ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : ৯ মিনিট আগে
শিরোনাম

গ্যাসের ঘাটতিতে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প সংকট

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৯  
আপডেট :
 ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩

গ্যাসের ঘাটতিতে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প সংকট
ছবি: সংগৃহীত

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, গৃহস্থালি ও সিএনজি খাতে গ্যাসের ঘাটতি তীব্র হয়েছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকটের কারণে আপাতত নতুন শিল্প-সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সাধারণ সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন ও বিতরণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০ জুলাই এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ছিল ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট। ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ পাঁচ দিনে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ কমেছে ৪৯ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট বা প্রায় ৫০ শতাংশ।

এই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে। তবে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৪ কোটি ১ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ২১৫ কোটি ১৭ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সংকটের মূল কারণ

বাংলাদেশের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। সমুদ্রপথে আমদানি করা এলএনজি এসব টার্মিনালে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এর একটি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, ত্রুটিগ্রস্ত টার্মিনাল থেকে আগামী সপ্তাহে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় প্রভাব

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের পরিচালন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৯২ কোটি ৬৮ লাখ ঘনফুট। ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ পাঁচ দিনে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ২২ কোটি ৭৯ লাখ ঘনফুট বা প্রায় ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

এর প্রভাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। দৈনিক উৎপাদন ১২ কোটি ৫৫ লাখ ৬৮ হাজার ইউনিট থেকে নেমে হয়েছে ৯ কোটি ৩৯ লাখ ৮৪ হাজার ইউনিট। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অংশও ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।

লোডশেডিং বেড়েছে কয়েক গুণ

২০ জুলাই সন্ধ্যায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫১১ মেগাওয়াট এবং উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। ২৫ জুলাই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াটে, কিন্তু উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৭৮৫ মেগাওয়াট।

ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান ১৭৯ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৯০৮ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

২০ জুলাই সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২৫৩ মেগাওয়াট। ২৫ জুলাই রাত ১১টায় তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াটে পৌঁছে। ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং ছিল ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে।

কয়লা ও তেলভিত্তিক উৎপাদনে চাপ

গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।

২০ জুলাইয়ের তুলনায় ২৫ জুলাই কয়লাভিত্তিক উৎপাদন প্রায় ১৩ শতাংশ এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে একই সময়ে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কিছুটা কমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয়ও বেড়েছে। প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ৬ টাকা ৩১ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৯ পয়সায় পৌঁছেছে, যা প্রায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্যাসের ঘাটতি পূরণে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে চলতি বছরের সর্বোচ্চ উৎপাদন করা হয়েছে। তারপরও চাহিদার পুরোটা মেটানো সম্ভব হয়নি।

গৃহস্থালি ও শিল্পে সংকট তীব্র

গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায়।

২০ জুলাই তিতাসের মোট গ্যাস বিতরণ ছিল ১৪৮ কোটি ১ লাখ ঘনফুট। ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ১২০ কোটি ৯৪ লাখ ঘনফুটে। অর্থাৎ পাঁচ দিনে বিতরণ কমেছে ২৭ কোটি ৭ লাখ ঘনফুট বা ১৮ শতাংশের বেশি।

তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সর্বশেষ সরবরাহ ছিল প্রায় ১২১ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রায় ৭৯ কোটি ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাবে রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বিদ্যুচ্চালিত চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, এতে বিদ্যুৎ ব্যয়ও বাড়ছে।

নতুন শিল্প-সংযোগ বন্ধ

গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া এবং এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার আপাতত শিল্পে নতুন গ্যাস-সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ১৪ জুলাই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতিতে নতুন শিল্প-সংযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে না।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত সাময়িক। গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সরকার একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে অগ্রাধিকার তালিকার ভিত্তিতে সংযোগ দেওয়া হবে। যাঁরা অনুমোদন নিয়ে ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন, তাঁদের আগে বিবেচনা করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চ্যালেঞ্জ

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং নতুন কূপ খনন করেও উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হলেও পরে তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

বর্তমানে আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব। তবে বিদ্যমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি বাড়ানোও সহজ নয়।

সরকার ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনা, নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ, সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান এবং পর্যায়ক্রমে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির উৎস ও সরবরাহ অবকাঠামো বহুমুখী করার উদ্যোগও রয়েছে।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আমদানির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অনুমোদনের পর বিনিয়োগ সম্পন্ন করা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন সংযোগ না দিলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব সরবরাহ বাড়িয়ে সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বর্তমান গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি হলেও, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, লোডশেডিং বেড়েছে, শিল্প ও গৃহস্থালিতে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে এবং নতুন শিল্প-সংযোগও স্থগিত রাখতে হয়েছে।

সূত্র: বিডি নিউজ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত