ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৩২ মিনিট আগে

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:৫১

প্রিন্ট

করোনায় ভরসা ডিজিটাল প্রযুক্তি

করোনায় ভরসা ডিজিটাল প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

নাজমুল হোসেন

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ধরা হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তিকে। সে লক্ষ্যে এগুচ্ছে গোটাবিশ্ব। বাংলাদেশও বিগত কয়েকবছর ধরে তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে করোনা অভিঘাতে কাবু গোটা বিশ্ব। করোনা আমাদের বুঝিয়ে দিল আমরা গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি। একটা বিষয় পরিষ্কার; করোনা অন্ধ, মানে না শ্রেণিবৈষম্য। মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা, ডাক্তার, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ধনী, গরিব- সবাইকে ঘরবন্দী করে ফেলেছে করোনা।

তবে আমাদের এই বন্দীদশা অনেকটাই ঘুচিয়ে দিয়েছে ইন্টারনেট। এছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গেও যোগসূত্র (টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ) করে দিয়েছে।

লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং- ইংরেজি শব্দগুলো আমাদের অনেকের কাছেই ছিলো অপরিচিত। মহামারি করোনার কারণে এই শব্দগুলোই এখন বহুচর্চিত।

চলমান এ দুঃসময়ে ইন্টারনেটনির্ভর ইমেইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ভিডিও কনফারেন্স করে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যঝুঁঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এটাকে বলা হচ্ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘ঘরে থেকে কাজ’।

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনলাইনে সভা করার সুবিধার্থে তাদের ডিভাইসে ‘জুম’ অ্যাপ ডাউনলোড করার নির্দেশনা দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

আদালত বন্ধ থাকায় জরুরি মামলা শুনানির জন্য ভার্চুয়াল আদালত চালু করা হয়েছে। হাইকোর্টসহ সারা দেশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম চলছে। এবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলন হয়েছে অনলাইনে। করোনাভাইরাসবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বুলেটিন অনলাইনে ঘোষণা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ছাত্রছাত্রীদের উপবৃত্তির টাকা অভিভাবকদের মোবাইল ফোনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিং, অনলাইন শপিং, অনলাইনে ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, অনলাইনে বিমান ও ট্রেনের টিকিট কেনা- এসবই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

করোনার এ কঠিন সময়ে টেলিমেডিসিনই একমাত্র ভরসা। শুধু অফিসের কাজেই নয়, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যেও এখন আলাপ-আলোচনায় ভিডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিডিও কনফারেন্সিং অ্যাপ ব্যবহার শিখে নিয়েছেন অনেকেই। টেলিভিশনে ‘টকশো’ হচ্ছে ভিডিও অ্যাপ ব্যবহার করে। আলোচকরা যার যার ঘরে বসেই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

বদলে যাচ্ছে পড়াশোনার ধরন। ভার্চুয়াল শিক্ষাদান পদ্ধতির কথা ভাবা হচ্ছে। কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যেই অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ল্যাপটপ থাকলে ভালো। অগত্যা একটা স্মার্টফোন হলেই চলে। বাড়িতে বসেই অনলাইনে পরীক্ষা দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে।

করোনাকালে দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কী ধরনের বেড়েছে- এমন প্রশ্নে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে গত ৯-১০ মাসে আমি কোনো কাগজের ফাইলে সই করিনি। কোনো মিটিংও পেন্ডিং নেই। বরং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, সংগঠন ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে। করোনা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, আমরা কোন যুগে বাস করছি এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের কী করতে হবে।

এদিকে নরওয়েভিত্তিক বহুজাতিক টেলিযোগাযোগ কম্পানি এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন কম্পানি গ্রামীণফোনের মূল অংশীদার টেলিনর সম্প্রতি তাদের এক গবেষণায় করোনার প্রভাবজনিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়. ‘বৈশ্বিক মহামারি-পরবর্তী বিশ্বে আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে না। পেন্ডুলামের কাঁটা এখন পরিবর্তনের দিকে। নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠবে। যারা এত দিন অফিসে বসে কাজ করত, এই বৈশ্বিক মহামারির কারণে তারা বাসা থেকেই কাজ করছে। বিষয়টি মানুষকে নতুন এই সম্ভাবনার কথা ভাবাচ্ছে যে প্রথাগত অফিস অতটা প্রয়োজনীয় নয়।’

অন্যদিকে, বিটিআরসির তথ্য অনুসারে, গত মার্চ মাসে ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল ১০ কোটি ৩২ লাখ ৫৩ হাজার। নভেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে ১১ কোটি ৫৬ লাখে পৌঁছে যায়। শুধু গ্রাহক নয়, ইন্টারনেটের ব্যবহারও বেড়েছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানির তথ্য অনুসারে, গত মার্চ মাসে তাদের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ব্যবহৃত হতো এক হাজার জিবিপিএস আর এখন ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার জিবিপিএস। ৩০ ডিসেম্বরে ব্যবহৃত হয় এক হাজার ৪০৮ জিবিপিএস।

মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসে আর্থিক লেনদেনও অনেক বড়েছে। গত রোববার নগদে লেনদেন পৌঁছায় আড়াই শ কোটি টাকায়। বেড়েছে ই-কমার্স। অনলাইন শপিং অনেকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও সময় বাঁচিয়ে দিচ্ছে। সভা-সেমিনার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম সবই চলছে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে। সম্মেলনকেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টারগুলো প্রায় ফাঁকা।

মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে আকস্মিকভাবে প্রযুক্তির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি কিভাবে সামাল দেয়া যাবে, সেটি এখন আমাদের চিন্তা-ভাবনা করতে হচ্ছে। আমাদের এখন শতভাগ ফোরজি নেটওয়ার্ক না হলে চলবে না। দ্রুত ফাইভজিতেও যেতে হবে।’

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত