ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২২

প্রিন্ট

প্রকল্পের বিল আটকে ঘুষ নেন পিআইও পাপন!

প্রকল্পের বিল আটকে ঘুষ নেন পিআইও পাপন!
এস.ডি সাগর, জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের ঘর তৈরিতে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ রুহুল আমীন পাপনের বিরুদ্ধে।

কয়েকজন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসির) সভাপতির অভিযোগ, কাজ সম্পন্ন করার পর বিল নিতে গেলে 'উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে' বলে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে বিল আটকে দেন পিআইও। পরে তাদের কাছ থেকে ১৭ থেকে ১৮ হাজার করে কেটে নিয়ে তিনি চেক প্রদান করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন পিআইও পাপন। আর প্রশাসন বলছে, লিখিত অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ জার্নালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় গৃহনির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ক্ষেতলাল উপজেলায় ৩২টি ঘরের জন্য ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫২০ টাকা বরাদ্দ আসে প্রধান তহবিল থেকে। ইউপি চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড সদস্যদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি করে প্রায় ৩ লাখ টাকা করে নির্মাণাধীন ঘরের কাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার পর ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার এএফএম, আবু সুফিয়ান ও পিআইও মোহাম্মদ রুহুল আমীন পাপন বাড়িগুলো পরিদর্শন করে সন্তোষও প্রকাশ করেন।

তবে অভিযোগ উঠেছে, শতভাগ কাজ বুঝে নেয়ার পর ফাইনাল বিল নিতে পিআইও’র কাছে গেলে 'উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়' বলে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা দাবি করে বিল আটকে দেন। পরে কয়েকজনের কাছ থেকে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়ে তিনি ফাইনাল বিলের চেক দেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অফিসের ফাইল খরচ বাবদ অতিরিক্ত আরও ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে পিআইওকে।

বরাইল ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও প্রকল্পের ওয়ার্ড পিআইসি আব্দুল মতিন মন্ডল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে গৃহহীনদের একটি ঘর নির্মাণের পিআইসির দায়িত্ব পাই। আমি সেই ঘরটি শতভাগ সম্পন্ন করার পর ইওএনও স্যার ও পিআইও পরিদর্শন করেন। পরে কাজের বিল নেয়ার সময় পিআইও নিজে বলেন যে, ১৮ হাজার টাকা আপনাকে খরচ বাবদ দিতে হবে। না দিলে বিলের চেক দিব না।

তিনি আরও বলেন, এরকম করে কয়েকদিন ঘুরানোর পর পিআইওকে টাকা দিলে চেক দেয়া হয়। আমরা শুনেছি অন্য ইউনিয়নেও পিআইও এমন টাকা নিয়েছে। এছাড়া সে আমার কাছ থেকে ফাইল খরচ বাবদ ৪ হাজার টাকা নিয়েছে।

২ নং ওয়ার্ডের পিআইসি সভাপতি আওলাদুল ইসলাম বলেন, আমরা শতভাগ কাজ করেছি, কাজের কোন কমতি আমাদের নেই। কাজ শেষ হওয়ার পরে আমরা চেয়ারম্যানসহ ফাইনাল বিল নিতে পিআইও’র কাছে গেলাম। তখন পিআইও বললো, অফিস খরচ হিসেবে ২০ হাজার করে টাকা দিতে হবে।

কিসের জন্য টাকা নিবেন এমনটা জানতে চাইলে পিআইও বলেন, ‘উপরে যারা আছে তাদেরকেও দিতে হয়। আপনারা বুঝবেন না।’

আওলাদুল আরও বলেন, টাকা কেন দিব এ নিয়ে পিআইও’র সাথে আমাদের ঝগড়ার মতো হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ পিআইসিকে ১৭ হাজার টাকা করে দিতে হয়।

৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা ইউপি সদস্য ও পিআইসি সভাপতি রাজিয়া বেগম বলেন, আমার কাজের মেঝেতে একটু ত্রুটি হয়েছিল। সেই মেঝে আবার পুরোটাই তুলে ফেলে নতুন করে করতে হয়েছে। আমার কাছ থেকে ১০০ তে ১০০ কাজ করে নিয়েছে। আমরা যখন ফাইনাল বিল নিতে যাই, তখন খরচ বাবদ পিআইও আমার কাছ থেকে টাকা চায়। প্রথমে ২৭-২৮ হাজার টাকা দাবি করে। তারপরে ২০ হাজার শেষে ১৭ হাজার করে টাকা নিয়েছে।

এসব পিআইসিদের আরও অভিযোগ, তারা ক্যামেরার সামনে পিআইও’র এমন দুর্নীতির বক্তব্য দেয়ার পর থেকে তাদের লোকজন দিয়ে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে বরাইল ইউপি চেয়ারম্যান আবু রাসেদ আলমগীর জানান, বিল তোলার সময় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেয়ার বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে পিআইও’কে ফাইল খরচ বাবদ কিছু টাকা দিতে হয়েছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত ক্ষেতলাল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমীন পাপন বলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে তাদের অন্য কোন স্বার্থ হয়তো উদ্ধার হয়নি। তাই তারা আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছে।

সাংবাদিককে আত্মীয় বানানোর চেষ্টা করে তিনি বলেন, পিআইও’দের সমস্যার কোন শেষ আছে? এমন কিছু তুলে ধরবেন না যাতে আমার সম্মানের কোন ক্ষতি হয়।

শেষে তিনি বলেন, যারা আমার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন তাদের বক্তব্য সংশোধন করার সুযোগ দেন আমাকে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বদলি হয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা মো. মোফাক্ষারুল ইসলাম। তিনি জানান, উপজেলার যে কমিটি রয়েছে, তারাই এসব ঘর যাচাই বাছাই করে সিলেক্ট করেন। সিলেকশন করে আমাদের তালিকা দেয়। আমরা সেটা শুধু বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের যে বরাদ্দ আছে সেটা হস্তান্তর করে ইউএনও’র কাছে দেই।

উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে দেয়ার জন্য পিআইও ঘুষ নিয়েছেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা লেনদেনের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এসব মিথ্যা অভিযোগ। তবে পিআইও যদি টাকা নিয়ে থাকে তাহলে উপজেলার কমিটি তদন্ত করে দেখুক।

এ ব্যাপারে ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার এএফএম আবু সুফিয়ান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। যদি কেউ লিখিত অভিযোগ করে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ইউএনও’র কাছে আগে লিখিত অভিযোগ আসুক। ইউএনও ব্যবস্থা না নিলে আমি এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।

সরাসরি পিআইও'র বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর ভিডিও দেতে ক্লিক করুন এখানে

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত