চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ হাজার ৮৬০ ঘর, ৩৭৪ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
জার্নাল ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ২২:৪৬

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৬০টি বসতঘর এবং ৩৭৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৪৫টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টির মধ্যে ৭ জুলাই চট্টগ্রামে ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের তথ্য দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। অতিবৃষ্টিতে উপজেলার পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও এলাকায় পানি উঠে যায়। রেলপথ ডুবে বন্ধ হয়ে যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ।
চট্টগ্রাম নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড় ধস, দেয়াল চাপা পড়ে এবং পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
৫ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলায়। বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ৪ হাজার ৫১৯টি বসতঘর এবং প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। উপজেলাটিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮০টি বসতঘর, ৬৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৮৭ কিলোমিটার সড়ক এবং ৯টি সেতু ও কালভার্ট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার এ দুর্যোগে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় তিনজন করে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ৬৪০টি বসতঘর, তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আনোয়ারা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানে ১৪৫টি বসতঘর, ৬৫ কিলোমিটার সড়ক এবং পাঁচটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৪০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ১ হাজার ২৩০টি বসতঘর, সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৬০ কিলোমিটার সড়ক এবং চারটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফটিকছড়িতে ১০টি ইউনিয়নের ৪০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাতে ৩৭৮টি বসতঘর, ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৭৫ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাটহাজারি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ১৮২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৭২৩টি বসত ঘর, ৮০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৩টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় ১০টি ইউনিয়নের ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৫১০টি বসত ঘর, ১৭টি কালভার্ট এবং ৬০ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
কর্ণফুলী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ৭৭টি বসত ঘর ও ১৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাউজানে ছয়টি ইউনিয়নের ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ১৪৫টি ঘর ও দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ১০টি কালভার্ট এবং ৪৭ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে এ উপজেলায়।
বোয়ালখালী উপজেলায় সাতটি ইউনিয়নের ৪৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ৩৮টি বসত ঘর, ১৭টি কালভার্ট এবং ২৩ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
পটিয়া উপজেলায় ১৮টি ইউনিয়নের ২৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ১২১টি বসত ঘর, পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৪টি কালভার্ট এবং ৪২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চন্দনাইশ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৩৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৩৫টি বসত ঘর, ১৮টি কালভার্ট এবং ৩৮ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে ৫৩৪টি বসত ঘর এবং ৬৭ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের হিসাবে, চট্টগ্রাম মহানগরের ২৪টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে।
এতে ২ হাজার ২৪৬টি বসতঘর, ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ১২৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরে দুইজন এবং সীতাকুণ্ড, হাটহাজারি ও রাঙ্গুনিয়ায় একজন করে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে সরকার সহায়তা করবে।
সোমবার দুপুরে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার সীমান্তবর্তী দোহাজারীতে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যাদের জমি তলিয়ে গেছে, মাছের ঘের ভেসে গেছে কিংবা গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছে, তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সরকার সহায়তা করবে।
তিনি জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা বিবেচনা করে জুলাই মাসের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখতে এনজিওগুলোর প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম










