ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ২৬ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২০, ২৩:৫৯

প্রিন্ট

চেরি ফুলের দেশে

চেরি ফুলের দেশে
শাহজাহান সরদার

৩. ব্যাংকক

ব্যাংকক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বাইরে লাউঞ্জে আসতে সময় হয়ে যায় দুপুর একটা। ব্যাংকক ৩৪ ঘণ্টা অবস্থান করতে হবে। পরের রাতে ১০টায় জাপান এয়ার লাইন্সের বিমানে টোকিও যাত্রা। বাংলাদেশে জাল যায় না বলে ব্যাংকক পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান। ব্যাংকক বিমান বন্দর থেকে আমাকে গাড়িতে হোটেলে নিয়ে যাওয়া এবং থাকার কুপন আমার টিকিটের সাথেই দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোথা থেকে যাব, কে নিয়ে যাবে? বিভিন্ন হোটেলের কাউন্টারে গেলাম। কেউ কিছু বলতে পারল না, আবার কেউ এড়িয়ে গেল। ব্যাগ নিয়ে বিমান বন্দরে ঘুরাফেরা ঝামেলার ব্যাপার। একবার বোম্বে বিমান বন্দরে আমি ফ্লাইটের ঝামেলায় খুবই বিপদে পড়েছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। যে কারণে নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। যাত্রীরা এসে ফ্লাইট না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হন। আমিও এদের একজন ছিলাম। পরে দু’দিন বোম্বের আভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরে দাঁড়িয়ে থেকে চান্সের টিকেটে কলকাতা হয়ে ঢাকা এসেছিলাম। সে সময় স্যুটকেস-ব্যাগ নিয়ে বোম্বে বিমানবন্দরে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল তা মনে হলে আজও কষ্ট হয়।

ব্যাংকক বিমান বন্দরে অবতরণের বিভিন্ন কাউন্টার ঘুরে যখন যানবাহনের কোনো ব্যবস্থা হলো না, জালের কাউকে খুঁজে পেলাম না তখন নিরাপত্তা কাউন্টারে যেয়ে আমার সমস্যার কথা বলতেই কর্মকর্তাটি টেলিফোন ঘুরিয়ে আমার হাতে রিসিভার দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম না কাকে দিল, কার সাথে কথা বলব। রিসিভার হাতে নিয়ে আমি হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে মহিলা কণ্ঠের আওয়াজ। মহিলাটি আধো ইংরেজিতে জানতে চাইলেন সমস্যা কি? আমি বলার পর জাপান এয়ারলাইন্স (জাল) অফিস-এ যোগাযোগ করতে বলে কিছু জিজ্ঞেস করার আগে ফোন রেখে দিলেন। এবার আমি খুঁজতে থাকি জাল অফিস। বিমান বন্দরে চারতলা লিফটে উঠে যেয়ে হাজির হলাম জাল অফিসে। আমি যখন পৌঁছি তখন বেলা দেড়টা। জালের মূল কাউন্টর তখনও সামনে দিয়ে খোলেনি। প্রশাসন অফিস খোলা আছে। দরজায় নক করতে এক থাই লোক এসে খুলে দেন। লোকটি আমাকে নিয়ে যান বুকিং কর্মকর্তার কাছে। কর্মকর্তাটি আমার স্টপওভার দেখে আবার টিকিট কাউন্টারে পাঠান। কাউন্টার সামনের দিক বন্ধ থাকলেও পিছনের দিক খোলা ছিল। ভিতরে এক মহিলা নিবিষ্টচিত্তে কম্পিউটারের বোতাম টিপছে। আমাকে দেখে হাত দিয়ে দূরের সোফায় বসতে বলেন। আমি বসি। ৫ মিনিট পর কম্পিউটার রেখে আমাকে ডাকলেন। টিকেটটি আমি তাঁর হাতে দিলাম। টিকিট দেখে বললেন তুমি কিছু পাবে না। কানেকটিং ফ্লাইট থাকলে স্টপওভার হয় না। তাঁর কথা শুনে আমার শরীর ঘামাতে থাকে। এখানে আমার তেমন কেউ পরিচিত নেই যে, কিছু একটা করব। কারও ফোন ঠিকানা জানি না। যেহেতু ঢাকা থেকে বলা হয়েছে জালই সব ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দিয়েছে। তাই কারও ফোন, ঠিকানা আনা হয় নি। আমার কাছে মহিলা টিকিটটি ফিরিয়ে দিয়ে আবার কম্পিউটারের কাজ করতে বসলেন। আমি আবার তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে থাকি ঢাকার জাল অফিস আমাকে এভাবে টিকিট দিয়েছে। আমার ঐড়ংঃ-দের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে ১৫ই সেপ্টেম্বর নারিতা পৌঁছুব। তাঁরা সে মতে থাকবে। এখন আমার পক্ষে কীভাবে টোকিও রওনা দেয়া সম্ভব? আর তোমাদের টিকিটে ভ্রমণ করে আমি সমস্যা পোহাব কেন? বরং তুমি ঢাকা অফিসকে বলতে পারনা কেন এমন করেছে? কোন যাত্রীকে এভাবে হয়রানি করা কি ঠিক? আমার কথায় মহিলা আবার টিকিটটি হাতে নিয়ে বলল ঠিক আছে আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, হোটেলের যে কুপন আছে এতেই চলবে। তবে তোমাকে খাবার দেয়া যাবে না।

আমি মনে মনে স্বস্তি পেলাম, তবুও কিছু ব্যবস্থা হোক। গাড়ি এবং হোটেলের কূপন হাতে নিয়ে আমি হেসে তাকে বললাম, তোমার দেশে এসেছি অথচ তুমি খাবারের ব্যবস্থা করবে না এটা কেমন কথা? শুনেছি থাইল্যান্ডবাসী খুব অতিথিপরায়ণ। জাল-এ কর্মরত এ থাইল্যান্ডের মহিলা আমার কথা শুনে হেসে বলল, “সম্ভব নয়। কেননা এর জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। আমি বললাম ঠিক আছে, তবুও তোমাকে ধন্যবাদ। এই বিশাল ব্যাংকক শহরে নিশ্চয়ই আমার খাবারের সমস্যা হবে না। যা পেয়েছি তাতেই আমি সন্তুষ্ট। নিচে নেমে এসে লিমোজিন সার্ভিস-এর কাউন্টারে কুপনটি দিতেই ড্রাইভার ডেকে এনে আমাকে গাড়িতে তুলে দেয়া হল। সাথে সুইজারল্যান্ডের এক ভদ্রলোক। তিনি যাবেন অন্য আরেক হোটেলে। আর আমি সিলন রোড়ের নারাই হোটেলে। বিমানবন্দর থেকে নারাই হোটেলে আসতে সময় লেগেছে দেড় ঘণ্টা। সে সময় ব্যাংককে এখনকার মতো এত ফ্লাইওভার ছিল না। এখন দোতলা তিনতলা ফ্লাইওভার। টোল দিয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে গেল ১৫ মিনিটেই নারাই হোটেলে পৌঁছা যায়। দেড় ঘন্টার মধ্যে ৪০ মিনিট গাড়ি আটকা ছিল ট্রাফিক জ্যামে। রাস্তায় মানুষের চাইতে গাড়ি বেশি। আধিক্য প্রাইভেটকারের। ট্রাফিক জ্যাম ব্যাপক হলেও ব্যাংককে এক গাড়ি আরেক গাড়িকে ওভারটেক করে না। একটার পিছনে আরেকটা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ঢাকা হলে ওভারটেক প্রতিযোগিতা হত।

আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় এত জ্যামের মধ্যেও কোনো আওয়াজ নেই। কোথাও হর্নের আওয়াজ শোনা যায় না। অকারণে হর্ন বাজিয়ে জনজীবনে কোন ধরনের অসুবিধা সৃষ্টির জন্য সে দেশে শাস্তির বিধান আছে। আর গাড়িতে ধূমপান পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কোনো প্রাইভেট কারে বসেও কেউ ধূমপান করতে পারে না। ধরা পড়লে জরিমানা এবং জেল। ব্যাংককে সর্বত্র মহিলাদের প্রাধান্য। দোকান কর্মচারী, বিমানবন্দরের ক্লিনার, হোটেলের কর্মচারী থেকে শুরু করে সব অফিস আদালতে মহিলাদের সংখ্যা বেশি। তারা সকল ধরনের কাজ করে। আমাদের দেশে পুরুষরা যেসব শক্ত কাজ করে ব্যাংককে মহিলারা এর চাইতে বেশি শক্ত কাজ করে। আর পর্যটকদের জন্য ব্যাংকক নগরী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। থাইল্যান্ডের মূল আয় পর্যটন শিল্প থেকে আসে। এ আয় দিয়েই আধুনিক থাইল্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে।

নারাই হোটেলে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বিকাল ৫টার দিকে বের হলাম খেতে। যাতে পথ হারিয়ে না ফেলি তাই সোজা হাঁটছিলাম। ইচ্ছে করেই গাড়িতে উঠিনি। হেঁটে হেঁটে দেখার আনন্দই আলাদা। যদিও ব্যাংকক আমার এই প্রথম আসা নয় তবুও আমি হাঁটার পথই ধরলাম। রাস্তার দু’ধারে ফুটপাতে অসংখ্যা হোটেল। তবে আমাদের দেশের মতো নয়। ব্যাংককের ফুটপাতের হোটেলেই ফ্রিজ, ঠান্ডা পানীয় কোকাকোলাসহ সব উন্নতমানের ব্যবস্থা আছে। থাইল্যান্ডবাসীসহ বিদেশী পর্যটকদের প্রতিটি হোটেলেই ভিড়। এসব হোটেলে থাই স্টাইলের খাবার পরিবেশন করা হয়। আগে ব্যাংককে এসেছি বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে। থাকা খাওয়া সবই ছিল আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায়।

এবার একা। যাত্রা পতে বিরতি। তাই এই প্রথম খাবার নিয়ে সমস্যায় পড়লাম। যেসব খাবার পর্যটকরা বসে খাচ্ছে তা আমার পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় প্রায় প্রতিটি ফুটপাত এবং অপেক্ষাকৃত রাস্তার বড় হোটেলের সামনে আমাদের দেশের গামলার মত পাত্রে জ্যান্ত চিংড়ি মাছ রাখা আছে। কোথাও কোথাও কাঁচের পাত্রেও আছে। আমি দাঁড়িয়ে এ দৃর্শ দেখি। এসব চিংড়ি যেভাবে রান্না করা হচ্ছে তাতে আমার রুচি এলো না খাবারের প্রতি। কিন্তু কিছু খেতে তো হবে। হাঁটতে থাকলাম ফুটপাতের রাস্তা ধরে। দক্ষিণ-পূর্বদিক ঘুরে আবার উত্তর-পশ্চিমে রওনা দিলাম। আরেকটি বিষয় খেয়ালে এলো প্রতিটি ফুটপাতের হোটেলেই বড় চুলা এবং কড়াই আছে। অর্ডার দিলে খাবার তৈরি করে দেয়। এক হোটেলের সামনে আমি দাঁড়িয়ে দেখি কিভাবে রান্না হচ্ছে। ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়েছে। আমি বসে পড়লাম ফুটপাতের এক হোটেলে। কিন্তু আবার সমস্যা। ভাষা সমস্যা। আকারে-ইঙ্গিতে কিছু ভেজিটেবল দিতে বলি আর কোকোকোলা। দেখলাম হোটেলের বাবুর্চি একটা লম্বা ডাটা টুকরো করে কেটে আর একটা শশা কেটে কড়াইয়ে সয়াসজ ঢেলে দিল। কিছুক্ষণ পর কড়াই থেকে তুলে আমাকে একটি প্লেটে দিয়ে খেতে বলল। আমি খেতে থাকি। বলতে গেলে কাঁচা ডাটা আর শশা। টক টক লাগছিল। ক্ষুধা থাকায় আমি সবই খেয়ে ফেলি। তারপর বরফের পানি এবং কোকাকোলা পান করে বিল দিতে যেয়ে অবাক হই। মোট ৩৪ বাথ মানে আমাদের ৫৬ টাকা। বর্তমানে প্রায় ১০০ টাকা। যা হোক বিল মিটিয়ে আমি কয়েকটি বড় ডিপার্টমেন্টাল মার্কেট ঘুরে হোটেলে ফিরে আসি রাত ৯টায়।

দু’দিন আগে মানে ১৩ই সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে মে মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। আমাদের দেশে নির্বাচন হলে যেমন হৈ-চৈ পড়ে যায়, পোস্টার-ব্যানার ইত্যাদিতে শহর ছেয়ে যায়, ব্যাংককে এমন কিছু চোখে পড়েনি। লাইট পোস্টে কিছু ব্যানার এবং ফেস্টুন চোখে পড়েছে। আকারে খুব ছোট তবে ছবি আছে। কোনো কোনো পোস্টারে ৪/৫ জনের ছবিও দেখা গেছে। এমনটি আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশের মতো নির্বাচনে এত রমরমা প্রচার, বিপুল পরিমাণ ব্যয় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে হয় না। ১৯৯০ সালে আমি প্রাগ সফরে গিয়েছিলাম। তখন প্রাগ ছিল চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী। এখন চেক এবং শ্লোভাক দু’টি দেশ হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক নীতি পরিহার করে সবেমাত্র তৎকালীন চেকোশ্লোভাকিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রে আসে। সে দেশের নির্বাচনও আমি দেখেছি। দলের নাম্বার দিয়ে প্রার্থীদের ছবি সম্বলিত আমাদের লিফলেটের মত নিউজপ্রিন্টের ছোট পোস্টার বিভিন্ন লাইট পোস্টে সাটানো। আমাদের দেশের মত বাড়িঘর কিংবা অফিস আদালতের দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয় না। ব্যাংককেও ঠিক এমনই দেখলাম।

১৫ই সেপ্টেম্বর সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে হোটেল থেকে বের হই সকাল ৮টায়। প্রথমে নাস্তা সেরে তারপর সংবাদপত্রের খোঁজ করব। ঘুরে ফিরে দেখাও উদ্দেশ্য। প্রথমেই নাস্তার জন্য রেস্তোরাঁ খুঁজতে থাকি। ব্যাংকক শহরে আমাদের দেশের মত নাস্তার হোটেল অনেক আছে। কিন্তু আমার চেনা নইে। খুঁজতে থাকলাম। এমন হোটেল পেলাম না। ঢুকলাম একটি রুটির দোকান। কিন্তু বসে খাবার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমি ১০ বাথ দিয়ে বাটারযুক্ত দু’টি বনরুটি কিনে হাঁটতে থাকি। চায়ের দোকান পাওয়া যায় কিনা। ব্যাংককে পর্যটকরা হাঁটছে আর খাচ্ছে। তাদের হোটেল আর রেস্তোরাঁর দরকার হয় না। এরা সাদা চামড়ার। আমাদের এমন অভ্যাস নেই। হাঁটতে হাঁটতে খেতে পারলাম না। চায়ের দোকানও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ হেঁটে এক ডিপার্টমেন্টাল মার্কেটের আন্ডার গ্রাউন্ডে খুঁজে পাই একটি কফি হাউজ। আমি ঢুকে পড়ি। এক কাপ চায়ের অর্ডার দেই। কিন্তু চা এক কাপ এল না, এল পুরো এক কেতলি। বুঝলাম বেশ দণ্ড দিতে হবে। রুটির প্যাকেটটি খুলে খেতে থাকি। হোটেল কর্মচারীরা আমার এ ধরনের আচরণে মনে হয় বিস্মিত হল। খদ্দেরদের কেউ কেউ চেয়ে দেখছিল। বাইরে থেকে রুটি এনে এখানে কেউ খায় বলে মনে হলো না। আমি এসব দেখেও না দেখার ভান করে খাওয়া শেষ করি। ব্যাংককের কোন রেস্তোরাঁয় আমাদের দেশের মত বিনামূল্যে গ্লাস ভর্তি পানি পাওয়া যায় না। সব স্থানেই পানি বিক্রি হয়। পানি চাইলে বরফসহ পানি দিবে। দাম কোকাকোলার চাইতে কম নয়। কফি হাউজে আমি ইধহমশড়শ চড়ংঃ, ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐবৎধষফ ঞৎরনঁহব পত্রিকা দু’টি পড়ি। ৩২/৪০ পৃষ্ঠার পত্রিকা। দু’টি পত্রিকায়ই সেদিন থাইল্যান্ডের নির্বাচন সংক্রান্ত খবর প্রাধান্য পেয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইধহমশড়শ চড়ংঃ পত্রিকায় নির্বাচনের ফলাফল এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর প্রধানসহ জেনারেলদের মন্তব্য ছাপা হয়েছে। তাঁরা গণতন্ত্র সুদৃঢ় করার কথা বলেছেন। আর কোনো ধরনের অভ্যুত্থান হবে না এমন কথাও বলেছেন। থাইল্যান্ডের নির্বাচন সম্পর্কে সেনা কর্মকর্তাদের এ ধরনের মন্তব্য আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি হোটেলে বসেই নির্বাচনের সংবাদগুলো নোট করে নেই। কেননা ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকা বিমান বন্দরে বসে আমি ইত্তেফাক-এ দেখেছিলাম সিংগেল কলামের থাই নির্বাচনের নিউজ। আমি স্থির করলাম পুরো বর্ণনা দিয়ে নিউজ পাঠাব। হোটেলে এসে কথা বললাম সে দেশের সরকারি তথ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে। পত্রিকাগুলোও সংগ্রহ করি। পরে সংবাদ তৈরি করে পাঠাই। তবে আমার আই টি ইউ কার্ড ( বিদেশ থেকে অথবা বিদেশে সংবাদ পাঠানোর জন্য এ কার্ড ব্যবহার করা হত) ব্যাংকক জেনারেল পোস্ট অফিস গ্রহণ করেনি। তাই নগদ অর্থে ফ্যাক্স পাঠাতে হয়েছে। থাইল্যান্ড এরপরও ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত হয় থাসকিন সরকার। পরে আবার নির্বাচনে নতুন নামে থাসকিনের দলই ক্ষমতায় আসে। আবারও থাসকিনকে পদচ্যুত করে দেশান্তরী করে সশস্ত্রবাহিনী। এর পর থাসকিনের বোন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলে কিছুদের মধ্যে তাকেও পদচ্যুত করা হয়। বর্তমানে সশস্ত্রবাহিনরীর নিয়ন্ত্রাধীন সরকার থাইল্যান্ডে বহাল আছে।

খবর পাঠিয়ে হোটেলে আসি সন্ধ্যা ৬টায়। বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়ি আসবে ৭টায়। তাই তাড়াতাড়ি সব গোছগাছ। স্যুটকেস নিয়ে পৌনে ৭টায়ই লবিতে এসে অপেক্ষা করতে থাকি। ব্যাংকক এয়ারপোর্টের লিমোজিন সার্ভিসের গাড়ি হোটেলে ৭টা ৫ মিনিটে আসার সাথে সাথে আমি উঠে বসি। গাড়িতে বসে ব্যাংককে দু’দিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা মনে করছিলাম। বিমানবন্দরে পৌঁছি ৯টায়। ১০টায় জালে যাত্রা শুরু। ৬ ঘণ্টায় টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরে। নারিতায় নামার পর কাউন্টারে ইমিগ্রেশন অফিসার বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। পাসপোর্ট, টিকিট আর আমার আমন্ত্রণ পত্র দেখেও যেন তার সন্দেহ কাটছিল না। ইমিগ্রেশন পার হয়ে শুল্ক কর্তৃপক্ষের হাতে রীতিমত নাজেহাল হতে হল। শুল্ক কর্মকর্তা আমার স্যুটকেসের জিনিসপত্র এমনভাবে বের করে দেখলেন যে এগুলো পরে আর সব স্যুটকেসে রাখা সম্ভব হয়নি। সাথে নেয়া কিছু খাবারও নেয়া যায়নি। একটা হাত ব্যাগ ছিড়ে ফেলে। আধা ঘণ্টা হেনস্তার পর আমি ছাড়া পেলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম অনেক কাউন্টারে বেশ কিছু কাল যুবক-যুবতীদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। টোকিওতে পৌঁছে পরে জানতে পারি শুধু আমি নইÑজাম্বিয়া, কেনিয়া ও আফ্রিকান প্রতিনিধিরা আমার চাইতেও বেশি হেনস্তা হয়েছেন। জাপানি কর্মকর্তারা জানালেন, দিন দিন জাপানে অবৈধভাবে থাকা বিদেশীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এখন বিমানবন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

নারিতা বিমান বন্দরের ভিতরে তথ্য কেন্দ্রে পূর্ব কথা মতো আমার নামে একটি স্লিপ পেলাম। এতে লেখা আছে বাইরে কোনো স্থানে গাইড অপেক্ষা করছেন। ম্যাপ করে স্লিপ দেখানো ছিল। গাইডকে পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তিনি একজন পেশাদার ট্যুরিস্ট গাইড। আমাকে একটি লিমুজিনে বাসে করে নিয়ে এলেন টোকিও সিটি বিমান টার্মিনালে। আসতে সময় লেগেছে পুরো দু’ঘণ্টা। রাস্তায় ভীষণ ট্রাফিক জ্যাম। তবে ব্যাংককের মতোই কোনো আওয়াজ নেই গাড়ির। কঠিন শৃংখলা নারিতা থেকে টোকিও পর্যন্ত দোতলা তিনতলা রাস্তা। সব রাস্তা দিয়েই গাড়ি ছুটছে। রাস্তার দু’ধারে শব্দনিরোধ দেয়াল। আশপাশের বাড়ির লোকদের গাড়ির শব্দে যেন কোনোরকম ডিস্টার্ব না হয় তাই এ ব্যবস্থা। সিটি বাস টার্মিনাল ৩ তলা। এটি আমাদের ঢাকা বিমান বন্দরের চাইতে বড়। আর নারিতাতো শতগুণ বড় হবে। সিটি টার্মিনাল থেকে একটি প্রাইভেট কারে সকাল সাড়ে ৮টায় আমি এসে পৌঁছি টোকিও-র গিনজা এলাকার মিতসুই আরবান হোটেলে। এখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা। গাইড আমাকে হোটেলে নামিয়ে বিদায় নিলেন। কাউন্টার থেকে রুমের চাবি নিয়ে লিফটে ৯ তলায় ৯২০ নম্বর কক্ষ। গাইড বিদায়ের সময় বলে গেছেন সাড়ে ৯টায় হোটেল লবিতে আরেকজন গাইড আসবেন। ১০ টায় কর্মসূচি শুরু। তাই শীঘ্রই তৈরি হয়ে নিচে নামতে হবে। আমি হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টিয়ে নিচে নেমে এসে দেখি লবির নির্দিষ্ট স্থানে দু’জন বসা। আমি এগিয়ে গেলাম তাদের কাছে। তারাও বুঝল আমি একই কর্মসূচিতে এসেছি। পরিচয় হলো শ্রীলংকার শান এবং পাকিস্তানের হাশমীর সঙ্গে। একে একে অন্যরা এলেন, আমরা সবাই রওনা দিলাম এফপিসি’র উদ্দেশ্যে। হেঁটেই যাত্রা। ৫ মিনিটেই টোকিও-এর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা গিনজা পার হয়ে এফপিসি’তে পৌঁছি।

আগের পর্ব- চেরি ফুলের দেশে

বাংলাদেশ জার্নাল/আর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত