ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ আপডেট : ২ মিনিট আগে
শিরোনাম

৩ জেলার সীমান্তে বিএসএফের পুশ-ইন চেষ্টা রুখে দিলো বিজিবি

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ২০:২১

৩ জেলার সীমান্তে বিএসএফের পুশ-ইন চেষ্টা রুখে দিলো বিজিবি

লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা (পুশ ইন) করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধার মুখে তারা প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে এসব ব্যক্তি বর্তমানে সীমান্তের শূন্যরেখা ও নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যান্স ল্যান্ড) অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় বিএসএফ অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) ১০টি পৃথক অপচেষ্টা ঠেকানো হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৯০ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয় বলে জানিয়েছিল বিজিবি।

লালমনিরহাট

লালমনিরহাটের আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার চারটি সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ, শিশুসহ অন্তত ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বিএসএফ। গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে আজ শুক্রবার ভোর পর্যন্ত এসব চেষ্টাকে রুখে দেওয়ার দাবি করেছে বিজিবি।

বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় অনুপ্রবেশের এসব চেষ্টা ব্যর্থ করা হয়। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সীমান্তগুলোতে বিজিবি ও বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থানে আছে। আজ সকালে ওই ব্যক্তিদের লাগেজসহ সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করতে দেখা যায়।

লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আদিতমারী উপজেলার দীঘলটারী ও দুর্গাপুর সীমান্তের ৯২৫ ও ৯২৭/৭-এস নম্বর মেইন পিলার এলাকায় ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপস্থিতি টের পান বিজিবি সদস্যরা। পরে হ্যান্ডমাইকের মাধ্যমে সতর্ক করা হলে তাদের ভারতীয় অংশে সরে যেতে দেখা যায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ওই ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে ভারতীয় রানীনগর-৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি। তবে এ বিষয়ে বিএসএফের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়ন সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ—এমন অভিযোগ করেছে বিজিবি। শুক্রবার ভোরে তিস্তা-৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের বড়খাতা কোম্পানির টহল দল স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় তাঁদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ১১ জন শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

অন্যদিকে পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ঝালাঙ্গী (পকেট) সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ আরও ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছে বিজিবি। শুক্রবার ভোরে বিজিবির টহল দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেন। এ ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিস্তা-৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর তানভীর আহমেদ বলেন, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম সীমান্তে ২১ জনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

এদিকে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আদিতমারী সীমান্তে ১২ জনের অনুপ্রবেশচেষ্টার তথ্য নিশ্চিত করেছে।

লালমনিরহাট জেলার একাধিক সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা এবং তা প্রতিহত করার বিষয়টি বিজিবির রংপুর সেক্টরও পৃথক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে।

পঞ্চগড়

পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি–প্রধানপাড়া গ্রামের সীমান্ত দিয়ে নারী–শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে কঠোর নজরদারির কারণে তারা প্রবেশ করতে পারেননি বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

শুক্রবার (৫ জুন) ভোর থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পুশ ইনের চেষ্টার শিকার ওই ১০ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। এ সময় দুই পাশে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।

কোনো দেশই সীমান্তে প্রবেশ করতে না দেওয়ায় শূন্যরেখার খোলা আকাশের নিচে ফসলি জমিতে ওই ১০ জনকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ পুরুষ, দুই নারী ও তিন শিশু আছে বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে।

এ ঘটনায় আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বড়বাড়ি–প্রধানপাড়া সীমান্তে বিজিবির বড়বাড়ি ও বিএসএফের সাকাতি ক্যাম্পের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিরাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বিএসএফের সঙ্গে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ওই ১০ জন বাংলাদেশের নাগরিক বলে বিএসএফ দাবি করেছে। তবে তারা বাংলাদেশি কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ জন্য আমরা তাদের গ্রহণ করছি না। তা ছাড়া এভাবে ঠেলে পাঠানো তো কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ে না।

নওগাঁ

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাপানিয়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী-পুরুষ, শিশুসহ ১৭ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএএফ। বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। আজ শুক্রবার সকাল আটটার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের নওগাঁ ব্যাটালিয়ন (১৬ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, হাপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ভারতের ৮৮ বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১৭ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেন। সংবাদ পাওয়ার পর হাপানিয়া সীমান্তচৌকির (বিওপি) বিজিবির টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। বর্তমানে ১৭ ব্যক্তি ভারত ও বাংলাদেশের দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই এলাকায় বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

নওগাঁ ব্যাটালিয়ান ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরে ওই এলাকায় টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওই ১৭ জনসহ অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদেরকে ভারতীয় ভূখণ্ডে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যান্স ল্যান্ড) অবস্থান করছেন। বিএসএফ তাঁদের ফেরত নেয়নি। খোলা আকাশের নিচে বৃহস্পতিবার বিকেলে ভারী বৃষ্টিতে তারা ভিজেছেন, পর্যাপ্ত খাবারও পাচ্ছেন না।

স্থানীয় বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ২৮ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি খুলনার কয়রায়। তারা দুই বছর আগে ভারতে গিয়েছিলেন। কয়রা থেকে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র পাঠিয়েছেন। সীমান্তের শূন্যরেখার ১০০ গজ দূর থেকে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএসএফের পক্ষ থেকে তাদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। তাঁদের মধ্যে একজন বয়স্ক নারী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এর আগে বুধবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে সীমান্ত পিলার ২০৩/৬-আর সংলগ্ন এলাকা দিয়ে ওই ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানো হয়। বিএসএফের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের ঠেলে পাঠান। ২৮ জনের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৬ শিশু রয়েছে। তবে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে তারা বাংলাদেশে আসতে পারেননি। এর পর থেকেই তারা নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।

বিজিবি ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ওই ২৮ জন সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন। বর্তমানে তারা সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের ৫০ গজ ভেতরে রয়েছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই পতাকা বৈঠকে বিএসএফ ২৮ জনকে ঠেলে পাঠানোর কথা স্বীকার করে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করা হবে বলেও বিজিবিকে আশ্বস্ত করেন বিএসএফের কর্মকর্তারা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএসএফের পক্ষ থেকে বিজিবিকে আর কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিবির রাজশাহী সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কামাল হোসেন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত