ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ৫ মিনিট আগে
শিরোনাম

৩০ বছর আগে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে, ধর্মেন্দ্রের পথেই ধর্মেন্দ্রকে সরাতে তৎপর ‘আরশোলা’রা!

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:২৮  
আপডেট :
 ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩৭

৩০ বছর আগে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে, ধর্মেন্দ্রের পথেই ধর্মেন্দ্রকে সরাতে তৎপর ‘আরশোলা’রা!
ছবি: সংগৃহীত

নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে উত্তাল রাজধানী। এই আবহে হঠাৎই প্রকাশ্যে এসেছে প্রায় ৩০ বছর আগের একটি ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা। সেখানে প্রশ্নফাঁস আন্দোলনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন বিজেপির ধর্মেন্দ্র।

নিট কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে উত্তাল নয়াদিল্লি। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা। ফলে হাওয়া পাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই আবহে প্রকাশ্যে এসেছে প্রায় ৩০ বছর আগের একটি ঘটনা। সেখানে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে পথে নেমেছিলেন আজকের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী!

সালটা ১৯৯৭। কংগ্রেস-শাসিত ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকীবল্লভ পট্টনায়ক। তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধেও ওঠে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ। ফলে ভুবনেশ্বরে জানকীর বাসভবনের কয়েক কিলোমিটার দূরে ধর্নায় বসেন হাজার দেড়েক ছাত্র-ছাত্রী। তাঁদের নেতৃত্ব দিয়ে রাতারাতি খবরের শিরোনামে উঠে আসেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শুধু তা-ই নয়, রাজ্য সচিবালয়ের সামনে চলা আন্দোলনের জেরে প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে সরকার।

ধর্মেন্দ্র-ঘনিষ্ঠদের কথায়, ওই সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী। তাদেরই ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) নেতৃত্বে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে পথে নামেন তিনি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য ছিল, কোনও অবস্থাতেই এর দায় এড়াতে পারে না জানকী পট্টনায়ক সরকার। যুব সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে কংগ্রেস-শাসিত ওড়িশা প্রশাসন।

এবিভিপিতে যোগদানের সময় ১৮ বছরের তরুণ ছিলেন ধর্মেন্দ্র। উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের এই প্রাক্তনী ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দু’বার সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠনের জাতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের আন্দোলন সফল ভাবে পরিচালনার পর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এর জেরে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) তাঁর যোগদানের রাস্তা যে মসৃণ হয়, তা বলাই বাহুল্য।

১৯৯৭-এর ছাত্র আন্দোলনে ধর্মেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ভুবনেশ্বর আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রশান্ত রাউত। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর মতো তিনিও উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। তবে পড়তেন নিচু ক্লাসে। তাঁর কথায়, ‘‘প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আমরা গুটি কয়েক প়়ড়ুয়া সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করি। কিন্তু অচিরেই বাড়তে থাকে ভিড়। একসময় সেটা ১,৫০০-র আশপাশে গিয়ে পৌঁছোয়।’’

রাউত জানিয়েছেন, আন্দোলনের শুরুর দিকে পুলিশ-প্রশাসন কিছুই বলেনি। বিক্ষোভও ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু, পরে রণক্ষেত্রের চেহারা নয় ওই এলাকা। আরএমডি কলেজের অধ্যক্ষ বলেছেন, ‘‘তখন খুব ভয় পেয়ে যাই। ধর্মেন্দ্র তো উর্দিধারীদের হাতে বেধড়ক মার খেয়েছিল। ওর বেশ কয়েকটা হাড়ও ভেঙে যায়। তবে আন্দোলনের জায়গা থেকে সরে আসেনি।’’

এর পাশাপাশি স্মৃতিচারণায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন নির্বাচনের প্রসঙ্গও টানেন রাউত। তিনি জানিয়েছেন, গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকের ওই ভোটগুলি প্রায়ই হিংসাত্মক আকার নিত। ফলে জয় নিশ্চিত হওয়ায় বিরোধী সমর্থকদের হাতে বেশ কয়েক বার ধর্মেন্দ্রকে মার খেতে হয়েছে। ‘‘প্রধান কেবলমাত্র ভাগ্যের জোরে বেঁচে আছেন’’— এই কথাও তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা ধর্মেন্দ্রের সাংগঠিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত। বিজেপিতে যোগ দিয়েও দীর্ঘ দিন সেই কাজ করেন তিনি। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। এ ছাড়া সামলেছেন দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা মন্ত্রকও।

২০০০-’০৯ সাল পর্যন্ত ওড়িশার শাসনক্ষমতায় ছিল বিজু জনতা দলের (বিজেডি) দলের জোট সরকার। এর অন্যতম শরিক ছিল বিজেপি। পরে সেই জোট ভেঙে বেরিয়ে যায় তারা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে উৎকল রাজ্যের কুর্সি দখল করে পদ্ম শিবির। ফলে দু’দশকের বেশি সময় পর ক্ষমতা হারান বিজেডি সুপ্রিমো তথা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক।

ওড়িশায় বিজেপির এই বিপুল জয়ের কৃতিত্ব অনেকাংশেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দিয়ে থাকেন রাজনৈতিক মহল। কারণ, তাঁর হাত ধরেই উৎকল রাজ্যের কোনায় কোনায় গড়ে ওঠে গেরুয়া শিবিরের সংগঠন। এর লভ্যাংশ ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঘরে তোলে মোদীর দল।

চলতি বছরের ৩ মে ডাক্তারির প্রবেশিকা নিটের (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসে কেন্দ্র। তড়িঘড়ি পরীক্ষা বাতিল করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তার পরেও বিতর্ক এড়াতে পারেননি তিনি। কারণ ততক্ষণে নিটের নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) গ্রহণযোগ্যতার উপর উঠে যায় আঙুল।

গত ২১ জুন ডাক্তারি প্রবেশিকার পুনঃপরীক্ষার আয়োজন করে সরকার। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, প্রশ্নফাঁসের জেরে ‘আত্মঘাতী’ হয়েছেন অন্তত ১০-১২ জন পড়ুয়া। এর জেরে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে লাগাতার আন্দোলনে নামেন ছাত্রছাত্রীদের একাংশ। সেখানে আমরণ অনশনে বসেন লাদাখের সমাজসৈনিক সোনম ওয়াংচুক। এর জেরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রশাসন।

সোনম যন্তর মন্তর ছাড়লেও বিক্ষোভের আগুন এতটুকু কমেনি। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গত ২০ জুলাই সিজেপির নেতৃত্বে সংসদ ভবন অভিযান করেন আন্দোলনরত পড়ুয়ারা। মাঝরাস্তায় তাঁদের আটকায় পুলিশ। শুরু হয় দু’পক্ষের ধস্তাধস্তি। শেষপর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে লাঠিচার্জ করেন উর্দিধারীরা। সেই ছবি প্রকাশ্যে আসতেই দেশ জুড়ে ওঠে সমালোচনার ঝড়।

এই পরিস্থিতিতে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) মোদী লেখেন, ‘‘প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে। তাঁদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার। সেই লক্ষ্যে আমরা ‘ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আধিকারিকদের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।’’

কিন্তু, এর পরেও আন্দোলন থামাতে রাজি নয় সিজেপি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পুনরায় পোস্ট করে ফের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে তারা। ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে উত্তাল হয় সংসদ চত্বর। সংসদের মকরদ্বারের সামনে বিক্ষোভ দেখান বিরোধীরা। সেখানে সরকারপক্ষ অর্থাৎ এনডিএ-র সাংসদেরা স্লোগান দিলে জটিল হয় পরিস্থিতি। রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের যুবসমাজকে রাহুল গাঁধী প্ররোচিত করছেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

বিরোধীদের বিক্ষোভে শামিল হন গাঁধী পরিবারের তিন সদস্য। তাঁরা হলেন সনিয়া, রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা। গোটা বাদল অধিবেশনের জন্য নিলম্বিত (সাসপেন্ড) হলেও সেখানে ছিলেন তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এনসিপিআই-এ মিশে যাওয়া ঘাসফুল শিবিরের ২০ জন সাংসদকে নিয়ে কটাক্ষ করে স্লোগান দিতে দেখা যায় তাঁকে। কল্যাণ চিৎকার করে বলেন, ‘‘বিজেপির সঙ্গে সংসদে ২০ জন গদ্দার রয়েছে।’’

বিরোধী সাংসদদের জমায়েত থেকে স্লোগান ওঠে, “জীবন বাঁচাও, নিট বন্ধ করো।” বিরোধী সাংসদদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করা হয়। অন্য দিকে, এনডিএ সাংসদদের জমায়েত থেকে স্লোগান ওঠে, “যুবসমাজকে ঘাঁটিও না, রাহুল গাঁধী জেগে ওঠো।”

একসময় দু’পক্ষের স্লোগানযুদ্ধে সরগরম হয়ে ওঠে সংসদ চত্বর। মুখোমুখি চলে আসেন শাসক এবং বিরোধী সাংসদেরা। সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস বিজেপি নেতা অরুণ সিংহের হাত থেকে একটি পোস্টার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। শেষমেশ দু’পক্ষের মাঝে মানববন্ধন করে দাঁড়িয়ে পড়েন সংসদের নিরাপত্তারক্ষীরা। তার পরেও স্লোগানযুদ্ধ চলতে থাকে।

বিজেপির অভিযোগ, নিট-কাণ্ড নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে রাজি সরকার। কিন্তু, কংগ্রেস আলোচনায় যোগ না দিয়ে সংসদের সময় নষ্ট করছে। কংগ্রেসের পাল্টা দাবি, প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কে যোগ দেওয়ার সাহস নেই। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে লাগাতার প্রধানমন্ত্রীকে নিশানা করতে দেখা যাচ্ছে রাহুল গাঁধীকে।

অন্য দিকে, সিজেপির সংসদ অভিযানে পড়ুয়াদের উপর লাঠিচার্জের নিন্দা করেছে সঙ্ঘ। এর জেরে সরকারের ভাবমূর্তি খারাপ হয়েছে বলেই মনে করে আরএসএস। তবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে খারিজ করেছে তারা। এই পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।

সূত্র : আনন্দবাজার ডট কম

বাংলাদেশ জার্নাল/জে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত