ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:১৫

প্রিন্ট

আতঙ্কে দাপুটে নেতারা

আতঙ্কে দাপুটে নেতারা
অনলাইন ডেস্ক

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গোয়েন্দা ফাইল দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুবলীগ নেতাদের অপকর্মের বিষয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন। তিনি এ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণের দুই নেতার বিষয়ে ইঙ্গিত করার পর সব মহলেই সরব আলোচনা শুরু হয়।

এরপরই বুধবার শুরু হয় ক্যাসিনোতে অভিযান। আটক হন যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ। কয়েক বছর আগে যুবলীগ নেতা মিল্কি ও তারেক হত্যার পর অগ্রভাগে উঠে আসা দক্ষিণের এই নেতাকে অস্ত্র উঁচিয়েও চলতে দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী যে দুজনের বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন খালেদ তাদের একজন।

রাজধানীতে একাধিক অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকায় গ্রেফতার আতঙ্কে কাকরাইলের নিজ কার্যালয়ে সময় পার করছেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট।

বুধবার রাতে গুলিস্তানে পীর ইয়েমেনি মার্কেটসংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। স্থানীয়রা জানান, এ ক্যাসিনোর পরিচালনায় আছেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট। এটি ছাড়াও রাজধানীর কয়েকটি ক্যাসিনো থেকে নিয়মিত চাঁদার ভাগ আসে তার কাছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ অনুযায়ী ইতোমধ্যে জুয়ার আস্তানাগুলোয় সাঁড়াশি অভিযান চালানো শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর জুয়াজগতের অঘোষিত সম্রাট হিসেবে পরিচিত মহানগর যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট। তার অন্যতম প্রধান সহযোগী হচ্ছেন আরেক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ইতোমধ্যে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। ক্যাসিনো ব্যবসার প্রধান ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত ক্ষমতাধর দুই যুবলীগ নেতা খোরশেদ আলম ও আরমানও গা ঢাকা দিয়েছেন।

বুধবার রাতে যুবলীগ নেতা খালেদ র‌্যাবের অভিযানে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর হাজারখানেক নেতাকর্মী নিয়ে কাকরাইলস্থ যুবলীগের কার্যালয়ে অবস্থান নেন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। বুধবার গভীর রাতেও রাজধানীর কাকরাইলে যুবলীগ অফিসে কয়েকশো নেতাকর্মী নিয়ে অবস্থান করেন তিনি। মূলত গ্রেফতার আতঙ্ক থেকে নেতাকর্মী বেষ্টিত থাকছেন যুবলীগ নেতা সম্রাট। যদিও তিনি আতঙ্কে আছেন বলে স্বীকার করছেন না।

বিষয়টি নিয়ে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী যুবলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর যুবলীগের কাকরাইল অফিসে উপস্থিত হন বিভিন্ন ইউনিটের সহস্রাধিক নেতাকর্মী। তাদের ধারণা, চলমান অভিযানে গ্রেফতার হতে পারেন সম্রাট। সে জন্য তারা কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছেন। আতঙ্ক থেকেই নেতাকর্মী বেষ্টিত থাকছেন সম্রাট। তিনি রাজধানীর অন্তত একটি ক্যাসিনোর মালিক, সেই সঙ্গে একাধিক ক্যাসিনোর টাকা ভাগাভাগির সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তাকে যুবলীগ থেকে শোকজও করা হয়েছে।

গভীর রাতেও তার অফিসে নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণ জানতে চাইলে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমার কাছে নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই আসে। রাত ১টা-২টা পর্যন্ত থাকে। এটা নতুন কিছু নয়।’

স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি নেতাকর্মীর উপস্থিতি গ্রেফতার আতঙ্কের কারণে কিনা- প্রশ্নের জবাবে যুবলীগ নেতা সম্রাট বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত নই। আইনত যদি কোনো সংশ্লিষ্টতা পায়, তা হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারে।’

ঢাকা অসংখ্যা জুয়ার আসর: ঢাকাজুড়ে অনেক জুয়ার আসর বসে। অভিযোগ আছে, ওই সব জুয়ার আসর বা ক্যাসিনোগুলোর বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকার উত্তরা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত কম করে হলেও ১৫০ স্থানে জুয়ার নিয়মিত আসর বসানো হয়। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৪০টি স্পটে আছে পাশ্চাত্য কায়দায় জুয়ার ব্যবস্থা ক্যাসিনো। তবে সব জুয়ার আসর যুবলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। যুবলীগের কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাসিনোগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে আরামবাগ, ফকিরাপুল, বিজয়নগর, পল্টন ও বনানী এলাকায়। এসব ক্যাসিনোর কয়েকটিতে বিদেশ থেকে আনা প্রশিক্ষত নারী-পুরুষ কাজ করেন। যুবলীগের তিন নেতা মূলত ক্লাবগুলোর জুয়ার আসরের নিয়ন্ত্রক। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে দুজনের বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয়জন হচ্ছেন মতিঝিল-সবুজ এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় রাজধানীতে সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত বারের সংখ্যা ৫৬টি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, শুধু উত্তরা থানাতেই বার আছে ৪২টি। যুবলীগ উত্তরের এক নেতা পরিচালনা করেন অনুমোদহীন একটি বার। উত্তরা-১ নম্বর সেক্টরের প্রধান সড়কের পাশে একটি ক্যাসিনো চালান সরকারের তালিকাভুক্ত বিদেশে পালিয়ে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ভাই।

ঢাকায় আধুনিক জুয়ার আসর শুরু হয় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মতিঝিল-সবুজ এলাকার এক যুবদল নেতার নিয়ন্ত্রণে। ক্ষমতার পালাবদলে যুবদল থেকে জুয়ার নিয়ন্ত্রণ চলে আসে যুবলীগের হাতে। যুবলীগ নেতাদের হাতে জুয়া আরও সম্প্রসারিত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে। দেশি পরিচালনাকারীদের স্থলে এসেছেন বিদেশি নারী-পুরুষ।

শাহজাহানপুর-মতিঝিলের ভয়ংকর মানুষ হিসেবে পরিচিত খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া একাই নিয়ন্ত্রণ করেন আরামবাগ-ফকিরাপুল এলাকার ১০টি ক্লাব। ক্লাব মানেই জুয়া-ক্যাসিনো। প্রতি রাতে কম করে হলেও আয় ১০ লাখ টাকা।

সংগঠন নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছি, তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। যুবলীগ নেতাদের দুর্নীতির বিষয়, চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেব।’

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত