ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১৫:১১

প্রিন্ট

সেখানে একটাই স্লোগান: ‘ভাগ ইন্ডিয়া, ভাগ’

সেখানে একটাই স্লোগান: ‘ভাগ ইন্ডিয়া, ভাগ’
এটাই কাশ্মেীরিদের মনের কথা
অনলাইন ডেস্ক

ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেয়ার পর বিক্ষব্ধ গোটা এলাকা। কিন্তু মোদি সরকারের আরোপিত কঠোর নিরাপত্তার বলয় ভেঙে এই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তাই খাঁচায় বন্দি বাঘের মতোই ফুঁসছে কাশ্মীরের বাসিন্দারা। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাজ্যের সৌরা এলাকাটি। ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এখানকর বাসিন্দারা। ফলে বার কয়েক চেষ্টা চালিয়েও প্রতিরোধের ব্যুহ ভেঙে সৌরায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ ভারতীয় সেনা-পুলিশ।

ভারত বিরোধী অবস্থানের জন্যই বরাবরই সৌরা এলাকাটির সুনাম রয়েছে। এ কারণে এ এলাকাটির আরেক নাম‘কাশ্মীরের গাজা’। গাজা অঞ্চলের ফিলিস্তিনিরা যেমন দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছে, সৌরার বাসিন্দারাও তেমনি ভারতের মতো বিশাল এক সাম্রাজবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের আগ্রাসন ঠেকাতে দিন-রাত তৎপর রয়েছেন এখানকার স্বাধীনতাপ্রিয় বাসিন্দারা। জীবনের বিনিময়ে হলেও তারা নিজেদের জন্মভূমির রক্ষায় বদ্ধপরিকর।

কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের লাল চক থেকে ১১ দশমিক ১ কিলোমিটা উত্তরে অবস্থিত এই ছিটমহলটি। এখানে রয়েছে কাশ্মীরের সবচেয়ে উন্নত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। তবে বহু আগে থেকেই এই ছোট্ট এলাকাটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কাশ্মীরের ঐতিহাসিক নেতা শেখ আবদুল্লাহর জন্মস্থান হিসেবে।

গত ৫ আগস্ট মোদি সরকার অধিকৃত কাশ্মীরের ওপর থেকে ৩৭০ ধারা তুলে নেয়ার পর থেকে উদ্বেগে সৌরার বাসিন্দারা। তারা ভারতীয় সেনাদের প্রতিরোধে এলাকার প্রবেশপথে পাথর আর গাছের গুড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। মসজিদ থেকে মুহুর্মুহু ভেসে আসছে স্বাধীনতার স্লোগান।

গত ৫ আগস্ট হঠাৎ করেই জম্মু কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দানকারী সংবিধানের ৩৭০ ধারাটি বাতিল করার ঘোষণা দেয় মোদি সরকার। এর আগে থেকেই সেখানে লাখ লাখ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত। আর সে সময় থেকেই নিয়মিত মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আসছে সৌরার জনগণ। আগস্টের শুরু থেকেই এলাকার প্রবেশপথে টিন, গাছের গুঁড়ি, তেলের টিন আর সিমেন্টের পিলার দিয়ে প্রতিবন্ধকতা গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভারতীয় সেনারা এখানে প্রবেশ করতে না পারে।

এ সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা মুফিদ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থারএএফপি’কে বলেন, ‘ভারতীয় সেনারা কেবল আমাদের লাশের ওপর দিয়ে সৌরায় প্রবেশ করতে পারবে। আমরা ভারতকে এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দিব না।’

সৌরার তরুণ আর যুবকরা রাতে গোটা এলাকা পর্যায়ক্রমে পাহারা দিয়ে থাকেন। মুফিদ এই পাহারাদারদেরই একজন।

তিনি বলেন, ‘গাজার বাসিন্দারা যেভাবে দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তেমনি আমরাও নিজেদের মাতৃভূমিকে রক্ষায় লড়াই করছি।’

জম্মু-কাশ্মীরের ওপর থেকে ৩৭০ ধারা তুলে নেয়ার আগেই রাজ্যটিতে অতিরিক্ত ৫ লাখ সেনা মোতায়েন করেছে ভারত, যাতে এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করতে না পারে সেখানকার জনগণ। গোটা রাজ্য জুড়ে এখনও বলবৎ আছে কারফিউ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে শত শত কাশ্মীরি নেতা-কর্মীদের। এই অবস্থার মধ্যেও ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে সেখানকার লোকজন। মোদি সরকারের এই ঘোষনার বিরুদ্ধে গত ৯ আগস্ট শ্রীনগরে যে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে সেখানে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল। ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর জম্মু-কাশ্মীরে এটাই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।

‘ভাগ ইন্ডিয়া, ভাগ’

কাশ্মীরের সৌরা এলাকায় দু হাজারের বেশি বাড়ি রয়েছে। এলাকাটির তিন দিকই ঘিরে রেখেছে ভারতীয় সেনারা। এখানকার বিখ্যাত জেনাব সায়েব মসজিদকে ঘিরেই চলছে সহস্রাধিক লোকের বিক্ষোভ। প্রতি রাতে টর্চ হাতে পালাক্রমে এর সরু গলিগুলো পাহারা দেয় এলাকার বাসিন্দারা। এ সময় তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘কাশ্মীরের মুক্তি চাই’, কিংবা ‘ভাগ ইন্ডিয়া, ভাগ’। এইসব স্লোগানের মাধ্যমে তার ভারতীয় সেনাদের তথা মোদি সরকারকে জোরালোভাবে এই বার্তাটাই দিতে চায় যে, কাশ্মীরিদের নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা পরিত্যাগ করুন।

সৌরার বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ করতে ইতিমধ্যে এর বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে প্রচুর সেনা আর পুলিশ। এখানকার বাসিন্দাদের তৎপরতা নজরদারি করতে নিয়োগ করা হয়েছে ড্রোন আর হেলিকপ্টার। চলতি মাসেই তিন তিনবার সৌরায় প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছে নিরাপত্তা বহিনী। কিন্তু সৌরার যুবকরা পাথর ছুড়ে তাদের সেই চেষ্টা নিষ্ফল করে দিয়েছে। এসময় কারো কারো হাতে ছিল কুঠার আর হারপুন। আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে কী চমৎকার প্রতিরক্ষা, তাই না! কিন্তু তাদের মানসিক শক্তির কাছে হার মেনেছে আধুনক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ভারতীয় বহিনী। পুলিশের কাপুরোষিচিত টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে তারা নুনজলে মুখ ধুয়েছেন। আর ছররা বন্দুকের আঘাত থেকে রক্ষা পেতে মাথা ঢেকেছিল হেমলেট দিয়ে।

ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে বাইরে আসা তিন কৌতুহলী তরুণকে আটক করেছে ভারতীয় পুলিশ। স্থানীয় যুবক নাহিদ এএফপিকে বলেন, ‘তারা (ভারত) আমাদের ধৈর্যে্যর পরীক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু এতে তারা অবশ্যই ব্যর্থ হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা গতবার তাদের পরাজিত করেছিলাম এবং এই পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকলেও আমরা তাদের কোনোরকম ছাড় দেব না।’

কাশ্মীরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর জন্মভূমি এই সৌরা, যিনি ১৯৪৭ সালে অবাধ স্বায়ত্ত্বশাসনের শর্তে কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তার দল আরো বেশি স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে লড়ছে। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পর্যায়ক্রমে কাশ্মীর শাসন করেছে তার পুত্র ফারুক আবদুল্লাহ এবং নাতি ওমর আবদুল্লাহ। গত ৫ আগস্ট কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের আগের রাতে তাদেরও আটক করেছে ভারত সরকার।

সৌরায় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আরও ভারত-বিরোধী আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে যখন জনপ্রিয় কাশ্মীরি যোদ্ধার নিহত হওয়ার ঘটনায় সেখানকার সড়কগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তখন সরকারি বাহিনীর সাথে কয়েক ডজন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল সৌরার বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

সৌরার অধিকাংশ বাসিন্দাদের মতো রফিক মনসুর শাহ-ও মনে করেন, শেখ আবদুল্লাহর ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরকে যুক্ত করার ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ এত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কাশ্মীরের লোকজনকে।

এবার ৩৭০ ধারা বাতিল করার ফলে ভারতীয়রা এখন সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবে এবং অধিকৃত কাশ্মীরে সম্পত্তি কিনতে পারবে। তবে মনসুর শাহের মতো সৌরার অধিকাংশ লোকজনের বিশ্বাস করেন, ‘নয়াদিল্লি আমাদের জমি দখলের পৈশাচিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতেই এই বিশেষ মর্যাদা বাতিল করেছে।’

তিনি এএফপিকে বলেছে, ‘আবদুল্লাহ পরিবারের ক্ষমতার লোভের কারণে আমরা ভারতের ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছি। আমরা এখন সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের চেষ্টা করছি। আমরা বাকি কাশ্মীরের নেতৃত্ব দিচ্ছি এবং তাদের অনুপ্রেরণা দেয়ার চেষ্টা করছি।’

সৌরার অলিতে গলিতে টহল দিচ্ছে তরুণরা

ডন অবলম্বনে মাহমুদা আকতার

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত