ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮ আপডেট : ৯ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১০ মে ২০২১, ২২:২৩

প্রিন্ট

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: দিল্লির মসনদে মোদির ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: দিল্লির মসনদে মোদির ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ

এইচ.এম.এ.হক (বাপ্পি)

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে আসন সংখ্যায় ডাবল সেঞ্চুরি পার করে পাঁচ বছরের জন্যে ক্ষমতায় ফিরলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের খোদ প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকে জনপ্রিয় ফিল্ম স্টারদের “১৯-এ হাফ, ২১-এ সাফ” এর মতো দাপুটে স্লোগানেও ৮০টি আসন ছাড়াতে পারেনি বিজেপি। আবার বিজেপি নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই, ইডি, আয়কর ইত্যাদি দপ্তরগুলো ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে মমতাসহ তৃণমূলের নেতৃবৃন্দের এমন অভিযোগও ছিল বিস্তর। ‘যা রটে তার কিছু হলেও বটে’ বাংলার এই প্রাচীন প্রবাদকে আংশিক সত্যি হিসেবে মানলেও এত সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মমতার বিরাট জয় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নয়, জাতীয় পর্যায়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। এই বিজয়ের ফলশ্রুতিতে মমতাই হবেন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী জোটের সর্বেসর্বা- এমন মত প্রকাশ করেছেন মধ্য প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথের মত নেতা। বর্ষীয়ান এই কংগ্রেস নেতার মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ে পরপর তিনবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে মমতা এখন জাতীয় পর্যায়ের নেত্রী। তবে এই বিজয়ই যে কেবলমাত্র ২০২৪ সালে মোদিবিরোধী জোটের নেতৃত্ব প্রদানের বিষয়ে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর মমতা ২০০১ সালের রাজ্য নির্বাচনে পরাজয়ের পর ধ্বংসপ্রায় তৃণমূল কংগ্রেসকে কঠোর পরিশ্রম ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বলে পুনর্গঠিত করে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। আরএসএস-বিজেপির অজেয় শক্তিকে বৃহত্তর জোট ছাড়া হারানো অসম্ভব এমন রাজনৈতিক বিশ্বাসের মূলে ‘মমতা পন্থা’র শক্তিতে সজোরে কুঠারাঘাত করে তিনি ভারতের প্রায় সকল আঞ্চলিক দল ও মতের মানুষকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছেন। বিজেপির ধর্মভিত্তিক নির্বাচনী কৌশলকে অকার্যকর প্রচেষ্টায় পরিণত করতে তৃনমূল প্রধান যুগপোযোগী কৌশল হিসেবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে সর্বস্তরের জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে উদ্দীপ্ত করেছেন। বর্ণহিন্দুত্ববাদী বিভেদের বিরুদ্ধে মমতা মতুয়া, বাগদী এবং আদিবাসীদের ভোটকে সুসংহত করেছেন। তিনি হিন্দু পুরোহিতদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা, দুর্গা পূজার সময় ক্লাবগুলোর প্রণোদনার জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যবস্থা করেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘরের মেয়ের মতো তিনি প্রায়ই হিন্দু সংস্কৃত শ্লোক আওড়ে, নিয়মিত ধর্মাচার পালন করে নিজের ব্রাহ্মণ পরিচয়টিকে সামনে এনেছেন। বিজেপির গোড়া হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের মৃদু হিন্দুত্ববাদের কৌশলে আগের হারানো হিন্দু ভোট পুনরুদ্ধার হয়েছে। তার এই পন্থায় ধর্মনির্ভর বিজেপিকে আদর্শিক হাতিয়ার হারিয়ে কোনঠাসা হতে দেখে বিজেপিবিরোধী আঞ্চলিক দলগুলো এ নীতি অনুসরণ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সুতরাং বড় লড়াইয়ের ময়দানে তার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতায় ভরসা রেখে বিভিন্ন বিজেপিবিরোধী নেতৃবৃন্দ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন তিনি তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে।

বিজেপির দুর্দান্ত স্ট্র্যাটেজি মাঠে মারা পড়েছে ‘মমতা পন্থা’র অন্যতম কৌশল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার কাছে। ১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো প্রবীণ সিপিআই (এম) নেতাকে হারিয়ে ভারতের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য হওয়া ‘লড়াকু’ ও ‘প্রতিবাদী’ মমতার রাজনৈতিক আদর্শ মূলত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মমতার সরকার রাজ্যের দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নারী এবং সংখ্যালঘুদের জন্য ‘কন্যাশ্রী’, ’সবুজ সাথী’, ‘মাতৃবন্দনা’, ‘মা’ ‘খাদ্য সাথী’, ‘সবুজশ্রী’, ‘শিক্ষাশ্রী’ এবং ‘হজ হাউজ বা ইমাম প্রশিক্ষণ’সহ বিভিন্ন রকম জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোটারদের বিশেষ করে নারী ভোটারদের ভালোভাবেই প্রভাবিত করেছে, তা ভোটের ফলে প্রমাণিত হয়েছে।

এসব প্রকল্পসমূহ নানাভাবে সমালোচিত হলেও সাধারণ মানুষের মনে মমতা তার নিজের ওপর ভরসা তৈরির ক্যারিশমাটিক দক্ষতা দিয়ে তৃনমূল কংগ্রেসের জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে পৌঁছেছেন। এসব প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে মমতা থমকে না গিয়ে ভোটের কিছুদিন আগে ‘দুয়ারে সরকার’,‘পাড়ায় পাড়ায় সমাধান’ এবং ‘স্বাস্থ্য সাথী’-এর মতো বেশকিছু প্রকল্প উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ২০২০ এর ডিসেম্বরে শুরু হওয়ার পর ‘দুয়ারে সরকার’ উদ্যোগটি মাত্র দুই মাসে দুই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। তৃণমূল সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে হত-দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং নারী ভোটারগণ তৃণমূলকে ব্যাপক ভোটে বিজয়ী করে ক্ষমতায় আনেন। মমতার এই রাজনৈতিক ধরণ পুরো ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর নজর কেড়েছে।

বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণের’ অভিযোগ এনে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার জবাব দিয়েছেন ‘মমতা পন্থা’র মোক্ষম নীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে। পাশাপাশি বিজেপির সাম্প্রদায়িক প্রচারের বিপরীতে তৃনমূল সরকারের ধর্মীয় সহাবস্থান, উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতি তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য শাপে-বর হয়ে এসেছে। ফলে সিংহভাগ মুসলিম ভোটের পাশাপাশি বাড়তি হিন্দু ভোটও পেয়েছে তৃণমূল। প্রায় শতবর্ষ পুরাতন আরএসএস এবং বিজেপি পরিবারের রাজনৈতিক পণ্য হিন্দুত্ববাদ নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ মমতাকে ছুঁড়েছিল, তা মোকাবিলা করার ‘মমতা পন্থা’র মধ্যে ভারতজুড়ে আঞ্চলিক দলগুলো খুঁজছে এর মাঝে যার যার ভবিষ্যতের কৌশল। বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদীদের এমন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সাংগঠনিক ও আদর্শিক কৌশলে মমতা থাকছেন মধ্যমনি হয়ে।

রাজনৈতিক মহলের ভাষ্যমতে, মোদীবিরোধী মুখ্য নেতৃত্বদানের এ পরিক্রমায় মমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধী। কিন্তু ‘মমতা পন্থা’ আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে বিজেপি মোকাবিলায় কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হবার রীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি কংগ্রেস এবং রাহুলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল সেই লড়াইকে ভিত্তিহীন করে দিচ্ছে। কংগ্রেস জোটবদ্ধ হওয়ার সময় সাধারণত অনেক আসন নিলেও প্রচারণা ও জনসংযোগে তাদের কার্যক্রম থাকে সীমিত। কংগ্রেসের এমন চিত্র হয়তো প্রদেশগুলোতে কংগ্রেসের প্রতি আঞ্চলিক দলগুলোর আগ্রহের সমাপ্তি ঘটাতে পারে শিগগিরই। ‘মমতা পন্থা’য় আঞ্চলিক রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের এই উত্থান সামলাতে রাহুল গান্ধী বোধহয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণেই বেশি আগ্রহী হবেন। ফলে নেতৃত্বের সাম্ভাব্য কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছেন মমতাই।

বিশাল ভারতজুড়ে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের কেন্দ্রমুখী নির্ভরশীলতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নানাবিধ ব্যর্থতা রাজ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিষয়টিকে আরো জোরালো করেছে। এদিকে রাজ্যের স্বনির্ভরতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপসহীন মানসিকতা বরাবরই লক্ষণীয়। একইসঙ্গে বিষয়টি ‘মমতা পন্থা’র একটি উল্লেখযোগ্য কৌশলও বটে। এ প্রেক্ষাপটেও মমতা সমগ্র ভারতের সম্ভাব্য নেত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ভারতীয়রা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আটপৌরে ব্যাপারটা সবসময়ই পছন্দ করেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের রাজনীতিতে অভিজাত পরিবারের একটা প্রভাব সবসময় থাকলেও সাধারণ পরিবারের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল হয়েছেন জনগণের ভালবাসায়। সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা এবং তাদের সাথে মিশে যাবার ক্ষমতা দিয়ে মমতা ধীরে ধীরে ভারতবাসীর আপনজন হিসেবে পরিনত হয়েছেন, হচ্ছেন। আর এ কারণেও হয়তো মোদীবিরোধী মুখ্য নেতৃত্ব ধরা দিতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই।

লেখক: কলামিস্ট, সাহিত্যিক ও গবেষক

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত