ঢাকা, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

যাত্রাশিল্পী ও লেখক মিলন কান্তি দে আর নেই

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:২২  
আপডেট :
 ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:০৪

যাত্রাশিল্পী ও লেখক মিলন কান্তি দে আর নেই
মিলন কান্তি দে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের প্রখ্যাত শিল্পী, নির্দেশক ও লেখক মিলন কান্তি দে আর নেই। শনিবার বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

যাত্রাশিল্প গবেষক আমিনুর রহমান সুলতান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মিলন কান্তি দে কিছুদিন ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। শনিবার সকাল থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিকেলে নিজ বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়।

তিনি আরও জানান, বিকাল ৫টা পর্যন্ত পারিবারিকভাবে সৎকারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সৎকারের সময় ও স্থান নির্ধারণ করা হবে।

জন্ম ও শৈশব

মিলন কান্তি দে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর, চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামে। গ্রামীণ পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারলেও অল্প বয়স থেকেই তিনি যাত্রাশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

যাত্রার সঙ্গে আজীবন বন্ধন

তার শিল্পজীবন শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি। কৈশোর পেরোতেই তিনি যাত্রামঞ্চে পা রাখেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার অভিনয় দক্ষতা, সংলাপ বলার ক্ষমতা ও চরিত্র নির্মাণের গভীরতা দর্শকের মন জয় করে। ধীরে ধীরে তিনি যাত্রার প্রধান চরিত্র থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সমকালীন চরিত্রে অনন্য পারদর্শিতা দেখান।

তিনি বিশ্বাস করতেন,

“যাত্রা শুধু বিনোদন নয়, এটি মানুষের বিবেক জাগ্রত করার শক্তিশালী মাধ্যম।”

এই দর্শন থেকে তিনি যাত্রাপালায় সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, মানবিকতা, প্রেম, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।

যাত্রাশিল্পকে বাঁচাতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে - দৈনিক আজাদীবাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের প্রখ্যাত শিল্পী, নির্দেশক ও লেখক মিলন কান্তি দে

যাত্রাশিল্পে দীর্ঘ পথচলা

মাত্র ১৮ বছর বয়সে যাত্রাশিল্পে যুক্ত হন মিলন কান্তি দে। এরপর কয়েক দশক ধরে অভিনয়, নির্দেশনা ও সংগঠকের ভূমিকায় যাত্রাশিল্পে সক্রিয় ছিলেন। তিনি শতাধিক যাত্রাপালায় অভিনয় ও নির্দেশনা দিয়েছেন এবং গ্রামবাংলার যাত্রাশিল্পকে শৈল্পিক ও চিন্তাশীল ধারায় এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।

যাত্রাশিল্পকে পেশাগত মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পীদের সংগঠিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যাত্রাশিল্পীদের অধিকার, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।

লেখকসত্তা ও গবেষণা

শিল্পীসত্তার পাশাপাশি মিলন কান্তি দে ছিলেন একজন নিবেদিত লেখক ও গবেষক। যাত্রাশিল্পের ইতিহাস, সংকট ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। আত্মজীবনীসহ যাত্রাশিল্পভিত্তিক তার একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখায় যাত্রাশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

নির্দেশক হিসেবে অনন্য

অভিনয়ের পাশাপাশি মিলন কান্তি দে ছিলেন একজন শক্তিশালী নির্দেশক। তার নির্দেশনায় যাত্রা পেয়েছে শৈল্পিক শৃঙ্খলা, সংলাপে এসেছে নাটকীয় গভীরতা, আর মঞ্চ ব্যবহারে এসেছে আধুনিক ভাবনা। তিনি এমন এক সময়ে যাত্রাকে নতুন ভাষা দিয়েছেন, যখন এই লোকশিল্প অস্তিত্ব সংকটে ভুগছিল।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

যাত্রাশিল্প ও সাহিত্যচর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মিলন কান্তি দে ২০২২ সালে নাটক বিভাগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কার তার শিল্পী ও লেখকসত্তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এর পক্ষ থেকে দেশের যাত্রাশিল্পে তার অনন্য অবদানের জন্য যাত্রাশিল্পী সম্মাননা প্রদান করা হয়। এটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অন্যতম প্রধান সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত।

শিল্পী ও লেখকের দ্বৈত সত্তা

মিলন কান্তি দে ছিলেন এমন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে মঞ্চে শিল্পী এবং কলমে ইতিহাস রচয়িতা। আমৃত্যু তিনি শিল্পীসত্তা ও লেখকসত্তা—দুটোকেই সক্রিয় রেখেছেন। যাত্রাশিল্পকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার আজীবনের সাধনা।

যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে আর নেই

সংগঠক ও আন্দোলনকারী

মিলন কান্তি দে শুধু মঞ্চের শিল্পী ছিলেন না; তিনি যাত্রাশিল্পের অধিকার আদায়ের নির্ভীক কণ্ঠ ছিলেন। যাত্রাশিল্পীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে তিনি বহুবার সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। যাত্রাদল গঠন, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, নীতিমালা প্রণয়ন এবং সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলায় তাঁর অবদান ছিল ঐতিহাসিক।

শিক্ষক, গুরু ও মানবিক মানুষ

শিষ্য তৈরি করা মিলন কান্তি দে’র জীবনের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন,

“একজন শিল্পী মারা যায়, কিন্তু তার শিষ্যরা বেঁচে থাকলে শিল্প বেঁচে থাকে।”

তার হাতে গড়া অসংখ্য শিষ্য আজ দেশের যাত্রা, নাটক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে অন্যতম নটরাজ এন এ পলাশ, যিনি মিলন কান্তি দে’র ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে যাত্রার অভিনয়ভাষা, দর্শন, মঞ্চশৃঙ্খলা ও শিল্পদায়িত্ব সম্পর্কে দীক্ষা গ্রহণ করেছেন।

শোক

যাত্রাশিল্প, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন সোসাইটি ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মিলন কান্তি দে’র প্রয়াণে গভীর শোক নেমে এসেছে। সহকর্মী শিল্পী, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, মিলন কান্তি দে’র প্রয়াণে বাংলাদেশের যাত্রাশিল্প হারাল এক নিরলস সাধক ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষীকে। বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—কারণ তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, বরং একটি জীবন্ত অধ্যায়ের প্রাণ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত