ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২০, ২০:১১

প্রিন্ট

জাতীয়র চেয়ে দর্শক স্বীকৃতিটাই বেশি মূল্যবান: ইমরান

জাতীয়র চেয়ে দর্শক স্বীকৃতিটাই বেশি মূল্যবান: ইমরান
ইমরান মাহমুদুল
ইমরুল নূর

এই সময়ের সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে এক অনন্য নাম ইমরান মাহমুদুল। শুধু দর্শকপ্রিয়তাই নয়, গানের বাজার এবং বাণিজ্যের জনপ্রিয়তায় তিনি এখন রয়েছেন একদম শীর্ষে। রিয়্যালিটি শোয়ের মাধ্যমে হাতে গোনা যে কজন প্রথম থেকেই নিজেদের সাফল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম চলতি সময়ের জনপ্রিয় এই সংগীতশিল্পী। একের পর এক গানে মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

দেখতে দেখতে ক্যারিয়ারের ১২ বছর অর্থাৎ এক যুগ পার করে ফেললেন। ২০০৮ সালের আজকের দিনে (৩১শে আগষ্ট) চ্যানেল আই সেরাকন্ঠ প্রতিযোগীতার মধ্যে দিয়ে পেশাগতভাবে সংগীত জগতে যাত্রা শুরু করেন। প্লাটফর্ম থেকে বের হওয়ার পর ব্যস্ত হয়ে পড়েন স্টেজ শো নিয়ে। প্রায় দুই বছর পর ২০১০ সালে প্রকাশ করেন তার প্রথম অ্যালবাম ‘স্বপ্নলোক’। প্রথম অ্যালবাম হিট না হলেও দর্শকপ্রিয়তা পায় বেশ। তবুও হাল ছাড়েননি এই গায়ক। এরপর ২০১২ সালে একটি মিক্সড অ্যালবামে ‘তুমি দূরে দূরে’ গানটি প্রকাশ করেন। সেই গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। একই বছরে নিজের কম্পোজিশনে ‘তুমি’ মিক্সড অ্যালবামে কিছু গান প্রকাশ করেন। এরপরই নামের আলো ছড়াতে থাকে তার। গানগুলো একে একে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরতে শুরু করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। আপন আলোয় জ্বলে উঠেছেন বারেবার।

দীর্ঘ এক যুগের ক্যারিয়ারে শ্রোতাদর্শকদের ভালোবাসায় মুগ্ধ ইমরান মাহমুদুল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, সময় যেন কেমন করে চলে যায়। আমার কাছে মনে হয়, এইতো মাত্র সেদিন আমি পথচলা শুরু করলাম। অথচ কিভাবে যেন এতটা সময় পার হয়ে গেলো। আমি আজকে যা হয়েছি তার সবই আমার শ্রোতাদর্শকদের জন্য। তাদের ভালোবাসায় আমি আজকের ইমরান হতে পেরেছি। শ্রোতারা ভালো না বাসলে হয়তো আমি এতদূর আসতে পারতাম না। এরজন্য তাদেরকে আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

ক্যারিয়ারে নিজের স্ট্রাগল নিয়ে তিনি বলেন, আর আমার এতদূর আসার পেছনে অবশ্যই কিছু মানুষের সাপোর্ট, আমার পরিশ্রম, স্ট্রাগল তো রয়েছেই। আমি যখন ২০০৮ এ সেরা কণ্ঠ থেকে বের হয়েছি, তার দুই বছর আমি কোন গান করিনি। আমি গানের কম্পোজিশনের কাজ শিখছিলাম। ওইসময়টাতে আমার খুব একটা স্ট্রাগল পিরিয়ড গিয়েছে। মানুষ অল্পতেই হতাশ হয়ে যায়, হতাশ হলে চলবে না। কারণ এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এখানে টিকে থাকতে হলে অনেক পরিশ্রম করতেই হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। নাহলে বারবার ট্রাই করতে হবে।

নিজের পরিশ্রম থাকলে সেখানে সফলতা আসবেই। আমার পরিচিতিও একদিনেই হয়নি। একবারে হঠাৎ করেই অনেক কিছু পেয়ে যাইনি আমি। চার বছর পর ২০১২ এর দিকে একটু একটু করে পরিচিতি পেতে শুরু করি, এরপর ’১৩, ’১৪ এর দিকে আরেকটু বাড়তে থাকে। এরপর ’১৫ থেকে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এভাবেই একটু একটু করে এগুতে হয় সামনে। যারা রিয়েলিটি শো থেকে বের হয়, তাদেরকে অনেকটা স্ট্রাগল করতে হয়। প্লাটফর্ম থেকে বের হওয়ার পর অনেকেই কাভার গানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা ভাবে আমাকে তো মানুষ চিনেই, তাই স্টেজ শো-ও করতে থাকে। এভাবে যখন ১/২ বছর হয়ে যায় কিন্তু নিজের কোন গান থাকে না তখন অনেকেই হতাশায় ভুগে। শ্রোতাদের মাঝখান থেকে হারিয়ে যায়। তাদের প্রতি আমার সাজেশন থাকবে, যেন নিজের ফ্লো থাকতে থাক্তেই যেন নিজের গান তৈরি করে ফেলে। মানুষ যদি মনে রাখে তাহলে নিজের গানের জন্যই একজন শিল্পীকে মনে রাখবে। কাভার গান দিয়ে দর্শকের মনে থাকা যায় না।

২০১০ সালে আমি আমার প্রথম অ্যালবাম বের করি যেটার নাম ‘স্বপ্নলোক’। এটা আমার স্বপ্ন ছিল। প্লাটফর্ম থেকে বের হয়ে যে অর্থ পেয়েছি আর আমার নিজের যা সঞ্চয় ছিল, তা দিয়ে প্রথম অ্যালবামটা বের করি। কিন্তু আমি আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী তেমন ফিডব্যাক পাইনি। তাই বলে হতাশায় ভুগে নিজের কাজ বন্ধ রাখিনি। নিজের সবটুক সঞ্চয় দিয়ে এটা বের করেছিলাম, আমার স্বপ্ন ছিল যে এটা সুপারডুপার হিট হবে। কিন্তু তেমন ফিডব্যাক পাইনি আসলে। হিট না হলেও গানগুলো দর্শকদের ভালো লেগেছে, প্রশংসা করেছে। কিন্তু প্রশংসা তো সবাই করে, ওটা দিয়ে হবে না; একটা ফিডব্যাক তো লাগেই। তখন অনেকেই বলছে যে, কিছু হবে না; গান ছেড়ে দাও। তখন আমি বলছি গান ছাড়া যাবে না। এটা হয়নি তো কি হয়েছে, সামনে হবে। সেই বিশ্বাস মনে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। এরপর ২০১২ সালে আমার নিজের কম্পোজিশনে মিক্সড অ্যালবাম ‘তুমি’ সুপারডুপার হিট হয়ে যায়। এটা আসলে ভাগ্য। তাই কোনভাবেই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, কার ভাগ্যে কখন কোথায় সুযোগ ও ভাগ্য লিখে রাখছে; তা কেউই বলতে পারে না। আমি যদি ওইসময় হাল ছেড়ে দিতাম তাহলে তো আজকের এই জায়গায় আসতে পারতাম না। আমরা অনেক সময় বড় কিছু নিয়ে প্রত্যাশা করি অনেক, সেদিক থেকে ছোট কিছুর কোন ধ্যান দেই না। দেখা যায় যে, একসময় সেই ছোট কিছুটাই ধামাকা হয়ে যায়। ছোট থেকেই অনেক সময় বড় কিছু হয়ে যায়।

আমার ওই মিক্সড অ্যালবামটা করতে আমার এক টাকাও খরচ হয়নি কারণ আমি নিজে কম্পোজিশন করেছি। সেখানে ১২টা গানের মধ্যে আমার একটা গান দিয়ে দিয়েছি। সেই ‘দূরে দূরে’ গানটিই সুপারডুপার হিট হয়ে যায়। আমি কোন প্রত্যাশাও করিনি, এক টাকাও পাইনি। কিন্তু গানটা হিট হয়ে যায়। আমার কম্পোজিশনে মিলনের কণ্ঠে ‘সখি ভালবাসা কারে কয়’ গানটিও তুমুল হিট হয়ে যায়। এইখান থেকে আমি অনেক বড় ধরণের একটা সাহস পেলাম সামনে এগিয়ে যাওয়ার। এরপর ২০১২ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘তুমি’ বের করি। গানগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ২০১৫ সালে ‘বলতে বলতে চলতে চলতে’ অ্যালবাম প্রকাশ করি। এটার টাইটেল গানটি অল্প সময়ে কোটির মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলে। এটা বাংলা গানের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তখন কেউ ভাবেওনি যে কোন গান এত ভিউ হতে পারে। এটাই কোন বাংলা গানের কোটি ভিউ গান। এরপর থেকে তো পথ চলতেই আছি।

দীর্ঘ ১২ বছর পাড়ি দিয়ে আজকের এই অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের এই অবস্হান নিয়ে আপনি কতটুকু তৃপ্ত? আর স্টারডমটা কিভাবে উপভোগ করেন? ইমরান বলেন, এ পথ চলাটা আমার জন্য সহজ ছিলো না। ২০০৮-থেকে ২০২০ আজ এ পর্যন্ত আমি যা হয়েছি তা আমার কষ্টের অর্জন, আমার বাবা-মায়ের দোয়া আর শ্রোতাদর্শকদের ভালোবাসা। এই বারোটা বছর অনেক স্ট্রাগল করেছি। অনেক ভালো মন্দ মানুষের সাথে মিশেছি, অনেক কিছু শিখেছি। যার কারণে আমি অনেক কিছু পেয়েছি আবার হারিয়েছিও। তবে আমি বলবো এখনও অনেক শিখার বাকি, দেখার বাকি। এখনও শিখে যাচ্ছি, শিখে যাবো। আর স্টারডম উপভোগ করার কিছুই নেই। যত্ন করে নিজের জায়গাটা ধরে রাখার চেষ্টা করি।

চলার পথে কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নে ইমরান বলেন, পথচলায় সবক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, থাকবেই। সেগুলো জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। আর আমি কখনওই অন্যের কাঁধে ভর করে উপরে উঠতে চাইনি কখনও। যা করেছি নিজের চেষ্টায়। আমাকে অনেকেই সাপোর্ট করেছেন যেমন- সাজিদ সরকার, হাবিব ওয়াহিদ, আরেফিন রুমি, জুয়েল মোর্শেদ, অয়ন চাকলাদার - এদের সাপোর্ট পেয়েছি টেকনিক্যাল দিক থেকে। ভাইয়াদের কারণে আমার পথচলাটা অনেক সহজ হয়েছে। আর আমি অনেক ধীরে ধীরে সামনে এগিয়েছি তো তাই অনেকের সেই ফোকাসটা আমার দিকে পড়েনি ওভাবে। আর হ্যাঁ, আমি একটা পজিশনে আসার পর অনেকেই পেছন থেকে টেনে ধরার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কিছুই করতে পারেননি। শ্রোতাদের ভালোবাসাটা আমাকে অনেক হেল্প করেছে।

একক গানের পাশাপাশি সিনেমার গানেও তুমুল জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তিনি। সিনেমার গান নিয়ে তিনি বলেন, অডিও আর প্লে-ব্যাক অর্থাৎ ফিল্মের গান দুটি আলাদা বিষয়। সবারই স্বপ্ন থাকে প্লে-ব্যাক করার। প্লে-ব্যাক করার মজাটাই অন্যরকম। আমি সবসময়ই প্লে-ব্যাক করতে স্বাছন্দবোধ করি। আমার কাছে মনে হয় ফিল্মের চেয়ে অডিও গানে বেশী সাড়া পাওয়া যায়। আর ফিল্ম হিট হলে ফিল্মের গান অটোমেটিক্যালি হিট হয়ে যায়। সেখানে প্রচারণা বেশী থাকে আর নায়ক-নায়িকাদেরও ভূমিকা থাকে। কিন্তু অডিও গানের ক্ষেত্রে পুরোটাই আমার উপর।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি কি, ইমরানের উত্তর, প্রাপ্তি অনেক। আমার শুরু থেকে শ্রোতাদর্শকরা যেভাবে আমার পাশে ছিলেন, ভালবাসা দেখিয়েছেন; যার কারণে আমি আজকে এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। দর্শকদের এই ভালবাসাটাই আমার প্রাপ্তি। দুইবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার ও ভারত বাংলাদেশ আয়োজিত বিবিএফএ অ্যাওয়ার্ড পেলাম এটাও একটা প্রাপ্তি। আর অপ্রাপ্তি বলতে কিছু নেই। আমি যা পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। যদি সামনে আরও ভালো কিছু পাই অবশ্যই সাদরে গ্রহণ করবো। সবসময় দর্শকদের ভালোবাসা পেতে চাই। আর আমি কখনও কোন অ্যাওয়ার্ডের জন্য গান করিনি বা ছুটিনি, শুধু মনোযোগ দিয়ে কাজটাই করে গিয়েছি। যদিও এটা একটা স্বীকৃতি; এটা সবাই পেতে চাই, আমিও চাই। কিন্তু তাই বলে এর পেছনে ছুটিনি কখনও।

স্বীকৃতি অবশ্যই কাজের ক্ষেত্রে সাপোর্ট করে, জাতীয় স্বীকৃতির চেয়ে আমার কাছে দর্শকের স্বীকৃতিটাই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। দর্শক ভালবাসলেই হবে। আর সময় তো এখনই শেষ হয়ে যায়নি। আরও অনেক কিছু করার আছে, দেওয়ায়র আছে এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য। দেখা যাক কি হয়!

নতুনদের নিয়েও কাজ করছেন। যেটা অনেকেই করে না। নতুনদেরকে সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়গুলো কিভাবে দেখেন? ইমরান বলেন, আমি সবসময় নতুনদেরকে সাপোর্ট করার চেষ্টা করি। আর যারা কোন রিয়েলিটি শো থেকে আসে তাদের প্রতি আমার একটা আলাদা সফট কর্ণার কাজ করে। কারণ আমিও একসময় নতুন ছিলাম। আর একটা প্লাটফর্ম থেকে বের হওয়ার পর তাদেরকে অনেক কিছু ফেইস করতে হয়। অনেক কষ্ট করতে হয় নিজের গানের জন্য। এছাড়া আমি সর্বশেষ ‘গানের রাজা’ অনুষ্ঠানের বিচারক ছিলাম। এখান থেকে যারা বের হয়েছেন তাদের জন্য কাজ করছি। এরমধ্যে তিনজনের গান বের হয়েছে। বাকিদেরও শিগগিরই বের হবে। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকের সাথেই কথা হয়েছে, তাদেরকেও সুযোগ দিব সামনে। নতুনদের জন্য আমার সাপোর্ট সবসময় থাকবে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ইমরান গেয়েছেন প্রায় ৩৩৩টি গান। যার মধ্যে একক গান ৮৫টি, দ্বৈত গান ১৪৭টি, সিনেমার গান ৫৮টি, নাটকের গান ২১টি, কাভার গান ১৫টি ও ইসলামিক গজল ৭টি। ইমরান প্রথম প্লে-ব্যাক করেন ভালবাসার লাল গোলাপ সিনেমায় ‘মেঘ যেখানে’ শিরোনামের গান দিয়ে। যেই গানটিতে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছেন শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস।

আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত