টানা আট রাত হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র, পাল্টা জবাব ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৭ আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইরানে টানা অষ্টম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এতে আক্রান্ত হয়েছে ইরানের একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। জবাবে তেহরানও প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
নতুন করে শুরু হওয়া এ সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র স্মারকের শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছে। এরপর সংবাদমাধ্যম নিউজনেশনকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই পদক্ষেপে তাঁর কিছু আসে যায় না। গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে ওই স্মারক সই হয়েছিল।
সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো আগে থেকেই মানছিল না দুই পক্ষ। শর্ত অনুযায়ী হামলা বন্ধ থাকার কথা, তা হয়নি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের ব্যবস্থাপনায় জাহাজ চলাচল করবে বলে স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ নিয়েও বাগড়া দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের নির্ধারণ করা পথের বাইরে জর্ডান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল করাতে চাইছে তারা। এ বিরোধ থেকেই মূলত নতুন করে সংঘাতের শুরু।
এমন পরিস্থিতিতে গতকালও হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানি বাহিনী। তাদের ভাষ্যমতে, চারটি জাহাজ হরমুজের ‘অনিরাপদ’ রুট ব্যবহার করছিল। ইরানের সতর্কবার্তায় দুটি জাহাজ পিছু হটে। অন্য দুটি জাহাজ ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়। ওই জাহাজ দুটিতে হামলা হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
পরমাণুকেন্দ্রে হামলা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’
হরমুজ নিয়েই মূলত নতুন পাল্টাপাল্টি হামলা চললেও নিউজনেশনকে ট্রাম্প বলেছেন, পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে ইরানকে বিরত রাখাই তাঁদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যের কথা আগেও বলেছিল ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্পের নতুন এ বক্তব্যের মধ্যে গত শনিবার অষ্টম রাতের হামলায় ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ একেবারে শুরুর দিকে ছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা। তারা হামলার বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। আর ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা একে ‘সন্ত্রাসী’ হামলা আখ্যা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্রের চরিত্রই হলো আইনের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো।
মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার রাতের হামলার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরকে শাস্তি দেওয়া। এ রাতে পরমাণুকেন্দ্রের পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চের সিরিক শহরের কাছেও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। হামলা হয়েছে ইরাক সীমান্তবর্তী শাদেগান শহরের কাছেও।
এসব হামলার জবাবে কুয়েতের আল আদিরি ক্যাম্প ও আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে তেহরান। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, গতকাল রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের একটি পানি পরিশোধনাগারে হামলা হয়েছে। গতকাল জর্ডান থেকেও সাইরেনের শব্দ পাওয়া গেছে। দেশটির বাহিনী ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে।
ইরানিদের ঐক্যের ডাক
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চলতে থাকলে জবাব আরও বিপর্যয়কর হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গতকাল ইরানিদের উদ্দেশে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইরানের জনগণের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য।
পাল্টাপাল্টি হামলা ঘিরে যখন আবার পুরোদমে যুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে, এর মধ্যেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরুর পর ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন আল–জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প হয়তো হামলা আরও জোরদার করতে পারেন এবং প্রতিশোধ নিতে পারেন। কিন্তু সামরিক পদক্ষেপ কেবল তখনই নেওয়া উচিত, যখন তার মাধ্যমে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল হয়। মার্কিন হামলা ইরানিদের মনোবল আরও দৃঢ় করতে পারে। এতে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য সাধন অধরা হয়ে পড়বে।
সূত্র : আল–জাজিরা
বাংলাদেশ জার্নাল/জে










