ঢাকা, শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ০০:২৩

প্রিন্ট

চেরি ফুলের দেশে

চেরি ফুলের দেশে
-শাহজাহান সরদার

৭. ডিজনিল্যান্ডে

এফপিসি থেকে ফেরার সময় শুক্রবার জানিয়ে দেয়া হয় পরদিন শনিবার আমাদের জন্য কর্মসূচি আছে। লেখাপড়া বা কোনো লেকচার শোনার কর্মসূচি নয়। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো পার্ক কিংবা জাদুঘরে নয় ডিজনিল্যান্ডে। ডিজনিল্যান্ড মানে স্বপ্নপুরী। কেমন সে স্বপ্নপুরী, কী আছে সেখানে জানা ছিল না। তাই কৌতূহল ছিল মনে। কর্মসূচি মতে ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় হোটেল লবিতে এসে আমরা সবাই হাজির। এফপিসির কর্তা মি. ইয়ানো (ণধহড়) তাঁর স্ত্রীসহ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। সোয়া ৯টার মধ্যেই রেল স্টেশনের উদ্দেশে রওনা হই। আগেই বলেছি রাস্তাঘাটে তেমন মানুষ নেই। বড় বড় দোকান ও ডিপার্টমেন্টাল শপগুলো বন্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যে রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। জাপানে এ প্রথম আমাদের রেল ভ্রমণ। রেল স্টেশন মানে তিনতলা চারতলা ভবন। মাটির নিচেই থাকে দুই থেকে তিন তলা। ওপর দিয়ে যেমন রেল চলে তেমনি চলে নিচ দিয়ে। আর দোকান, মার্কেট কিংবা বড় বড় ভবনের ছাদের ওপর দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন। টোকিওসহ জাপানের বড় বড় প্রায় সব নগরীর নিচে যেন আরেক শহর। কেননা, মাটির নিচ দিয়ে রেল চলার জন্য গড়ে উঠেছে নিচে বড় বড় ভবন, দোকানপাট। রেল স্টেশনগুলোতে সবকিছুই পাওয়া যায়। নিচে সবসময় বাতি জ্বলে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এক সেকেন্ডের জন্যও বিদ্যুৎ যায় না। তাই বিপদ নেই। আন্ডারগ্রাউন্ড রেললাইনে মনেই হয় না যে নিচ দিয়ে রেল চলছে। জাপানের রেল বেসরকারি সংস্থা চালায়। শত শত রেল কোম্পানি আছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ লাইন তৈরি করে তাদের লাইন দিয়ে কেবল রেল গাড়ি চালাতে পারে। মাটির নিচে লাইনগুলোকে সাবওয়ে বলা হয়ে থাকে। ওপরে এবং নিচে প্রতিটি লাইনেই মিনিটে মিনিটে ট্রেন চলে। একটা ট্রেন ছাড়ার এক মিনিটের মধ্যেই আরেকটি গাড়ি পাওয়া যাবেÑতাড়াহুড়োর দরকার নেই। তবুও জাপানিরা দৌড়ায়। আগের ট্রেনটি ধরার জন্য। এক সেকেন্ড সময় বাঁচানোর জন্য দৌড়ায়। বাইরে থেকে লাখ লাখ লোক প্রতিদিন শহরগুলোতে এসে কাজ করে আবার গ্রামে ফিরে যায়। জাপানের রেল ব্যবস্থা খুবই আধুনিক এবং দ্রুত। এর ওপর আছে আরো দ্রুতগামী ট্রেন; যাকে বলা হয় শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেন।

শিমবাশি রেল স্টেশনে এসে আমরা সবাই টিকিট করি। টিকিট ক্রয়ের মেশিন আছে। মেশিনের গায়ে অর্থের পরিমাণ উল্লেখ আছে। যে পরিমাণ অর্থের টিকিট ক্রয় করা দরকার, সে পরিমাণ অর্থ মেশিনে দিয়ে চাপ দিলেই টিকিট এসে পড়ে নির্দিষ্ট স্থানে। ভাংতি না থাকলে মেশিন আছে টাকা ভাঙিয়ে নেয়া যায়। আমরা ২১০ ইয়েনের টিকিট সংগ্রহ করে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠি। অসংখ্য রেল লাইন। গাইড না থাকলে যেকোনো বিদেশির হিমশিম খাওয়া স্বাভাবিক। শুধু বিদেশি কেন, অপেক্ষাকৃত বয়স্ক জাপানিরাও সাহায্য ছাড়া সঠিক লাইন চিনে নিতে পারে না। কোন লাইন কোনদিকে, কোথায় ট্রেন যাবে, তা চিহ্ন দিয়ে লেখা আছে। কিন্তু এত বেশি লাইন যে সহজে বোঝা কঠিন। আমাদের গাইড ইয়ানো সানসহ আমরা এক মিনিট দাঁড়াতেই ট্রেন আসে। স্টেশনে এসে আপনা আপনি ট্রেনের দরজা খুলে যায়। আর ছাড়ার সময় বন্ধ হয়। প্রতিটি স্টেশনে আসার সাথে সাথে সে স্টেশনের নাম মাইকে ঘোষণা করা হয়। আর ছাড়ার সময় পরবর্তী স্টেশনের নাম বলা হয়ে থাকে। সবকিছু কম্পিউটারইজড। ট্রেন ছাড়ার পর প্রতিটি দরোজায় কম্পিউটারে সংশ্লিষ্ট লাইনের সব স্টেশনের নাম উঠতে থাকে। বড় শহরের ট্রেনগুলোতে এ সুবিধা আছে। গ্রাম এবং ছোট শহরের ট্রেনে এমন নেই। এমনকি স্টেশনে ইংরেজি লেখা চিহ্নও নেই। সেসব স্থানে বিদেশিদের স্থানীয় নাগরিকদের সাহায্য নিতে হয়।

আমরা ট্রেনে চড়ে পাঁচটি স্টেশন অতিক্রম করেই পৌঁছি ডিজনিল্যান্ডে। ডিজনিল্যান্ডকে স্বপ্ন এবং জাদুর রাজ্য বলা হয়ে থাকে। ডিজনিল্যান্ডে স্বপ্ন ও জাদুর কোনো শেষ নেই। কর্তৃপক্ষের সাথে পূর্বেই কর্মসূচি ঠিক করা ছিল। স্টেশন থেকে নেমে দেখি হাজার হাজার মানুষ ডিজনিল্যান্ডের দিকে আসছে এবং ভিতরে আছে। ট্রেনটি শূন্য হয়ে গেল। শিশু, বৃদ্ধা, যুবা সব ধরনের মানুষই আছে। অভ্যর্থনা কাউন্টারে এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিতেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ভিআইপি রুমে। সেখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন ডিজনিল্যান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা তুশিহারো আকিবা। মি. তুশি সবাইকে একটা করে প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন; যার মধ্যে টোকিও ডিজনিল্যান্ডের ইতিহাস এবং কী কী দেখার আছে এবং ভবিষ্যতে কী হবেÑএসবের বর্ণনা। এরপর তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন। ভিডিও দেখানো হলো। জাপানের যেকোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান দেখতে গেলে প্রথমেই দেখানো হয় সে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সম্বলিত ভিডিও। ডিজনিল্যান্ডের ভিডিও দেখানোর পর আমাদের সবার হাতে। ১২টি টিকিটের দাম ৫০০ থেকে এক হাজার ইয়েন। ডিজনিল্যান্ডের জাদু এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান, দৃশ্য উপভোগ করা খুবই ব্যয়বহুল। তবুও প্রচুর পর্যটক আসে। আমেরিকান ধাঁচে ডিজল্যান্ডটি তৈরি করা হয়েছে। সব কিছুতেই পাশ্চাত্যের ছাপ।

মধ্য টোকিও থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে সাগরের তীরে অবস্থিত টোকিও ডিজনিল্যান্ড। ১৯৮৩ সালের এপ্রিলে জনগণের জন্য খুলে দেয়ার পর জুলাই ’৯২ পর্যন্ত বিশ্বের এক কোটি লোক পরিদর্শন করে এ ডিজনিল্যান্ড। আমেরিকার ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি জাপানের ওরিয়েন্টাল ল্যান্ড কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের তৃতীয় ডিজনি পার্ক টোকিও ডিজনিল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করে। এটা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ডিজনিল্যান্ডের চাইতে দেড়গুণ বড়। অপর ডিজনি পার্কটি হচ্ছে ফ্লোরিডায়।

পাঁচটি ভিন্ন নামে বিভক্ত টোকিও ডিজনি পার্কে তিনটি আকর্ষণীয় আইটেম সংযোজন করা হয়েছে। ২০৪ একর জমির মধ্যে ৩৬টা আকর্ষণীয় আইটেম ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ৩১টি হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ৫০টি বিভিন্ন পণ্য দ্রব্যের দোকান রয়েছে। কেনাকাটা, বিশেষ করে ছোটদের জামা-কাপড়, খেলনা, বিলাসী পারফিউম, টি-শার্টসহ গিফটের জন্য এসব দোকান বিখ্যাত। টোকিও ডিজনিল্যান্ডে সব বয়সের মানুষের হাসি, আনন্দ, রোমাঞ্চ, বিস্ময় এবং আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যবস্থা আছে। গান, থিয়েটার, নাটক, সিনেমা, ব্যালে, প্যারেডসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে সারা পার্ক জুড়ে। প্রতিদিন প্রায় ৬০০ শিল্পী-কলাকুশলী এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। এ ছাড়াও রয়েছে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভক্ত বিশেষ স্থান। এগুলো হচ্ছে ওয়ার্ল্ড বাজার (বিশ্ব বাজার), অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড (দুঃসাহসিক অভিযাত্রার স্থান), ওয়েস্টার্ন ল্যান্ড (পাশ্চাত্য ভূমি), ফ্যান্টাসি ল্যান্ড (স্বপ্নবিলাসী ভূমি) এবং ফিউচার ল্যান্ড (ভবিষ্যৎ ভূমি)। দুই হাজার ৬০০ স্থায়ী কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ১২ হাজার ৫০০ অস্থায়ী কর্মচারীসহ মোট ১৫ হাজার ১০০ কর্মচারী এখানে কাজ করে। ডিজনীর বিশ্ব বাজারে ১৭১ ফুট উচ্চ একটি দুর্গ (প্রাসাদ) রয়েছে। এ দুর্গই হচ্ছে ডিজনিল্যান্ডের প্রতীক। এখানে দর্শকরা বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে উঠতে পারে। এর মধ্যে যেমন ট্রেন আছে, জাহাজ আছে, তেমনি আছে রকেট, প্লেন। আছে সিনেমা হল। এ ছাড়া হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং অনেক দোকান।

অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডে অজ্ঞাত স্থান হতে আসা জলদস্যুদের আওয়াজ, জঙ্গলে ঘুরাফেরা, স্রোতের পানিতে ভাসা, বন্য প্রাণী দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। আছে এখানে ম্যাজিকের ব্যবস্থাও। ওয়েস্টার্ন ল্যান্ডে পাশ্চাত্য ঘেঁষা সব আয়োজন। ফ্যান্টাসি ল্যান্ডে আকাশে ওড়া, হাতিতে চড়া, ভূতের খেলার ব্যবস্থা। ফিউচার ল্যান্ডে সম্ভাব্য সব আধুনিক এবং আগামী দিন কী হবে, এমন সব বৈজ্ঞানিক বিষয়াদির ওপর বিভিন্ন আইটেম স্থাপনার কাজ তখন চলছিল।

টোকিও ডিজনিল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম আনন্দ ভ্রমণ, দুঃসাহসিক অভিযাত্রা, রোমাঞ্চকর দর্শনীয় স্থান। ভাষায় বোঝানো কঠিন, দেখলেই শুধু বোঝা যায় এ আরেক পৃথিবী। ডিজনিল্যান্ডে আমরা প্রথম ট্রেন ভ্রমণে অংশ নেই। এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। পাথর-বালি এনে উঁচু-নিচু পাহাড় তৈরি করে এর মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে রেল লাইন। আঁকা-বাঁকা এবং উঁচু-নিচু এ রেল লাইন। বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত ছোট ছোট ট্রেন। আমরা এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ট্রেনে উঠতেই শোঁ করে চালু হয়ে গেল। ট্রেন চলার পথে চারদিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি ভেসে আসছে। হৈ-চৈ হাসি-কান্নার এ ধ্বনি। এরই মধ্যে আমাদের ট্রেন ধম করে গিয়ে পাহাড়ের গায়ে লেগে বিকট আওয়াজ হলো। ভাবলাম এই বুঝি শেষ। চোখ খুলে তাকাতে না তাকাতেই আরেকবার ধাক্কা। উচ্চ স্বরে হৈ-চৈ, আওয়াজ। আসছে কান্নার আওয়াজও। নিজেকে শক্ত করে দেখতে চাইলাম আমি কোথায়? না, ট্রেনেই আছি। এভাবেই তৈরি করা হয়েছে লাইন। ২০০ ফুট ওপর থেকে নিচে গিয়ে আবার ৩০০ ফুট ওপরে উঠে যাচ্ছে। ২০ ফুটের মধ্যে ঘূর্ণায়মান হচ্ছে। আবার পানির মধ্য দিয়ে চলছে। সুড়ঙ্গপথে ওপর থেকে নিচে এমনভাবে নামছে ট্রেন যাতে সবাই বারবার মাথায় হাত দিয়ে রাখেÑএই বুঝি মাথায় লাগল। আসলে মাথায় লাগার সুযোগ নেই। এভাবে ১০ মিনিটের রেল ভ্রমণে সবারই চোখে পানি আসে, গলা শুকিয়ে যায়। আবার হাসি-আনন্দ-উত্তেজনা। যদিও এ পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি তবুও ট্রেনে উঠে ভীত না হয়ে উপায় থাকে না। রেল ভ্রমণের পর আমরা গেলাম নৌকা ভ্রমণে। লাইন ধরে ধরে নৌকায় মানুষ উঠছে। একজন চালক। এ এক আশ্চর্য পৃথিবী। ভাসমান সব নৌকা এগিয়ে চলল। কোথাও গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে আবার কোথাও ওপরে উঠে যাচ্ছে। পানির মধ্যেই আলোর পথ-নির্দেশিকা। মাঝখানে আশ্চর্যজনক সব ঘটনার সমাহার। রাজা-বাদশাদের বাড়ি। পারিষদ নিয়ে বসে আছেন রাজা। রানি দরোজা খুলে দেখছেন। আপনা-আপনি আবার দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও জাহাজ থেকে এসে পার্শ্ববর্তী গ্রামে জলদস্যুরা আক্রমণ করছে। তীর-ধনুক দিয়ে প্রতিরোধ করছে গ্রামবাসী। রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে। লাশ পড়ে আছে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৈন্যরা। যুদ্ধজাহাজ থেকে গুলি এসে আগুন ধরে পুড়ছে বাড়িঘর। নৌকায় বসে মনে হয় সবই যেন আমাদের ওপরে এসে পড়ল। কিন্তু না, কিছুই না। এখনই আগুন জ্বলছে আবার নিভছে। আবার জ্বলছে। রাজা-বাদশাদের নারী ও মদ নিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করার দৃশ্য। রানিদের ঘোরাফেরা করা, চাকর-বাকরদের সাথে বেলেল্লাপনা, রাজার সাথে রানির বচসা-উজির-নাজিরদের সংসার, যুবরাজদের প্রেম-প্রেম খেলার দৃশ্য। নৌকায় প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ঘুরে এ দৃশ্য দেখা যায়। মোঘল বাদশা ও প্রাচীন যুগের রাজ-রাজড়াদের কিসসা সম্বলিত দৃশ্যপট থরে থরে জীবন্ত সাজানো আছে। এসবই নকল, মেকী। কিন্তু সহজে বোঝা দায়।

এখান থেকে আমরা জঙ্গল ভ্রমণে গেলাম। সেখানেও একই রকম ব্যবস্থা। যত সব জীবজন্তুর সমাহার। কুমির ভেসে উঠে তেড়ে আসে নৌকার দিকে। এই বুঝি খেয়ে ফেলবে। বাঘের গোঙানিতে ভীত হতে হয়। সাপ ছোবল দেয় বলে ভয়। আর মায়াবী হরিণের দৌড়। জিরাফ-হাতিসহ যত ধরনের বন্যপ্রাণী আছে জঙ্গলের ধারে ধারে, নদীতে-খালে খালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কৃত্রিম নদী-খালের পাশে গাছপালা লাগানো। জীবজন্তু সবই নকল। প্রথম দেখায় বোঝার উপায় নেই। সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়ে সবাইকে ভীত থাকতে হয়।

আমরা হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশে উড়ি। রকেটে ওড়ার জন্য টিকিট করে ক্যামেরায় উড়ন্ত অবস্থায় মানুষের গগনবিদারী চিৎকার দেখে ফিরে আসি। যদিও দুর্ঘটনার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবুও রকেট যখন ঘূর্ণায়মান হয়ে উড়তে থাকে তখন কিছুই দেখা যায় না। শোনা যায় শুধু গগনবিদারী কান্না। পাঁচ মিনিট পর যখন ওড়া থামে তখন সবাই হতভম্ব। যেন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা। তবে সবাই অক্ষত। এসব জেনেও কিন্তু বেশির ভাগ দর্শক রকেটে চড়ে কাঁদে। যাতে ভয় না পায় এবং আগাম সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে, সে জন্য ভিতর থেকে বাইরে পর্যন্ত ক্যামেরা দিয়ে টিভিতে ছবি দেখানো হয়। এ ছবি দেখে কেউ কেউ আর দুঃসাহসিক এ ভ্রমণে রাজি হয় না। টিকিট করে দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করেও ফিরে আসে। বারবার সতর্ক সংকেত ‘আবার ভেবে দেখুন আপনি এই রাইডটিতে চড়বেন কি না।’ এমন লেখায় ভয় পেয়ে চলে আসে অনেকে, দুর্বল চিত্তদের কাছে এই রাইডটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতে পারে।

রকেট ভ্রমণ না করে আমরা গেলাম জাদু দেখতে। গানের মাধ্যমে এ জাদু। প্রত্যেককে একটি চশমা দেয়া হয়। বেশ বড় হল। চশমা চোখে রাখতে হবে। বিশাল বিশাল গাড়ি। মনে হয় ওপরে এসে পড়ছে। অনেকে উঠে পড়ে ভয়ে কেঁপে ওঠে। কিন্তু চশমা খুললে কিছু না। পর্দায় ছোট ছোট মানুষ ও গাড়ি। জাদুই হচ্ছে চশমায়। এমনি অনেক খেলা, অনেক আনন্দ-ফুর্তির ব্যবস্থা। এক দিনে সব দেখা সম্ভব নয়। ডিজনিল্যান্ডের মাঠ থেকে শুরু করে সব স্থান ঝকঝকে তকেতকে। খুবই পরিষ্কার। সাদা প্যান্ট-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে আছে ক্লিনার। ময়লা-আবর্জনা ফেলার বাক্স আছে সব স্থানেই। এরপরও যদি কেউ কিছু ফেলে ছো করে ক্লিনার তুলে নিয়ে যায়। এসব ক্লিনার সব স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। খণ্ডকালীন চাকরি। দিনে ৫ থেকে ১০ হাজার ইয়েন পর্যন্ত আয় করে থাকে। ডিজনিল্যান্ডে যে কত জাদু আছে, খেলা আছে, দর্শনীয় জিনিস আছে তা সেখানে না গেলে কাউকে লিখে বোঝানো যাবে না। বিশে^র বিভিন্ন স্থান থেকে যন্ত্রপাতি এনে এখানে বসানো হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে কৃত্রিম শহর। খাবার দোকান এবং গিফটের দোকান ছাড়া সবই খেলার এবং আনন্দের। ডিজনিল্যান্ডের জাদু এবং খেলার কোনো শেষ নেই। সত্যি এ এক স্বপ্নপুরী। (চলবে..)

আরও পড়ুন- চেরি ফুলের দেশে, পর্ব ৬

বাংলাদেশ জার্নাল/আর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত