ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : ৫৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২০, ১১:৫৫

প্রিন্ট

করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বনেতাদের বেফাঁস মন্তব্য

করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বনেতাদের বেফাঁস মন্তব্য

Evaly

অনলাইন ডেস্ক

করোনাভাইরাসে সারা বিশ্বে এখনও পর্যন্ত ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এতে আক্রান্ত হয়েছেন বিশ্বের ৩০৯টি দেমের ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ। এই মহামারি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো হিমসিম খাচ্ছে।

তবে শুরুর দিকে এই মহামারিকে পাত্তা দিতে চাননি বিশ্বের বেশ কিছু নেতা, যাদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও রয়েছেন। তারা এই মহামারির ভয়াবহতাকে খাটো করে দেখানোর জন্য এমন সব মন্তব্য করেছেন যা নিয়ে লোকজনের মধ্যে ক্রোধ তেরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর কারণে বিশ্বজুড়ে তারা সমালোচিতও হয়েছেন।

যদিও এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা করোনা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এই মহামারির ব্যাপারে নিজেদের সুর সুর পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তবে কোনও কোনও নেতা এখনও তাদের আগের অবস্থানেই অটল রয়েছেন।

এরকম কয়েকটি বিতর্কিত মন্তব্য নিয়েই আমাদের এই নিবন্ধ

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার মাত্র দু'দিন পর (২২ জানুয়ারি) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনবিসিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-নাইনটিনের সংক্রমণকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি।

কিন্তু এর দু'মাস পর সেখানকার পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় যে দেশটি এই মুহূর্তে শীর্ষে রয়েছে সেটি যুক্তরাষ্ট্র।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, এ পর্যন্ত সেখানে মোট করোনায় আক্রান্তের হয়েছেন তিন লাখ ৬৭ হাজার ৩৩০ জন। আর এতে মারা গেছেন দশ হাজারের বেশি মানুষ।

শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক সিটিতেই তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার এই নাটকীয় বৃদ্ধির মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকায় করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এটা সামান্য ফ্লুর মতো: বোলসোনারো

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই জায়ের বোলসোনারো বিতর্কিত সব মন্তব্য করে আসছেন। তারপরেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

তবে ব্রাজিলে কোভিড নাইনটিনের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর থেকে বোলসোনারোর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। সম্প্রতি তিনি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন তা ব্রাজিলের অনেক মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।

লাখ লাখ মানুষ থালা বাসন পিটিয়ে প্রেসিডেন্টের এই ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো যে শুধু এই মহামারিকে খাটো করে দেখিয়েছেন তা নয়, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কিছু নির্দেশনাও তিনি বারবার ভঙ্গ করেছেন। বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নরদের ঘোষিত লকডাউনেরও তিনি বিরোধিতা করছেন।

ব্রাজিলে এখনও পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা ৫ শতাধিক মানুষ।

সম্প্রতি এই সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে মাত্র চার দিনেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা।

আমি আপনাকে কবর দিয়ে দেব: রদ্রিগো

ফিলিপিনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করেননি বরং একে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

দেশটিতে লকডাউন ও কারফিউসহ কঠোর সব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে খাদ্য ঘাটতির প্রতিবাদে একবার রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নির্দেশনা ভঙ্গকারীদের হুমকি দিয়ে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলবে।

গত ২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সরকারকে ভয় ভীতি দেখাবেন না। সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবেন না। আপনি হেরে যাবেন।’

ফিলিপিনে এখনও পর্যন্ত ৩,৬৬০ ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়েছে যাদের দেহে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। আর এতে মারা গেছেন ১৬৩ জন।

করমর্দন নিয়ে চিন্তিত নই: বরিস জনসন

যুক্তরাজ্যে কোভিড-নাইনটিনের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পরেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গত ৩ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তিনি লোকজনের সঙ্গে করমর্দন করার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নন। কেননা তার মতে, ভাইরাসটি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হাত ধোওয়া।

পরে জানা গেছে যে জনসন শুধুমাত্র হাসপাতালের কর্মীদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন, কোনো রোগীর সাথে নয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের ফলে তাকে প্রচুর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জনসনের শরীরের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে ২৭শে মার্চ এবং দশ দিনেও উপসর্গ না কমায় গত রোববার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে।

'আপনি তো এগুলোকে উড়তে দেখেননি: আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো

করোনাভাইরাস মহামারি নিয়ে চরম রসিকতা করেছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। যা নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

তার দেশেও করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলে তিনি হাস্যচ্ছলে তা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি এক সাংবাদিককে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘আপনি তো এই ভাইরাসকে চারপাশে উড়তে দেখেননি, দেখেছেন কি?’

একটি আইস হকি ম্যাচের সময় একজন টিভি সাংবাদিকের কাছে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ম্যাচ দেখতে সেখানে যেসব দর্শক ভিড় করেছিল তাতেও তিনি আপত্তি করেননি। তার বক্তব্য ছিল: ইনডোর স্টেডিয়ামের ভেতরে যে ঠাণ্ডা পরিবেশ সেটা এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করবে।

করোনাভাইরাসের ভীতিকে তিনি ‘মানসিক বৈকল্য’বলেও উল্লেখ করেছেন।

ভাইরাসটি ঠেকানোর জন্য তিনি লোকজনকে সাওনায় যেতে এবং ভোদকা পান করতে পরামর্শ দিয়েছেন। অবশ্য পরে তিনি বলেছেন যে ‘কৌতুক’হিসেবেই তিনি এসব মন্তব্য করেছিলেন।

বেলারুশের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি। এই দেশটিকে উল্লেখ করা হয় ইউরোপের শেষ স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে। দেশটিতে এখনও পর্যন্ত ৭০০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১৩ জন।

পরিবারকে নিয়ে বাইরে খাওয়া চালিয়ে যান: লোপেজ

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস মানুয়েল লোপেজ ওব্রাদোর কোভিড নাইনটিন মোকাবেলায় তার দেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া উপদেশের বিরোধিতা করে আসছেন।

একই সঙ্গে এই ভাইরাসের যে বিপদ সেটাও তিনি খাটো করে দেখিয়েছেন। সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাকে জনসমাগমে যোগ দিতে দেখা গেছে, দেখা গেছে শিশুদের চুম্বন করতে এবং সমর্থকদের ভিড়ে মিশে গিয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানাতে।

মেক্সিকোর পরিস্থিতি তার প্রতিবেশী আমেরিকার ধারে কাছেও যায়নি। দেশটিতে এখনও পর্যন্ত ২,৪৪৩৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মঙ্গলবার সকালেই আক্রান্ত হয়েছেন ২৯৬ জন। সবমিলিয়ে মারা গেছেন ১২৫ জন।

তবে প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মেক্সিকোতে আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখে পৌঁছাতে পারে।

মেক্সিকোতে ৩০ মার্চ জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়। তবে লকডাউন নেই কোনও এলাকায়। ৫০ জনের মতো লোককে এক জায়গায় জড়ো হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

সমকামী বিবাহ আইন দায়ী: আল সদর

ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুক্তাদা আল-সদর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন।

ভাইরাসটির বিস্তার প্রতিরোধে ইরাকে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলো ভঙ্গ করে আল-সদর নামাজের আয়োজন করছেন।

এছাড়াও কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার জন্য তিনি ‘সমকামী বিবাহ আইনকে’ দায়ী করেছেন। কিন্তু যেসব দেশ সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেই ইতালি ও স্পেনে এধরনের বিয়েকে বৈধতা দিয়ে কোনও আইন তৈরি করা হয়নি।

সম্প্রতি তিনি টুইট করে লিখেছেন: ‘যেসব কারণে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে তার একটি হচ্ছে সমকামীদের মধ্যে বিবাহের আইন। সব সরকারের প্রতি আমি আহবান জানাচ্ছি এখনই অবিলম্বে যেন এই আইন বিলুপ্ত করা হয়। এই অনুতপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা দোষ থেকে মুক্তি পাবো।’

ইরাকে এখনও পর্যন্ত ১০৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে যাদের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে এবং ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা এই মর্মে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ইরাকে এই সংখ্যা খুব দ্রুতই বেড়ে যেতে পারে।

জনগণকে আমরা কিছু তথ্য দেইনি: জোকো উইদোদো

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো স্বীকার করেছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তিনি কোভিড-নাইনটিন সংক্রান্ত কিছু তথ্য গোপন করেছিলেন। ঠিক কতোজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন সেটি জানানো হয়নি।

তিনি বলেছেন, লোকজন যাতে পাগলের মতো কেনাকাটা করতে শুরু না করে দেয় সেজন্যেই এই তথ্য গোপন করা হয়েছে।

মার্চের দুই তারিখ পর্যন্ত দেশটিতে করোনাভাইরাসের কোন রোগী শনাক্ত হয়নি। কিন্তু এখন এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় আড়াই হাজারে দাঁড়িয়েছে। মারা গেছেন ২০০ জনেরও বেশি মানুষ।

প্রেসিডেন্ট উইদোদো ৩১শে মার্চ সারা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

লন্ডনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়াতে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ৩৪ হাজারেরও বেশি।

এমাসের শুরুর দিকে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান এক সেমিনারে বলেছিলেন, ভেষজ পানীয় পান করার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার জনগণ কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করতে পারবেন।

বিবিসি বাংলা অবলম্বনে

এমএ/

shopno
  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best