ঢাকা, শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ আপডেট : ৫ মিনিট আগে

কিশোর গ্যাং কালচার অপরাধের ‘হাতবদল’ হচ্ছে যেভাবে

  মশিউর জারিফ

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২২, ১৬:১৯

কিশোর গ্যাং কালচার অপরাধের ‘হাতবদল’ হচ্ছে যেভাবে
মশিউর জারিফ

কিশোর গ্যাং কালচারটি বাংলাদেশে একদম নতুন নয়। এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কারণ ছোট থেকে কিশোর গ্যাং বলতে বুঝতাম আমার বন্ধু রাশেদ, দীপু নাম্বার টু, তিন গোয়েন্দাসহ নানা চরিত্র। যেসব গ্যাং মুক্তিযুদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ অনেককিছু শিখিয়েছে। কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেছে ছোট বেলার কিশোর গ্যাংগুলো?

গত কয়েক বছর ধরেই হঠাৎ আলোচনায় আসে নতুন এক ‘গ্যাং কালচার’। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বেপরোয়াভাবে সক্রিয় এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্কুল পড়ুয়ারা এসব গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ এই বয়সে ছেলেমেয়েদের আচরণ পরিবর্তিত হয়, তাদের মধ্যে এক ধরনের 'বড় হয়ে গেছি' বা 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব চলে আসে। তাছাড়াও সময়ের সাথে সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়।

সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতি এবং অস্বাভাবিকতায় খেই হারিয়ে ফেলছে সমাজের উঠতি বয়সী কিশোররা। জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, ধর্ষণ, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ও। কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া আলোচিত-চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই ঘটেছে কিশোর অপরাধীদের মাধ্যমে। সময়ের সাথে অপরাধের ধরণ যেমন বদলায় ঠিক তেমনিভাবে এবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লাইকি, টিকটক, ভিগো, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অ্যাপসে ভিডিও নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে কিশোর গ্যাং-গুলোকে গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন শিরোনামে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথ’ একটি গবেষণা প্রবন্ধে বলেছে, কৈশোর শুরু হয় ১০ বছর বয়সে।

বাংলাদেশে ‘কিশোর গ্যাং’ বা ‘গ্যাং কালচারে’ জড়িতদের বয়স ১০-১৭। এই কিশোরেরা নিজেদের মতো করে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলছে। ওই সমাজের সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চলাফেরা সবই যেন স্বাভাবিকের চেয়েও ভিন্ন। এর বড় উদাহরণ হল কিশোরগ্যাংগুলোর নামগুলো- যেমন, বিগবস, নাইন এমএম, নাইন স্টার, ডিসকো বয়েজ, মারাত্মক ‘কিশোর গ্যাং’-সহ ইত্যাদি ভিনদেশী শব্দের নাম। ২০১৭ সালে উত্তরায় দুই গ্রুপের বিরোধের জেরে স্কুলছাত্র আদনান হত্যাকাণ্ডের পরই আলোচনায় আসে এই নামগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা না বললেই নয়, গত বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলাবাগানে আনুশকা নামে এক স্কুলছাত্রী তারই বন্ধুর ধারা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এর কিছুদিন আগেই কিশোরগ্যাং-এর বলি হন আরেক তরুণী। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় গত ২৩ ডিসেম্বর টিকটকের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে একটানা তিনদিন ধর্ষণ করে টিকটক শিশির ও তাঁর গ্যাং। এরপর ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় সোহাগ নামের এক কিশোর কিশোর গ্যাংয়ের চক্রের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন। এর আগে গত ৪ আগস্ট ফতুল্লার গাবতলীতে ওয়াসিফ গাউসিল উৎস নামের এক কিশোর রামদা হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করে। এলাকার একটি ভিডিও ফুটেজে এ ঘটনা ধরা পড়ে। এর আগে গত ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পাঠানটুলী এলাকায় আহাদ আলম শুভ মিয়া নামের এক যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এরকম আরও অসংখ্য ঘটনা আছে।

আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। অনেক আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে এই আইন কিন্তু পরিবর্তন সংশোধন করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু উপরের যে ঘটনাগুলো উল্লেখ করলাম। সেখানে সকল অভিযুক্তর বয়স ১৮, তাঁর নিচে অথবা মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। কিন্তু তারা যে কাজগুলো করেছে এগুলো স্পষ্টত অপরাধ। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

মুখে মুখে সবাই বলছি কিশোরদের বখে যাওয়ার কথা। তাদের একত্রিত হয়ে অপরাধের কথা। কিন্তু কত জন ভাবছে কেন একজন কিশোর বখে যাচ্ছে? কেনই বা তারা এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে? এসব পথ থেকে তাদের ফেরানোর পথই কি?

উত্তর খুঁজতে প্রথমেই যেতে হবে পরিবারের কাছে। কারণ ছেলে বা মেয়ে কোথায়, কার সাথে মেলামেশা করে, কি করে, কখন যায়, এই দায়িত্ব অবশ্যই সন্তানের পিতা-মাতাকে নিতে হবে। এটা পিতা-মাতার সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। কারণ পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ায় তাদের সামাজিকীকরণ ও মানসিক বিকাশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যার ফলে সমাজের বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে কিশোরেরা। কোন পিতা-মাতাই সন্তানের খারাপ চায় না। কিন্তু তাদের একটু অবহেলা একটি কিশোরের নষ্ট হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মূলত তারকাখ্যাতি, হিরোইজম, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্কতা, অর্থলোভে এসব গ্যাং-এ জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। পারিবারিক শিক্ষা, করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দিন থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে কিশোররা এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে একটি ব্যাপার না বললেই নয়, এই কিশোর গ্যাং-দের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে 'এলাকার বড় ভাই আর কিছু অসাদু রাজনীতিবিদরা। তাদেরই ছত্র-ছায়ায় কিশোর গ্যাং-এর পদচারণা ও অপরাধ বেড়েই চলেছে। খুন করতেও হাত কাপে না এসব কিশোর গ্যাং সদস্যদের। কিন্তু একজন মা’ই বোঝেন তার মানিক হারানোর দুঃখ। সেই দুঃখ-কষ্ট যে কতটা তীব্র তা আমরা হয়ত পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারি না। কিন্তু আমরা এইভাবে আর কোনও মায়ের বুক খালি দেখতে চাই না।

লেখক: সাংবাদিক

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত