ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:০৪

প্রিন্ট

জাতীয়তাবাদের কাছে আন্তর্জাতিকতাবাদ পরাস্ত

জাতীয়তাবাদের কাছে আন্তর্জাতিকতাবাদ পরাস্ত
সাইফ শোভন
সাইফ শোভন

এ যেন মেলা বসেছে সারা পৃথিবী জুড়ে, কোন জাতি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তার প্রতিযোগিতা চলছে। বৃটেনের ব্রেক্সিট ইস্যু, ভারতের বিজেপি, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সবাই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে সেরা। জাতি হিসেবে কে সেরা সেটা অবশ্য ঠিক করার কোন মানদণ্ড নেই। কিন্তু সারা পৃথিবীর আম জনতাই ঠিক করবে কে সেরা।

ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান বিজেপির হাত ধরে। যদিও ভারত তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেন ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, একটা সময় ছিল যখন বিজেপি ভোটে মাত্র ২টি আসন পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। এখন সেই বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায়। ভারতের জনগণ কংগ্রেসকে দেখেছে (উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দল), আবার কমিউনিষ্ট শাসন দেখেছে (যারা নিজেদেরকে আন্তর্জাতিকতাবাদের অনুসারি দাবি করে), মমতার তৃণমূল কংগ্রেস (জাতীয়তাবাদের ধারা)। বিজেপির উগ্র জাতীয়তাবাদের (হিন্দু জাতীয়তাবাদের তথা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি) ধুয়া তুলে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছে। অযোধ্যায় মসজিদের বদলে রাম মন্দির নির্মাণ করবে বলে ঘোষনা দিয়েছে (ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী)। মোদি ভারতকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হিন্দু জাতি তথা সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত করেছে। পৃথিবীর মানচিত্রে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে।

উগ্র জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যেন এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙ্গে প্রথম আন্তর্জাতিকতাবাদের পতন ঘটিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। পরবর্তীতে ভারতকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করেও করতে পারেনি। কারণ হিন্দু উগ্রজাতীয়তাবাদই যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সুফল। অপরদিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন হয়েছিল বহুকাল আগেই তখন এ উপমহাদেশে ব্রিটিশরা দুশো বছর রাজত্ব করলেও পরে তারা গুটিয়ে উপমহাদেশ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। বৃটিশরা সরেছে ঠিকই কিন্তু যাওয়ার সময় তারা দ্বি জাতী তত্ত্বের মাধ্যমে দ্বি খন্ডিত করে রেখে যায় এই উপমহাদেশকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের থাকা মানে পৃথিবীর ক্ষমতাধরদের ভারসাম্য থাকা তা আগে থেকেই মার্কিনীরা বুঝতে পেরেছিলো বলেই সিআইএ সফলকাম হয় সোভিয়েতকে ভেঙ্গে। রাশিয়ার সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ যেন জাতীয়তাবাদ এর কাছে আন্তর্জাতিকতাবাদের নির্মম পরাজয়। শোষিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত জাতি সমুহের পাশে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিন্তু সেটা বেশিদুর যেতে দেয়নি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক, মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল রাশিয়া আর অন্যদিকে পাকিস্তান হানাদারদের পক্ষে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের। যদিও ভারত সেদিন স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। ভারতের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেনও সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল বলেই আমরা আজ স্বাধীন জাতি।

বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের বিতর্ক মূলত ৭৫ এর পট পরিবর্তনের মধ্য থেকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ না বাঙালি জাতীয়তাবাদ এ নিয়ে আজও বিতর্ক চলমান। যেহেতু বাংলাদেশে নানান ধর্ম, জাতি, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি প্রভৃতি বিরাজমান তাই আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ বলতে পারি না। বাঙালি বলতে বাংল ভাষাভাষী মানুষের সমন্বয় যেমন পার্বত্য জনগোষ্ঠির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মানুষ থাকায় এখানে বাংলাদেশি না বলে বাঙালি বলতে দ্বিধা কেন। তাই আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ না বলে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ বললে ভুল হবে না। আমরা বাঙালি হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে পরিচিত হতে চাই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি বাঙালি জাতি। আর তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নয় বরং তা আন্তর্জাতিকতাবাদেরই উত্থান। কেননা প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রায় ১৫ কোটি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে, আর বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটি লোক বাংলায় কথা বলে। এখানে ধর্মের চাইতে ভাষাটাকেই সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

আবার বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক আওয়ামী লীগ ৪ বার ক্ষমতায় আসা জাতীয়তাবাদেরই জয়জয়কার অবস্থা সেখানে আন্তর্জাতিকতাবাদেরই পরাজয় কি না তা বিবেচ্য বিষয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর থেকে পৃথিবীতে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকায় মুলত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের (ইইউ) জন্ম। এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয় ইইউ। ডলারের বিপরীতে ইউরো হুহু করে দাম বাড়তে থাকে । যদিও ইইউ একটি আন্তর্জাতিকতাবাদের লক্ষণ কিন্তু ব্রেক্সিট ইসু বা তা বাস্তবায়ন হলে ইউকে দুর্বল হয়ে যেতে হবে। তাহলে ব্রেক্সিট হলে কি ব্রিটিশরা আবার সাম্রাজ্যবাদের ধারায় ফিরে আসবে। বৃটেন নব্য জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটালে কি জাতীয়তাবাদের কাছে আন্তর্জাতিকতাবাদের পরাজয় নয়। তবে সেদিন আর বেশি দুরে নয় যেদিন সমগ্র মানব জাতি এক হয়ে বিবর্তনের ধারায় সাম্যবাদের দিকে অগ্রসর হবে। মানুষে মানুষে বিভেদ, বঞ্চনা, শোষন, নিপিড়ন, অত্যাচার জাতী আর থাকবে না। সবাই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠবে।

লেখক: সাংবাদিক, লেখক

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত