শেকড় থেকে আধুনিক সুরের ভুবনে ঋভু আনন
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ১৮:২৬ আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ১৯:০৮

লোকজ সংগীতের শেকড় থেকে উঠে এসে রক ঘরানার শক্তিশালী প্রভাবের সঙ্গে নিজের আলাদা সংগীতভাষা তৈরির চেষ্টা করছেন তরুণ সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। গান, দর্শন, প্রযুক্তি, শিল্পভাবনা ও বাংলাদেশের সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন নিথর মাহবুব।
ঢাকার সেন্ট্রাল রোডে জন্ম, হাতিরপুলে বেড়ে ওঠা। পরে মায়ের সরকারি চাকরির সূত্রে কিছুটা সময় কেটেছে নারায়ণগঞ্জে, যেখানে পৈত্রিক শেকড়ের সঙ্গেও তৈরি হয়েছে গভীর পরিচয়। তারপর আবার ঢাকা, সেখান থেকে ভারতের পথে যাত্রা। ভারতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে আবারও ঢাকাতেই অবস্থান করছেন তিনি। শহর, শেকড় আর ভিন্ন সংস্কৃতির মিশেলে তার ভেতরে তৈরি হয়েছে এক আলাদা দীপ্তি।
এই দীপ্তি কৃত্রিমভাবে তৈরি হয় না; জন্ম নেয় পরিবার, সংস্কৃতি, জীবনবোধ আর দীর্ঘ আত্মচর্চা থেকে। ঠিক তেমনই এক শিল্পী ঋভু আনন। তার কণ্ঠে লোকজ মাটি যেমন ধরা দেয়, তেমনি রক সংগীতের বিদ্রোহও খুঁজে পায় নিজের ভাষা। তার এই নিজস্বতা তাকে ধীরে ধীরে স্টেজ, স্টুডিও, ব্যান্ড—এমনকি চলচ্চিত্রের অঙ্গনেও নিয়ে গেছে। ঋভু আননের কাছে গান কেবল পেশা নয়—প্রার্থনা।
সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। ছবি: সংগৃহীত
প্রার্থনার মতো করে গানকে ধারণ করা ঋভু আনন বলেন, “পারিবারিক সূত্রেই আমার সংগীতে হাতেখড়ি। আমার নানা সুরুজ মিয়া ছিলেন বাউল, তবে আমার প্রথম তালিম মায়ের কাছে। ছোটবেলার ঘরোয়া পরিবেশেই শুনেছি রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান, হাসন রাজার গানসহ বাংলা সংগীতের প্রায় সব ধারার সুর। সেই সুরের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে আমার নিজস্ব সংগীতচেতনা।”
সংগীতচেতনার সেই পথ একসময় তাকে টেনে নেয় রক ঘরানার দিকে। কৈশোরেই ব্যান্ড সংগীতের প্রতি তৈরি হয় তার তীব্র আকর্ষণ। বিশ্বখ্যাত আমেরিকান হেভি মেটাল ব্যান্ড ‘মেটালিকা’র প্রধান ভোকালিস্ট জেমস হেটফিল্ড তার পছন্দের শিল্পীদের একজন। তবে পাশ্চাত্যের রকের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও তিনি কখনো নিজের মাটি হারাননি; বরং সাধনা করেছেন লোকজ আর আধুনিক সুরের মাঝখানে নিজের আলাদা ভাষা খুঁজে পেতে।
ভাষা খোঁজার সেই সাধনায় পরিবারের সমর্থন ছিল ঋভু আননের সবচেয়ে বড় শক্তি। সংগীতপ্রেমী পরিবার হওয়ায় শিল্পের সাধনায় কখনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি এই শিল্পীকে। শিল্পী বলেন, “পরিবারের উৎসাহই আমার পথকে আরও সহজ করেছে, যুগিয়েছে সাহস। ফলে খুব ছোট বয়সে মঞ্চে ওঠার সাহস হয়েছে আমার। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম স্টেজ পারফরম্যান্স করি। সেদিন একটুও নার্ভাস হইনি। এতটাই স্বাভাবিক ছিলাম, যেন মঞ্চটা আমার নিজের জায়গা।”
সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। ছবি: সংগৃহীত
নিজের জায়গায় শক্ত অবস্থান গড়তেই একসময় তিনি পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সময় পরিচয় হয় ভিন্নধর্মী সংগীতচর্চার সঙ্গে। ঋভু আনন বলেন, “সেখানে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘রংতুলি’-র সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার শিল্পীজীবনে নতুন মোড় এনে দেয়। আর ২০১৮ সালে ইউটিউবে প্রকাশ পায় এই ব্যান্ডের কভার সং ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’। আমাদের যৌথ কণ্ঠে গাওয়া শাহ আবদুল করিমের এই গানটি থেকে শ্রোতাদের ভালো সাড়া পাই।”
সেই সাড়াকেই পুঁজি করে দেশে ফিরে ঋভু আনন গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড ‘অডিওস্কোপ’। বর্তমানে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবামের কাজ নিয়েই কাটছে তার ব্যস্ত সময়। আটটি গান নিয়ে সাজানো হচ্ছে অ্যালবামটি। পাশাপাশি সম্প্রতি একটি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। গানটির সুর ও সংগীত আয়োজন তারই করা। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা সেই কাজ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঋভুর রয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস।
উচ্ছ্বাস থাকলেও সঙ্গে আছে চিন্তা—শ্রোতা-দর্শকদের নিয়ে। দর্শকদের কাছে নিজের কাজ প্রশংসা নিয়ে এলে এই উচ্ছ্বাস পূর্ণতা পাবে। তবে নিজের কাজ নিয়ে তিনি আশাবাদী। কারণ তার সংগীতের ভেতরে কেবল বিনোদনের গল্প নেই; সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক টানাপোড়েন, দেশপ্রেম, মহাকাল, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, আধ্যাত্মিকতা, প্রেম কিংবা বিচ্ছেদ—জীবনের বিস্তৃত অনুভূতিগুলোই উঠে আসে তার গানে। যেন প্রতিটি গান হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অনুভব আর সামাজিক বাস্তবতার এক মিশ্র প্রতিচ্ছবি।
সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। ছবি: সংগৃহীত
মিশ্র প্রতিচ্ছবির সেই প্রতিক্রিয়া শ্রোতা-দর্শকদের কাছ থেকে সরাসরি পেতে ভালোবাসেন ঋভু আনন। যে কারণে স্টুডিওর পাশাপাশি লাইভ পারফরম্যান্সও তার কাছে সমান আবেগের। কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং—এ প্রশ্নে নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেন না। কারণ তার ভাষায়, গানই তার জীবনযাপন। ফলে স্টেজের উন্মাদনা কিংবা স্টুডিওর নিখুঁত কাজ—দুটোর মধ্যেই তিনি খুঁজে পান নিজের অস্তিত্ব।
অস্তিত্বের এই জায়গা থেকেই তিনি বর্তমান ডিজিটাল যুগের ইউটিউব, ফেসবুক, স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মকে সাদরে গ্রহণ করছেন। ঋভু আননের মতে, নতুন শিল্পীদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো অসাধারণ সুযোগের জায়গা। তার ভাষায়, এই মাধ্যমগুলো ঘরে ঘরে শিল্পী তৈরি করছে। তবে একই সঙ্গে ভাইরাল সংস্কৃতির চাপ নিয়েও তার স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। ভিউয়ের জন্য সংগীতের সঙ্গে আপস করতে তিনি নারাজ। নিজের পছন্দের সংগীত নিয়েই কাজ করতে চান, কারণ শিল্প তার কাছে কখনোই সংখ্যার খেলা নয়।
সংখ্যার খেলায় বিশ্বাস না করলেও প্রযুক্তির প্রভাবকে তিনি অস্বীকার করেন না। তবে অটো-টিউন ও AI মিউজিকের মতো বিষয়গুলোতে তার অবস্থান বেশ কঠোর। নিজেকে তিনি এ বিষয়ে ‘বিপ্লবী’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার বিশ্বাস, যন্ত্রের নিখুঁততায় সংগীত প্রাণ পায় না; সংগীতের আত্মা জন্ম নেয় মানুষের অনুভূতিতে।
সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। ছবি: সংগৃহীত
অনুভূতির সেই জায়গা থেকেই শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে চান ঋভু আনন। শ্রোতাদের চাহিদা আর নিজের শিল্পভাবনা—এই দুইয়ের সমন্বয় কীভাবে করেন? সমালোচনাকে কীভাবে দেখেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্পী বলেন, “শ্রোতার মনোভাব যখন গানের ভেতরে প্রতিফলিত হয়, তখনই শিল্পভাবনার সঙ্গে এক ধরনের জাদু তৈরি হয়।” সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সমালোচনাকে দূরে ঠেলে দিই না। বরং সমালোচকদের সঙ্গে গান নিয়ে আড্ডা দিতেই বেশি পছন্দ করি।”
পছন্দের গানের জগতেই ভ্রমণের মধ্যদিয়ে ঋভু আনন কাটিয়ে দিতে চান সারাটা জীবন, এগিয়ে যেতে চান বহু দূরে। প্রসঙ্গক্রমে তরুণ এই শিল্পী বলেন, “কখনোই গান ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারি না। সংগীত আমার কাছে কেবল ক্যারিয়ার নয়; জীবন, বিশ্বাস আর আত্মপরিচয়ের আরেক নাম। তাই মানুষ যেন আমাকে মনে রাখে—এমন কিছু কাজ করতে চাই।”
নিজের কাজের ভেতর দিয়েই তিনি বাংলাদেশের সংগীতের ভবিষ্যৎকেও উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখেন। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের সংগীত ইতিমধ্যেই বিশ্বমানের জায়গায় পৌঁছে গেছে। বাংলা ভাষার গান এখন বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে, আর সেটাই তাকে গর্বিত করে। তবে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে কিছুটা চিন্তিত তিনি। তার মতে, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে অভাব দেখা যায়, তা হলো ধৈর্য ও অধ্যবসায়।
সংগীতশিল্পী ঋভু আনন। ছবি: সংগৃহীত
অধ্যবসায়ের সেই উপলব্ধিই যেন ধীরে ধীরে ঋভু আননের জীবনজুড়ে ছাপ রেখে চলেছে। বাউল ঘরানার শেকড়, রকের বিস্ফোরণ, আধ্যাত্মিক ভাবনা আর আধুনিক সংগীতচর্চা—সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের সুরের ভুবনে। যে ভুবনে গান কেবল সুর কিংবা শব্দের সমষ্টি নয়, বরং অনুভূতির এক দীর্ঘ যাত্রা। আর সেই যাত্রাপথেই ঋভু আনন রেখে যেতে চান নিজের উপস্থিতি—শ্রোতার হৃদয়ে, সময়ের ভেতরে।
বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম










