ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ২৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

জেন-জি’র দাপটে তরুণদের নজিরবিহীন জয়, মন্ত্রীর বিদায়ের পর এবার নিশানা কে?

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৮:০৭  
আপডেট :
 ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৮:১১

জেন-জি’র দাপটে তরুণদের নজিরবিহীন জয়, মন্ত্রীর বিদায়ের পর এবার নিশানা কে?
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর টানা ১২ বছরের শাসনামলে এর আগে মাত্র একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন, আর তাও ছিল যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে।

ফলে রাজপথে টানা এক সপ্তাহের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের মুখে গত শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সরে দাঁড়ানোকে কেবল একটি পদত্যাগ হিসেবে দেখছেন না দেশটির তরুণরা। তাদের কাছে এটি এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রতীক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে ভারতের এই উদীয়মান তরুণ আন্দোলনের পেছনের ক্ষোভ, সামাজিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

দিল্লির ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী সখী বলেন, “জীবনে প্রথমবার মনে হলো, রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।”

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদী সরকারের এক শীর্ষ মন্ত্রীর পুরোনো একটি ভিডিও ঘুরে বেড়াতে শুরু করে, যেখানে দম্ভ ভরে তাকে বলতে শোনা গিয়েছিল, “আমাদের সরকারে পদত্যাগ বলে কিছু হয় না।”

এখন ভিডিওটি শেয়ার করে তরুণরা তাদের এই ঐতিহাসিক সাফল্য উদযাপন করছে।

সখী জানান, ছোটবেলা থেকে পাঠ্যপুস্তকে তারা পড়েছেন যে গণতন্ত্রের মূল শক্তিসূত্র হলো দ্বিমত পোষণের অধিকার।

“কিন্তু মোদী সরকারের আমলে বাস্তবে আমি এর কোনো অস্তিত্ব দেখিনি,” বলেন তিনি।

আন্দোলন চলাকালে সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পুলিশের লাঠিচার্জ ও সহপাঠীদের গ্রেপ্তারের ভিডিওর পাশাপাশি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে নানা ব্যাঙ্গাত্মক রিলস শেয়ার করেন সখী, যা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

সখীর মতে, সরকার তরুণদের এই আন্দোলনের গতি ও গভীরতা আঁচ করতেই পারেনি।

কারণ তরুণদের ভাষা ও তারা কোন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, সে সম্পর্কে শাসকগোষ্ঠীর কোনো সঠিক ধারণা ছিল না।

“সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলধারার গণমাধ্যম, ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু তারা ইনস্টাগ্রামের শক্তিকে হিসাবের বাইরে রেখেছিল।”

নিট প্রশ্নফাঁস ও ‘সিজেপি’র উত্থান

চলতি বছরের মে মাসে দেশের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা 'নিট'-এর প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারি ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে অসন্তোষের আগুন জ্বলে ওঠে। পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে ফের পরীক্ষার টেবিলে বসতে বাধ্য করা হয়। এই চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ সইতে না পেরে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে, তাদের পরিবারগুলো এই প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকেই এর জন্য সরাসরি দায়ী করেছে।

শিক্ষার্থীদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সুসংগঠিত রূপ দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।

ভারতের প্রধান বিচারপতি এক মন্তব্যে ভুয়া ডিগ্রিধারী ও বেকার তরুণদের 'তেলাপোকা'র সঙ্গে তুলনা করার পর এই দলের জন্ম হয়। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার এবং প্রাণ হারানো পরীক্ষার্থীদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে দিল্লিতে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন।

শুরুতে আন্দোলনটি প্রচারের আলো না পেলেও ১৮ জুলাই পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। সেদিন দিল্লিতে অনশনরত প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এর দুদিন পর, ২০ জুলাই, সিজেপি-র ডাকে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ চড়াও হয়। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং ছররা গুলি ব্যবহারের দৃশ্য ভিডিওর মাধ্যমে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়।

দমন-পীড়ন চালিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা উল্টো আগুনে ঘি ঢালে, বাড়িয়ে দেয় রাজপথে হাজার হাজার তরুণের উপস্থিতি।

মুম্বাইয়ে প্রতিবাদের ডাকে সাড়া দেওয়ার অপরাধে ২৬ বছর বয়সী সোমায়া কোর্দেকে তার নিজ বাড়িতেই গৃহবন্দী করে পুলিশ। ছবি: বিবিসি মুম্বাইয়ে প্রতিবাদের ডাকে সাড়া দেওয়ার অপরাধে ২৬ বছর বয়সী সোমায়া কোর্দেকে তার নিজ বাড়িতেই গৃহবন্দী করে পুলিশ। ছবি: বিবিসি

সামাজিক বৈষম্য, তীব্র বেকারত্ব ও ভাঙা স্বপ্ন

তরুণদের এই ক্ষোভের আগুন দ্রুত দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও।

২০ জুলাই মুম্বাইয়ে প্রতিবাদের ডাকে সাড়া দেওয়ার অপরাধে ২৬ বছর বয়সী সোমায়া কোর্দেকে তার নিজ বাড়িতেই গৃহবন্দী করে পুলিশ। তবে ছাড়া পাওয়ার পর দমেননি তিনি; পরবর্তী দিনগুলোতে রাজপথের প্রতিবাদের প্রথম সারিতে দেখা গেছে তাকে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রসঙ্গে সোমায়া বলেন, “এটি কোনো শেষ নয়, স্রেফ শুরু। আমাদের এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জীবনে প্রথমবার রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু কথা বলার মতো আরও বহু বড় সংকট সামনে রয়ে গেছে আর আমরা সেগুলো নিয়ে কথা বলবই।”

নিজের পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে আইন বিষয়ে স্নাতক হওয়া সোমায়া স্থানীয় পৌরসভা নির্বাচনে লড়াই করা একজন তরুণ প্রার্থী।

তিনি সরকারিভাবে 'অনগ্রসর' হিসেবে চিহ্নিত এক বঞ্চিত সামাজিক সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছেন। ভারতের লাখ লাখ তরুণের মতো তিনিও শিক্ষাকেই ভাগ্য বদলের একমাত্র হাতিয়ার ভাবতেন। কিন্তু নিট প্রশ্নফাঁস তার সেই বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

সোমায়া বলেন, “স্কুল-কলেজগুলো দিনে দিনে বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হচ্ছে আর পড়াশোনা শেষ করলেও চাকরি মিলছে না। এই পুরো ব্যবস্থা নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের কাছে তো জবাবদিহিতা চাইতেই হবে।”

সোমায়ার এই ক্ষোভ ভারতের বর্তমান যুব সমাজের সার্বিক চিত্রের প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ভারতে গত জুনে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

এমনকি উচ্চশিক্ষা শেষ করেও মেলেনি স্বস্তি। ২০ ২৬ সালে আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ৭ শতাংশের কম তরুণ বছরে একটি স্থায়ী বেতনের চাকরি জোগাড় করতে পারছেন, আর মাত্র ৪ শতাংশের মতো সুযোগ পাচ্ছেন সম্মানজনক দাপ্তরিক বা হোয়াইট-কলার চাকরিতে।

পুলিশের ভয় ভেঙে জেগে ওঠা ‘জেন-জি’

সব শঙ্কা ও দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছে এই প্রজন্ম। তাদেরই একজন ১৮ বছর বয়সী হর্ষবর্ধন কদম। গত বছর বাবার মৃত্যুর পর সংসার সামলাতে পড়াশোনা শেষ করেই ল্যাপটপ বিক্রির পার্ট-টাইম কাজে যোগ দেন তিনি।

গত ২৩ জুলাই মুম্বাইয়ে এক পদযাত্রার সময় হর্ষবর্ধনের তোলা একটি ভিডিও তোলপাড় সৃষ্টি করে। ইনস্টাগ্রামের সেই রিলে দেখা যায়, ভ্যানে তোলার সময় এক পুলিশ কনস্টেবল হর্ষবর্ধনকে ভুয়া মাদকের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। ভিডিওটি এক কোটিরও বেশি বার দেখা হওয়ার পর বাধ্য হয়ে ওই কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ।

বিবিসিকে হর্ষবর্ধন বলেন, “ওই পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারাক, তা আমি চাইনি। আমি শুধু দেখাতে চেয়েছিলাম যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ায় পুলিশ আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে।” শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে তার স্পষ্ট বক্তব্য, “এটি কেবল সূচনা। এটি প্রমাণ করেছে, এর পর থেকে আমরা সরব হলে সরকার ভয় পাবে।”

একই অনুভূতির কথা জানান গুয়াহাটির ২৯ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার স্বরাজ প্রিয়। মোদী সরকারের আমলে বছরের পর বছর প্রতিবাদ করেও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না দেখে একপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

তবে তরুণদের এই আন্দোলন তার মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

স্বরাজ বলেন, “এই আন্দোলন প্রশ্ন তোলা আর ভিন্নমত পোষণের জায়গাটা ফের ফিরিয়ে এনেছে। আমাদের নতুন করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে যে সব শেষ হয়ে যায়নি।”

সরকার যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, আন্দোলনের স্থানগুলোতে নজর দিলেই তা বোঝা যায়। বিক্ষোভস্থলগুলোতে ঝুলতে থাকা পোস্টারে এখন লেখা, ‘প্রধান কেবল একটি নমুনা, এবার মোদীর পালা’।

পাটনার ৩০ বছর বয়সী তরুণী ও প্রায় এক দশক ধরে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বারুণী পূর্বা। ছবি: বিবিসি পাটনার ৩০ বছর বয়সী তরুণী ও প্রায় এক দশক ধরে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বারুণী পূর্বা। ছবি: বিবিসি

দমন-পীড়নের ভয় ও ভবিষ্যতের শঙ্কা

তবে এই অর্জনের উল্টো পিঠে রয়েছে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা।

পাটনার ৩০ বছর বয়সী তরুণী ও প্রায় এক দশক ধরে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বারুণী পূর্বা জানান, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ প্রমাণ করেছে রাজপথের দাবিতে মোদী সরকারকেও হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা যায়।

তবে আন্দোলনকারীদের স্পর্শ না করার সরকারি আশ্বাস সত্ত্বেও, পেছনের সংগঠকদের খুঁজে খুঁজে হয়রানি করার আশঙ্কা করছেন বারুণী। গ্রেপ্তার এড়াতে গত এক সপ্তাহ ধরে তাকে আগাম জামিনের দরজায় কড়া নাড়তে হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশ ১০০ জনেরও বেশি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ গুরুতর ধারায় মামলা করেছে আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ৪০ জনকে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ সতর্ক করে বলেছে, মোদী সরকার প্রায়শই কাল্পনিক সন্ত্রাসবাদ বা বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের অজুহাতে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি নিপীড়ন চালিয়ে থাকে।

পুলিশি দমন-পীড়ন নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মা-বাবার মনে গভীর উদ্বেগ থাকলেও বারুণী পূর্বা বিশ্বাস করেন, এই আন্দোলন তরুণদের মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, তরুণ প্রজন্মের অন্তরে জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশার অবসান না হওয়া পর্যন্ত সরকারের পক্ষে আর ‘পুরোনো ধারায়’ ফেরা সম্ভব হবে না।

দিল্লির একটি বিক্ষোভস্থলের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতেই ফুটে উঠেছে আন্দোলনকারীদের এই অদম্য রূপ, “আমাদের হাতে কোনো চাকরি নেই। আজ তোমরা এই লেখা মুছে দিলে, কাল আমরা আবার ফিরে আসব।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত