ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ১৩ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৩৭

প্রিন্ট

ভালো নেই করতোয়া পাড়ের পাথর শ্রমিকেরা

ভালো নেই করতোয়া পাড়ের পাথর শ্রমিকেরা
ছবি- প্রতিনিধি

রাশেদুজ্জামান রাশেদ, পঞ্চগড় প্রতিনিধি

করতোয়া নদীতের জলে ডুবে পাথর তোলাই তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কয়েক মিনিট পরপর নদীর জলে ডুব দিয়ে পাথর তোলেন কাবুল শেখ। শীতের সকালে বরফের মতোই নদীর পানি ঠাণ্ডা। পাথর তোলার সরঞ্জাম নিয়ে সকাল সকাল ছুটে আসেন নদীতে। পাথর তুলতে তার সঙ্গে আসেন আরো দুজন। সারাদিন জলে ডুবে ডুবে পাথর তুলে হাতে আসে মাত্র ২শ' থেকে ৩শ' টাকা। তা দিয়েই চলছে টানাপোড়েনের সংসার।

একসময় পাথরের রাজত্বে কাজ করে দৈনিক শ্রমের মূল্য আসতো ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। এখন মাত্র দুই-তিনশ' টাকাতেই চলছে কষ্টের সংসার। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের পাথরঘাটা এলাকার প্রবাহিত করতোয়া নদীর তীরে শ্রমজীবীদের জীবনের চিত্র অনেকটা এমনই।

এদিকে পাথরের রাজত্ব বলা হয়ে থাকে ভজনপুরকে। এই এলাকা থেকে টনকে টন পাথর রপ্তানি হয়েছে বিগত বছরগুলোতে। পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক ড্রেজার মেশিনে উত্তোলিত হতো এসব পাথর। অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিনে উত্তোলন করে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী ব্যক্তি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠলেও ভাগ্য খোলেনি সাধারণ দিনমজুরদের।

জেলায় পুলিশ সুপার মুহম্মদ ইউসুফ আলী যোগদানের পর থেকে অবৈধভাবে ধ্বংসাত্মক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর তোলা বন্ধ করে দেন। এতে প্রকৃতি রক্ষা পেলেও কৃষি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এখানকার ভূমি। এতেকরে চরম দারিদ্রতায় দিন গুণতে হচ্ছে এ এলাকার হাজার হাজার পাথরশ্রমিকে। এই বেকার শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন কাবুল শেখ, সোলেমান ও বয়রুদ্দিন।

উপজেলার ভজনপুরে প্রবাহিত নদী করতোয়া নিজবাড়ি, পাথরঘাটা, আঠারখাড়ি, শেখগছ, ময়নাগুড়ী ও কাকপাড়া, ভেলকুপাড়া ও বোদাপাড়া হয়ে জেলায় প্রবেশ করেছে। ড্রেজার মেশিনের পাথর সাইট বন্ধ থাকায় এ নদী থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করছে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক।

সরেজমিনে নদীএলাকা ঘুরে দেখা যায়, পানিতে ডুবে ডুবে পাথর তুলছেন কাবুল শেখ, মোখলেসুর, কামালসহ ৫/৮ জনের একদল শ্রমিক। তাদের কোনো কোনো দলকে বালু তুলতেও দেখা যায়। তারা নৌকায় বালু জমা করে তীরে এনে স্তূপ করছেন। এ নদীতে শতাধিকের বেশি নৌকা রয়েছে বলে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

পাথরঘাটা গ্রামের পাথরশ্রমিক কাবুল শেখ বলেন, ভাই পাথরের সাইট বন্ধ। সকাল সকাল নদীতে নেমে পড়ি। বুক-গলা সমান পানিতে ডুবে ডুবে পাথর তুলি। সারাদিন পাথর তুলে মহাজনের কাছে বিক্রি করে দুইশ' থেকে তিনশ' টাকা মুজুরি জোটে। এটা নিয়েই চলছে আমার কষ্টের সংসার।

আইনুল হকসহ কয়েকজন বালু শ্রমিক বলেন, আমরা দিনে ৮ জন মিলে নদী থেকে ৫শ' সিএফটি বালু তুলতে পারি। এই ৫শ' সিএফটি বালুর দাম পড়ে ২ হাজার টাকা। একজনে পাই আড়াইশ' টাকা করে। এ টাকায় সংসার চলছে না। অন্য কোনো কাজ নেই যে করবো। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এ অঞ্চলের হাজার হাজার নারী-পুরুষ পাথরশ্রমে যুক্ত। কৃষির উপযোগী জমি না থাকায় একমাত্র পাথরের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। পুরুষরা পাথর তোলেন, নারীরা সেই পাথর বাছাই ও মেশিনে ভাঙানোর কাজ করেন।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে ড্রেজার দিয়ে পাথর উত্তোলন। কাজ না থাকায় শ্রমিকদের খেয়ে-না খেয়েও দিন অতিবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেক শ্রমিক।

শ্রমনির্ভর কোনো কলকারখানা না থাকায় কাজের অভাবে না খেয়ে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের মৌলিকা চাহিদা পূরণে ভীষণ হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তার মধ্যে গত বছর মার্চ থেকে মহামারী করোনার প্রকোপে লকডাউনসহ চলমান বিপর্যস্ত পরিস্থিতির কারণে চরম অভাবের মুখোমুখি এ অঞ্চলের সাধারণ শ্রমিকরা।

শ্রমিকদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সনাতন পদ্ধতিতে হলেও পাথর উত্তোলনের সুযোগ চায় তারা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত