন্দাজ করে গালি দেয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু অপ্রিয় সত্যি কথা কাউকে না কাউকে বলতেই হয়।

‘নারীর অধিকার’ শব্দগুচ্ছটি ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’র মতোই একটি বিতর্কিত বিষয়।

ঠিক কোন জায়গায় নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শেষ হয়, আর কখন সেটা অন্যের ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত হানে, সে নিয়ে তর্ক দীর্ঘদিনের। ঠিক তেমনই, নারীর অধিকার বলতে আসলে নারীকে বেশি সুযোগ দেয়া কি না, এতে সবার সমান যোগ্যতা কখনও বাধাগ্রস্ত হয় কি না, সে নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই।

কিন্তু আজ আর অধিকার নিয়ে কথা বলতে চাই না। বলতে চাই, তারচেয়েও বেশি বিতর্কিত বিষয় নিয়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের আধিপত্য কমাতে গিয়ে কখনও কখনও নারীদের সুযোগ দেয়া হয়, আর তারাই তখন নিজেরাই সে পুরুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

এ প্রসঙ্গে কয়েকটা ঘটনার কথা বলতে চাই।

ঘটনা-১: একটি বেসরকারি গণমাধ্যম। নারীর অধিকার নিয়ে ব্যাপক সোচ্চার গণমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ। সামান্য হয়রানির ঘটনাকেও অনেক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু গণমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত পার্টিতে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বস পুরুষ কর্মীদের কাজ বাড়িয়ে দিয়ে হলেও নারী কর্মীদের সেখানে উপস্থিত থাকার আদেশ দেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে দেখেছি তা হলো, একজন পুরুষ সহকর্মীকে বাসায় পৌঁছে তাদের গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো একজন নারী কর্মীকেও সমান সময় অতিবাহিত করতে হয়। নারী কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সহনশীল মাত্রার কর্ম ঘণ্টা নির্ধারণ ও তার বাস্তব রূপ দেয়া উচিত।

আপাতদৃষ্টিতে এই আদেশ নারীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার উদাহরণ মনে হলেও, এর আসল কারণ পার্টিতে আগত বিশেষ বিশেষ অতিথিদের সামনে গ্ল্যামার উপস্থাপন করা। নারী সহকর্মীরাও বেশ সম্মানবোধের সাথে সেখানে হাজির হন। কিন্তু আসলেই কি সেখানে নারী হিসেবে তাদের সম্মানিত করা হয়?

ঘটনা-২: নারায়ণগঞ্জে সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার হোসেন আরা বেগমকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ওএসডি করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল কিছুদিন আগে। এমনকি এ নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়, ক্ষোভ জানান সংসদ সদস্যরা।

কিন্তু এমন অনেককিছুই আসে না আলোচনায়। আরেকটি বেসরকারি অর্থনৈতিক সংস্থার কয়েকজন নারী কর্মী কাছাকাছি সময়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। ঘটনাচক্রে সংস্থাটির প্রধানও একজন নারী। ফলে সে অফিসে নারীদের একটু বেশিই নিরাপদ বোধ করার কথা। কিন্তু মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইতে গেলে নারী প্রধানের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এখন ছুটি চাইতে এসেছেন কেন? আমাকে বলে কি সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন?’

ঘটনা-৩: একটি গবেষণা সংস্থা। এক তরুণী কর্মী দীর্ঘদিন ধরে বেশ দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্বে পালন করছেন। কিন্তু অনেকদিন ধরে তার পদোন্নতি বা বেতনবৃদ্ধির কোনো খবর নেই। এ নিয়ে তার বেশ কিছুদিন ধরে ক্ষোভও ছিলো। তা জানতে পেরে, একদিন বস সে কর্মীকে ডাকলেন নিজের রুমে। কাঁচুমাচু করে ঢোকার পর যা ঘটলো, তাতে সে কর্মী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সে বস পদোন্নতির বিনিময়ে সরাসরি তরুণীকে ডাকলেন নিজের বিছানায়। রাগে-ক্ষোভে সেখান থেকে বের হয়ে বসের সেকেন্ড ইন কমান্ড অর্থাৎ, দ্বিতীয় বসের কাছে গেলেন তরুণী। দ্বিতীয় বস নারী হওয়ায় সব কথা শেয়ার করতে কোনো দ্বিধা করতে হয়নি তরুণীকে। এবার আরো অবাক হওয়ার পালা। নারী বস বলে বসলেন, ‘কাজে উন্নতি করতে গেলে শুধু মাথা থাকলে হয় না। সবকিছুই কাজে লাগাতে হয়৷’

এমন কিছু ঘটনা কাছের মানুষের সাথে ঘটায় আমি জানতে পেরেছি। কিন্তু এমন অধিকাংশ ঘটনা সাধারণত কারো সাথে শেয়ারই করতে পারেন না নারীরা। সেই একই কর্মক্ষেত্রে সব অপমান সহ্য করে সেই মানুষদের সাথেই তাদের কাজ করে যেতে হয়।

কখনও কখনও পরিবার বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলেও, ‘চেপে থাক, লোকে কি বলবে’ শুনে দমে যেতে হয়।

এখনও মনে আছে, হেফাজতে ইসলামীর কর্মীদের হাতে নারী সাংবাদিক নাদিয়া যখন লাঞ্ছিত হলেন, প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছিল, এমন একটি জায়গায় কেনো একজন নারী সাংবাদিককে পাঠানো হয়েছিল। আর সে প্রশ্ন সমান স্বরে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছিল নারীকণ্ঠেও। কেনো কোথাও সাংবাদিক পাঠাতে হলে, নারী না পুরুষ বিবেচনা করতে হবে, সে প্রশ্নটি আর উচ্চারিত হয়নি কোথাও।

এক সাবেক সহকর্মীকে চিনি, অফিসে যার প্রধান বিনোদন নারী সহকর্মীদের নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলা। আমার খুব অস্বস্তি হলেও, তার আশেপাশের অন্য সহকর্মীরা তার এই ‘চটুল’ কথাবার্তায় বেশ আনন্দই পান, অথবা আনন্দ পাওয়ার অভিব্যক্তি দেখান।

মাঝে মাঝে কোনো কনিষ্ঠ নারী সহকর্মী সেটাতে আপত্তি জানালে অন্য নারী সহকর্মীরাই তীব্র প্রতিবাদ জানান, ‘আরে, উনি কি কিছু মিন করেছে? উনি তো এমনিই মজা করে বলে৷’

এমন আরো হাজার হাজার ঘটনা রয়েছে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তায় পুরুষদের বুঝে না বুঝে সহযোগী হচ্ছেন নারীরাই৷ ‘দয়া’ বা ‘দান’ হিসেবে পুরুষের সমকক্ষ না হয়ে, বা পুরুষ হওয়ার চেষ্টা না করে নারীরা যতোদিন নারী না হচ্ছেন, ততোদিন কর্মক্ষেত্রে সাম্যাবস্থা মোটেও আসবে না। সূত্র: ডয়চেভেলে

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত