ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২০, ১১:৪৩

প্রিন্ট

জিপিএ-৫ কি আমাদের বেশি প্রয়োজন?

জিপিএ-৫ কি আমাদের বেশি প্রয়োজন?
রাজীব কুমার দাশ

আমাদের- ঘরনার সবারই চালশে জীবন। চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায়- প্রেসবায়োপিয়া। তৃতীয় প্রজন্মের খই-দই মেশানো যাপিত জীবন! এক লহমায়- ভয়-ডরহীন প্রাণময় দুর্দান্ত শৈশব পেরিয়ে তর-তর করে কাদাজল মাড়িয়ে বেড়ে ওঠা এক স্বপ্নহীন প্রজন্ম! প্রাণভরে ডাংগুলি -গোল্লাছুট! চাঁদনি রাতে পড়ার পাঠ ফাঁকি দিয়ে কানামাছি খেলে- ঘর্মাক্ত জবুথবু হয়ে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে- ডুব সাঁতার,স্বাদ-বিস্বাদ ভেদাভেদ ভুলে পাতে যা পড়েছে তা দিয়ে ক্ষুধাসুরকে- নির্মম চিবিয়ে ঢেঁকুর তুলে তাড়িয়ে দিয়েছি।

প্রকৃতির সৌন্দর্যকে হৃদয়ের বন্দনায় ধারন করেছি। প্রভাতে পাখির কলতান-সোনা রোদের অনন্য মুগ্ধতা নিয়ে উঁকি দেয়া রবি দেখেছি। সোনালি, কৃষ্ণচুড়া, শিমুলের বশীকরণ নিয়ে কতো সময় যে তাকিয়েছি মনে করতে পারছিনা। স্কুলের গন্ডি মাড়িয়ে লোকাল কলেজে ভর্তি হতেই প্রাণহীন উপ-শহরে প্রবেশ। আমার মতো-স্বপ্নহীন অজপাড়া গ্রাম হতে উঠে আসা প্রজন্ম-ঘরনা বালকের সংখ্যা নেহাতই কম নয়! আমি মনে করি-আমার সময়ের তৃতীয় প্রজন্মই এ দেশের দৌর্মনস্য-ইঁচড়ে পাকা হাতে-কলমে-হাভাতে প্রজন্ম! আমার মতো পালহারা মাঝ সাগর বক্ষের ঘূর্ণিঝড় ‘হাসির দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেত মাথায় চেপে-মাছ ধরা বন্ধ না করা মাঝির সংখ্যা অগুনিত! পরে যে ভাবেই হোক-না কেনো! তারা-লইট্যা-বাইলা-পোয়া-ছুরি না ধরে রাতারাতি বনে গেছেন -চোখের সামনে কেতাদুরস্ত বড় সাহেব। তারা এখন স্বীকার-ই করেন না, তারা-ই এক সময় গ্রামের দামাল ছেলে! পায়ের স্যান্ডেল নেই, কোনো স্বপ্ন ছিলো না,পান্তাভাত খেয়ে-খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে, প্রচন্ড ক্ষুধাতে কিছু একটা দিয়ে অবলীলায় আধা কেজি চালের মোটাভাত খেয়েছে। আরো ভাতের জন্যে ঝগড়াফসাদ করেছে। আইসক্রিম, বুট-বাদাম দোকানি- ‘পাখির বাপ’ বাকি না দেয়াতে লুকিয়ে-লুকিয়ে কেঁদেছে। কলেজে এসে আর ফিরে তাকাতে হয়নি! অসুস্থ রাজনীতির জমজমাট গোড়াপত্তন আমাদের সময়ে শুরু।

রাতারাতি বড়ভাইদের নজরে পড়ে- ইয়ামাহা ব্র্যান্ড মোটরসাইকেল, হোষ্টেল, পিস্তল- কিরিচের-ব্যাগ ফ্রি! নিয়ে- বিনোদিত হয়ে হাতে সিগ্রেট -আমোদিত -বদনে পেটমোটা সুরত দারোগার সামনে বসে চা-পানে দশ নম্বরি মহাবিপদ সংকেত শেষ করে আর এ মাঝিদের পিছনে তাকাতে হয়নি।

পালছেঁড়া জীবন নৌকার মাঝিরা রাতারাতি বনেছেন সাঝিরা! কেসগুলো হুমকি- ধমকি দিয়ে ‘সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস’ করিয়ে ডিজে-ফুল-মিষ্টি- গ্লিসারিন চোখের জলে ছলছল-নদীর টলমলে-সাদা পিনপিনে পাঞ্জাবি পড়ে আমাদের কিছু একটা শেখাতে পাড়ি দিয়েছেন কোনো উত্তুঙ্গ ঘরনার দেশে। আমাদের ঘরনা প্রজন্ম দেখেছে- ভন্ড-দন্ড! পাতে জগা খিচুড়ি! এ দেশে শেষ বলতে কিছুই নেই! সবে শুরু! ডিগবাজি! হত্যাকাণ্ড-প্রমোশন। জাতীয় জীবনে ইংরেজি শিক্ষা বাদ-পরে ঐচ্ছিক- তাও দেখেছি। হোষ্টেলে বহিরাগত তাড়না- মানসিক চাপ-সিগ্রেট-টেনশন-খাবারের যন্ত্রণা নিয়ে বেশিদিন থাকা হয়নি। চলে গেলাম লজিং বাড়ি! গৃহপতির বাড়ি হতে একটু দূরে কাচারি ঘরে। একহালি বাচ্চা পড়িয়ে দুবেলা আহার। মানে-পড়ানোর বিনিময়ে খাবার কর্মসূচি। নিউ টেন-এইট-ফাইভ-ক্লাস টু। সব বিষয়ে পড়াতে হবে, বৃত্তি পেতে হবে, কতো বায়না! ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে আগে আমাকে অনেক পড়তে হয়েছে, অংক-গ্রামার-বাড়ির কাজ করতে-করতে রাতের সিংহভাগ সময় শেষ। নিজের পড়াশোনা? না বলাই ভালো! আস্তে -আস্তে আমার খই-দই জীবনের সাহিত্য খুঁজে পেয়েছি।

আমি কখনোই আশাহত হইনা। চরম দুঃসময়ে সবাই যখন হা-পিত্যেস করে, আমি এর মধ্যেই শিক্ষা লাভ করি। আমার চরম বিশ্বাসঘাতক শত্রুকে আমি ধন্যবাদ দিয়ে বলি- ‘আপনাকে ধন্যবাদ’ আপনার শিক্ষা আমার- চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে। আমি শিখেছি-রাজারবাগ পোষ্ট অফিসের এক হাজার আটশত টাকা বেতনের পোষ্ট পিয়ন-হুজুর মোতাহের আলী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের লাশ ঘরে ডোম স্বপনের কাছ থেকে। মোতাহের হুজুর শিখিয়েছে- পেটের ক্ষুধাকে কিভাবে তাড়াতে হয়? স্বপন শিখিয়েছে- লাশ ঘরে বসে সারি সারি লাশের মাঝে- খাবার খেতে। লাশের অব্যক্ত যন্ত্রণার গল্প শুনতে! আমি আরো শিক্ষা নিয়েছি- ‘ইত্তেফাক মোড়ে’ ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার অবৈতনিক সাংবাদিকদের যাপিত জীবনের গল্পে- লাশ ঘরে ডোমের সাথে ডাক্তার সাহেব দেখে বলেন- ‘আপনি কি পাগল দারোগা? ‘না কর্ণপিশাচ’! লাশের অব্যক্ত যন্ত্রনার বয়ানগুলো আগামীতে-কোনো প্রবন্ধে বা ছোট গল্পে শোনাবো।

জিপিএ-৫ প্রশ্নে ফিরে আসি। পঞ্চম প্রজন্মের গার্জিয়ান-শিক্ষক নীতিনির্ধারক অসম্ভব মেধাবি। এদের কাছে শিশুদের সোনা রোদ চুরি নস্যি! আশির উপরে নাম্বার চাই-ই, সবার দরকার জিপিএ-৫। কোমলমতি শিশু-কিশোর জন্মের পরে দোলনায় ঘুমপাড়ানি গানে পেয়েছে- ABCD খাবারে পেয়েছে-লাফালাফি গেম কার্টুন। দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে পাড়ায়-পাড়ায় গড়ে উঠেছে কথিত জিপিএ-৫ মার্কা নামসর্বস্ব ক্যাডেট -কলেজিয়েট নামধারি প্রতিষ্ঠান। বাহারি বিজ্ঞাপন দিয়ে হোষ্টেল, অসংখ্য মানহীন উদ্ভুট বই! আমাদের সাঝি মার্কা প্রজন্মই এখন এসব প্রতিষ্ঠানের রূপকার ও গুনীজন। ক্রেষ্ট কেনা-বেচা জেলা সেরা এসব ভাঁওতাবাজি! দালালদের মাধ্যমে বাতলে গার্জিয়ানদের পচাবিরানি সিঙ্গারা-সমুচা খাইয়ে সেরা গার্জিয়ান স্বালোক গ্রহণ করিয়ে রাতারাতি বাহারি ম্যাগাজিন ছাপিয়ে সোনামনিদের সুকৌশলে বানিয়ে দিচ্ছে গিনিপিগ গবেষণা প্রজাতি!

আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা- শিক্ষণ-বীক্ষণ এখন অনেক-অনেক এগিয়ে। জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘গরিবের স্কুল’ বিশেষণ- তকমা ঝেড়ে- ফেলে সব গার্জিয়ানদের এগিয়ে আসতে হবে। পাড়ায় থাকা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের খবর- তদারকি করতে হবে। থানা-জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বেশি বেশি আমন্ত্রণ জানিয়ে শিশুশ্রেণি হতে বিতর্ক প্রতিযোগিতার অভ্যাস করতে হবে। শিক্ষক সমাজকে এগিয়ে এসে মানসম্মত পাঠদান করতে হবে। আমি এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি- কাউকে দোষাদোষ না দিয়ে, আপনার বাড়ির পাশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি গুরুত্ব দিন, টিচারদের আপনজন ভাবুন, শিক্ষকদের কথায় সন্মান দিন, হোমওয়ার্কের খবর নিন, বাচ্চারা করেছে কিনা? এতেই আস্তে-আস্তে শিশুদের মেধা-মনন বিকশিত হবে। কিম্ভুতকিমাকার -মনন -বৈরি ঘরনার বইপড়া বন্ধ, জিপিএ-৫ ভীতি দূর করে -সামাজিক মানবীয় কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে। সোনামনিদের অংকুরেই তার সন্মানে ধারনা দিতে হবে, নিজেদের ওদের কাছে সন্মানের পাত্র করতে হবে। মিথ্যা বাক- শিল্প বন্ধ-উত্তম চরিত্র ঘরনার অহংবোধ ধারন করলে প্রজন্ম এগিয়ে যাবে। কারণ আপনার সোনামনির স্বপ্নের রাজা-রানী কিন্তু বাবা-মা, এর পরে শিক্ষক। আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আপনার কে বেশি প্রয়োজন? সন্তান- না জিপিএ-৫? জিপিএ-৫ সংস্কৃতি হতে বেড়িয়ে আসতে হবে।

আমাদের দেশের জাতীয় সেবকগন সংখ্যাধিক্য বাড়ির পাশের প্রাইমারি ছাত্র। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় এখনো সিংহভাগ মফস্বল স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী বাজিমাত করে। ওদের সবাই কিন্তু জিপিএ-৫ পেয়ে আসেনি। আমাদের দূর্ভাগ্য! প্রতিবছরই এসএসসি-এইচএসসি রেজাল্টের পরে এমন কি প্রাইমারি রেজাল্ট শেষে ও এ অমানবিক জিপিএ-৫ রাক্ষস খেয়ে ফেলছে আমাদের সোনামনিদের। গার্জিয়ান -শিক্ষকদের এ অমানবিক রাক্ষসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে। সন্তান -ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রথমে মননসমৃদ্ধ মানুষ,শিক্ষণে গুরুত্ব দিকে হবে। স্কোর/জিপিএ-৫ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া-সোনার হরিন নয়, পুরস্কারের ক্ষেত্রে ও এক ক্যাটাগরি করতে হবে। মন থেকে জিপিএ-৫ ভীতি দুর করতে হবে। প্রয়োজনে পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের আলাদা পাঠ, মোটিভেশনাল ঘরনার ক্লাস নিয়ে নিরাপদ রাখতে হবে। ব্যক্তি পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্রে জিপিএ-৫ ধারি এবং জিপিএ-৫ পায়নি পড়ুয়াদের মধ্যে যতোক্ষণ আলাদা গ্রহের এলিয়েন কিংবা সুপার হিরো-জিরো বৈষম্য থেকে যাবে! ততোক্ষণ আমাদের প্রজন্ম পড়ুয়া যোদ্ধাদল -চরম অপমান হতাশা-গ্লানি হতে রক্ষা পেতে অনেক যন্ত্রনার ‘অপমৃত্যু’ শব্দটির কাছে বারে-বার মাথানত করবে।

প্রাবন্ধিক ও কবি

পুলিশ পরিদর্শক

বাংলাদেশ পুলিশ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত