ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ২ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : ৪৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১৬:১৩

প্রিন্ট

ভাসতে চেয়েছিলাম হাওরের জলেভাসা সড়কে

ভাসতে চেয়েছিলাম হাওরের জলেভাসা সড়কে
ছবি: অলওয়েদার রোড

শওকত জামান

হাওর বাওড়, ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ঈসা খাঁর বীরভূমি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইনে দেখতে এসেছিলাম নীল জলরাশির উপর জেগে থাকা ৩৫ কিলোমিটার পিচঢালা অলওয়েদার রোড। হাওরের বুকচিরে দু’ভাগ করে এগিয়ে যাওয়া নৈসর্গিক নিদর্শন। হাওর বেষ্টিত তিন উপজেলা মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগের মোহনা।

কিছুদিন আগেও ভরা বর্ষায় নীল জলরাশি ডুবিয়ে দিয়েছিল দিগন্তসীমার সবটুকু। সড়কের দু’পাশে নীল জলরাশির উত্তাল ঢেউ আর জলকেলি খেলা দেখতেই এসেছিলাম পরিবার নিয়ে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই হাওর ধুসর রঙে রাঙিয়ে জল বাড়ি চলে যাবে এ আমার জানা ছিলো না। গিয়ে দেখি স্বপ্নের সেই সড়কের দু’পাশে যতদূর চোখ যায় শুধুই ফসলি জমি আর ধুলিওড়া সরু সড়কপথ, কোথাও মেঠোপথ, স্থানে স্থানে বিল এবং রেখে যাওয়া কদাচিৎ পানি।

সদ্য জেগে ওঠা ফসলি জমিতে হাওর অঞ্চলের কৃষকেরা ঘুরে দাঁড়াতে চাষবাস নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানোর কর্মযজ্ঞের চিত্র। হাওরের নীল জলের উপর ভেসে থাকা সড়কপথ দেখার সৌভাগ্য কেটে গেলেও হাওরের প্রকৃতি পরিবেশ, বালিহাঁস, উড়ে যাওয়া সাদা বক পাখিসহ নানা প্রজাতির পাখির কলরব আর হাওরবাসীর জীবন-জীবিকার চিত্র দেখলাম দু’চোখ ভরে। হাওরের পানির উপর ভেসে সড়ক দেখতে না পেয়ে মনকষ্টের মধ্যে হাওরের পরিবেশ প্রকৃতির ভালোলাগার ভ্রমণকাহিনী তুলে ধরবো আপনাদের সামনে।

ভ্রমণ পিপাসু আনন্দ উল্লাসিত মন নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের শহিদি মসজিদ সংলগ্ন উকিল পাড়ায় বড় বোন নাজনিন আপার বাড়ি থেকে পরিবারের ৬ সদস্যের টিম নিয়ে রওনা দেয় হাওরের নীল জলের উপর নৈসর্গিক সড়ক দেখতে। আমরা এসেছি খুশিতে বড় আপা কর্মস্থল করিমগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে হাজিরা দিয়ে ছুটি নিয়ে আনন্দ বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সফর সঙ্গী হতে। আনন্দ বাজার থেকে আমাদের সাথে যোগ দিল বড় আপা। আমাদের নিয়ে বহন করা অটোবাইক ছুটে চললো বালিখলা নৌঘাটের দিকে। যাবো হাওর ভ্রমণে।

অলওয়েদার রোড

দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা দুরন্ত অটোবাইক থেকে চোখে পড়ছে হাওরে বর্ষায় আসা পানির তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়া ঘরবাড়ি মেরামত করছে হাওরবাসীরা। বুক সমান পানির দাগ নিয়ে গাছপালা আমাদের চারপাশে ঘুরছে। দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বালিখলা নৌঘাটে। ট্রলার নৌকা চেপে জনপ্রতি ৫ টাকা ভাড়ায় নদী পাড় হয়ে আসনপুরে নৌকা থেকে নেমে ফের সিএনজিতে উঠে হাওরের সড়ক পথ ধরে মিঠামইনের ইসলামপুর ফেরি ঘাটে পৌঁছলাম।

ফেরি পার হয়ে চলে গেলাম কামালপুর হাওরের বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের দৃষ্টিনন্দন বাড়িতে। এই ভবনটি দেখতে দেশের নানাস্থান থেকে নানা বয়সী উৎসুক পর্যটকরা ভীর করছে প্রতিদিন। আমরাও গিয়েছিলাম দেখতে। আব্দুল হামিদের পুরনো বাড়ি ঠিক রেখে নতুন হাওরের বঙ্গভবন দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

প্রেসিডেন্টের ভবন দর্শন শেষে অটোবাইকে জলে ভাসা সড়কের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কাঙ্ক্ষিত সড়কে পৌঁছে দৃষ্টিনন্দন সড়ক পেলাম, তবে পেলাম না সড়কের দু’পাশে পানি আর বাতাসে বইয়ে যাওয়া ঢেউ। মসৃণ সড়কে ঘুরতে ঘুরতে হাওরের প্রকৃতির খেলা দেখতে দেখতে পৌঁছলাম তিন উপজেলার মধ্যে সেতুবন্ধন মোড়ে। মোড়ে ফুসকার দোকানে বসে সকলে ফুসকা খাওয়া আড্ডা ও ছবি তুললাম সড়কের নানাদিকে। সড়কটি পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ বিলাসের উপকরণ মনে হলেও স্থানীয়দের জন্য আশীর্বাদ। ‘বর্ষাকালে নাউ, শুকনাকালে পাও’ স্থানীয়দের মধ্যে যুগ যুগ ধরে চলা এই প্রবাদকে হাওরের জলে ডুবিয়ে দিয়েছে এই সড়ক। সড়কটি হাওরের প্রাণ ভোমরায় পরিণত হয়েছে।

বলছিলাম হাওর-বাওড়ের দেশ কিশোরগঞ্জের কথা। সেখানের নিকলী হাওর আর মিঠামইনের জলের বুকচিরে চলে যাওয়া মসৃণ সড়কের কথা।

নিকলীর পথে পথে

গত অর্থবছরে ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এতে ব্যয় হয় এক হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এই সড়কে ভ্রমণ বিলাসে মেতেছেন পর্যটকরা। ইতিমধ্যে ড্রোন প্রযুক্তির সহায়তায় পাখির চোখে সেই সড়ককে দেখেছে ভ্রমণ পিপাসুরা। যেন উত্তাল জলের ওপর দিয়ে কালো মসৃণ কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে কেউ।

সড়কটি কিশোরগঞ্জের তিন হাওর উপজেলা ইটনা-মিঠামইন ও অষ্টগ্রামকে এক করেছে। সারা বছর জুড়েই এ রাস্তায় চলাচল করা যাচ্ছে। রাস্তাটি হাওরের চেহারাই বদলে দিয়েছে। এটিই এখন পর্যটকদের মূল আকর্ষণ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সড়কটির ছবিতে সয়লাব। নেটিজেনদের অনেকের প্রোফাইলে শোভিত হচ্ছে এই সড়ক। ভ্রমণ ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হচ্ছে নানা কায়দায় তোলা সড়কটির ছবি। কেউ কেউ সড়কটির ফাঁকে ফাঁকে স্থাপিত মনকাড়া সেতুগুলোয় দাঁড়িয়ে সেলফি নিয়ে নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে পোস্ট করছেন। আমি সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে পোস্ট করলাম নানা আঙ্গিকে তোলা আমার ও পরিবারের ছবি।

নিকলীর পথে পথ

এমন সুদর্শিনী হাওরের কোথাও রাতযাপনের সুব্যবস্থা নেই। তাই গভীর রাতে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারছেন না সৌন্দর্য উপভোগের আহ্বানকারী মিঠামইন। তাছাড়া এখানে ভালো মানের হোটেল-মোটেল নেই। শৌচাগারও নেই।

হাওরের রাজপুত্র রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে বলবো, হাওরবাসীকে আপনি অনেক দিয়েছেন, হাওরের উপর সৌন্দর্যের নিদর্শন ও হাওরবাসীর জীবনযাত্রা দেখতে আসা ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের জন্য নতুন এই পর্যটন কেন্দ্রটি পর্যটন বান্ধব গড়ে তুলবেন প্রত্যাশা রাখলাম আপনার কাছে।

সর্বশেষ একটি কথা সবার উদ্দেশে বলছি, আমাদের মতো বর্ষার শেষে কেউ আসবেন না কিন্তু? আসবেন ভরা বর্ষায়, সাগরের ঢেউয়ের মতো হাওরের পানির উপর জলে ভাসা সড়কের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যে হারিয়ে যাবেন ভ্রমণ আনন্দে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত