ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ১ মিনিট আগে
শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ১৬:৪৬  
আপডেট :
 ১৭ জুন ২০২৬, ১৬:৫৭

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার খসড়া চুক্তিতে ইরানে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে আর এই বিশাল অঙ্কের তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে বলে এই চুক্তির বিষয়ে সরাসরি অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রটি জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতেই মূলত এই তহবিলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন ও তেহরান আসছে শুক্রবার চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর এই পরিকল্পনাটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।

এই তহবিলের অস্তিত্বের কথা আগে আংশিক জানা গেলেও, এটি যে সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতের অর্থায়নে গঠিত হচ্ছে এবং এর অর্ধেকের বেশি অর্থ ইতোমধ্যে বিভিন্ন পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে গেছে, তা রয়টার্সই প্রথম প্রকাশ করল।

রোববার মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা যুদ্ধ শেষ করতে একটি খসড়া রূপরেখায় সম্মত হওয়ার কথা জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।

এই চুক্তির ফলে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন অবরোধ বন্ধ হবে এবং বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হবে।

নতুন এই তহবিলটি সম্পূর্ণ একটি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যম গঠিত হবে। এটি কোনো পুনর্গঠন বা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি নয় এবং এতে কোনো দেশের সরকারি অর্থ বা অনুদান থাকবে না বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশসমূহ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানি এতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সূত্রটি জানায়, এই প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ মূলত জ্বালানি, লজিস্টিকস, ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন এবং পরিবহন খাতে ব্যয় করা হবে।

রয়টার্সকে ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তেহরান শুরুতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ আমেরিকার কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, কিন্তু ওয়াশিংটন তা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়।

এরপরই মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই বেসরকারি তহবিলের বিকল্প ধারণাটি সামনে আসে, যার নাম দেওয়া হচ্ছে ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল’।

ইরানি সূত্রটি আরও জানায়, এই ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্ন উপায়ে এতে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ নিশ্চিত করা, ক্রেডিট লাইন তৈরি করা বা সরাসরি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠনে অর্থায়ন করা।

এর আওতায় যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মোবারাকেহ স্টিল কমপ্লেক্স, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং সামগ্রিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা হবে।

পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও, গত চার দশক ধরে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ধারাবাহিক আঘাতে, বৈশ্বিক পুঁজি বাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় ইরানে উল্লেখযোগ্য কোনো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসেনি।

অথচ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ইরান অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ, যার প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং প্রমাণিত তেলের মজুত বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম।

এছাড়া দেশটির রয়েছে ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, একটি বহুমুখী শিল্প ভিত্তি এবং পেট্রোকেমিক্যাল ও খনি থেকে শুরু করে পর্যটন ও কৃষি খাতের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

এই চুক্তির বিষয়ে অবগত সূত্রটি জানায়, এই বিনিয়োগ তহবিলটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছাড়ের সমান্তরাল আরেকটি পৃথক আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি এই দুটি বিষয়কে ভিন্ন উদ্দেশ্য ও ভিন্ন সময়সীমার দুটি স্বতন্ত্র আর্থিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

একটি চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই তহবিলটি গঠন করা হবে না বা এটি কার্যকর হবে না। এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটির একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করা হবে।

সূত্রটি বলেছে, “চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেই কেবল এই তহবিল গঠন করা হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে তহবিলের প্রশাসকেরা ইরানি কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও পরিধি নির্ধারণে কাজ করবেন।”

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এই বিনিয়োগ তহবিল চুক্তিতে মধ্যস্থতা করতে সাহায্য করা পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি, জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র গত সোমবার সিবিএস-কে দেওয়া মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেন।

সেখানে ভ্যান্স বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের সাথে চুক্তি পুরোপুরি মেনে চললে উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তায় গঠিত এই ৩০ হাজার কোটি ডলারের ‘পুনর্গঠন তহবিল’ এর সুবিধা পেতে পারে ইরান।

তবে এর জন্য ইরানকে অবশ্যই তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও প্রয়োগ ব্যবস্থা মেনে নিতে হবে।

সূত্রটি অবশ্য এই তহবিল কীভাবে বা কার দ্বারা পরিচালিত হবে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে যে এর মূল বিবরণগুলো নিয়ে কাজ করা এখনও বাকি রয়েছে।

সূত্রটি দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির নাম উল্লেখ করেছে যারা এই অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে পুরো তালিকাটি প্রকাশ করতে সম্মত হয়নি।

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া ৬০ দিনের এই সমঝোতা স্মারকটি কেবল একটি প্রাথমিক রূপরেখা, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়।

এই সময়সীমার মধ্যে মার্কিন ও ইরানি আলোচকেরা পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক বিষয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা চালিয়ে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত