ঢাকা, শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৪৬ মিনিট আগে

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা পরিবারের

  মনির হোসাইন

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:০০  
আপডেট :
 ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:৪৮

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ভূমিকা পরিবারের
প্রতীকী ছবি
মনির হোসাইন

রাজধানীর মুগদা আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোরসালিন ইসলাম লিবাব গত ৭ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা করেছে পরিবার থেকে মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ায়। তারও কিছু দিন আগে দেশে বেশ আলোচিত এক শিক্ষিকা খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন গত ১৩ আগস্ট।

পত্রিকার খবর, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজ ফিডে প্রতিদিনই আমরা দেখছি এমন অসংখ্য আত্মহত্যার খবর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বছরে প্রায় ৭ লাখের বেশি মানুষ সারাবিশ্বে আত্মহত্যা করছে। সেকেন্ডের হিসেবে যেটি প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন মানুষ আত্মহত্যা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে প্রতি সেকেন্ডে অন্তত আরও ২০ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। আত্মহত্যার এ পরিসংখ্যান বাংলাদেশেও নেহাত কম নয়। কিছু গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর অন্তত ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছে ৩৬৪ শিক্ষার্থী।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি) বলছে এসব আত্মহত্যার মূল কারণের মধ্যে রয়েছে পারিবারিক এবং আশেপাশের পরিবেশ।

আজ ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আত্মহত্যা প্রতিরোধের নানা বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ জার্নালের সাথে কথা বলেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের মিয়া।

ডা. জোবায়ের মিয়া বলেন, আত্মহত্যার মূল কারণ হচ্ছে হতাশা। কিছু মানুষ আছে যারা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। আর কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েই বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছে।

আরও কিছু কারণ যেমন, বিশ্বায়নের এ যুগে সবাই উপরে উঠতে চায় এবং সাফল্য অর্জনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। এতে কেউ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলে কিংবা নিজের আপনজন কেউ মারা গেলে বা নিজের কাছের কেউ ছেড়ে গেলেও বিষণ্নতায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেনে অনেকে।

আত্মহত্যা করা মানুষের পরিসংখ্যান জানতে চাইলে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রতিবছর বিশ্বে ৭০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করছে। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বে আত্মহত্যা করছে এক জন মানুষ। আর বাংলাদেশে প্রতি বছরে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে বলে কিছু গবেষণায় উল্লেখ আছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাধারণত ১৫-২৯ বছর বয়সী মানুষ বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। তবে সেক্ষেত্রে নারীরাই এগিয়ে।

আত্মহত্যার জন্য কে দায়ী এমন প্রশ্নে ডা. জোবায়ের বলেন, আত্মহত্যার জন্য সাম্প্রতিক পরিবারকে দায়ী বলা হলেও আমি বলবো-আমরা পরিবারকে দায়ী না বলে বলতে পারি আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবারের অনেক ভূমিকা রয়েছে। মানুষ যখন হতাশাগ্রস্ত হয় তখন তার সাথে সহানুভূতিশীল আচরণ করা উচিত। বিশেষ করে তার মানসিক রোগ আছে কিনা তাও নির্ণয় করতে হবে। কারণ বিশ্বে আত্মহত্যার ৪০ ভাগই হয়ে থাকে মানসিক রোগ বা অশান্তির কারণে। এমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পেলে অবশ্যই পরিবারের দায়িত্ব হলো একজন বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে হতাশার কারণ নির্ণয় করা।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাও অনেক বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি মানুষকে সচেতন করা যায়, নিজের জীবনকে মূল্য দেয়া, জীবনকে উপভোগ করা যদি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারে তাহলে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক কমে আসবে। কারণ এখন মানুষ অধিকাংশ সময়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়।

কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে সে কিভাবে আত্মহত্যা করলো কিংবা কেন করলো এমন সব বিষয় নিয়ে প্ররোচিত হয়ে অন্য একজন হতাশাগ্রস্ত মানুষও আত্মহত্যা করতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব বিষয়ে আলোচনা বা শেয়ার করার ব্যাপারে সবার সচেতন হতে হবে।

ডা. জোবায়ের মিয়া আরও বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে অপমানিত করে কিছু বললে বা কোনো অপবাদ দিলে তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে সেটি মেনে নিতে না পেরে বিষণ্নতায় অনেকে আত্মহত্যাকেই বেছে নিচ্ছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য, লাইক বা শেয়ারের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, পরিবারের পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিজেকে সচেতন হতে হবে। নিজেকে ভালোবাসতে হবে, নিজের জীবনকে উপভোগ করতে জানতে হবে। আর ভাবতে হবে আমি পৃথিবীতে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়নি। আমার দায়িত্ব আছে আমার পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি। আমার অনেক কিছু করার আছে দেশের জন্য। এমন পজিটিভ চিন্তা থাকলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে যাবে।

সেই সাথে অবশ্যই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে পরিবারকে। সন্তানদের শুধু শাসন নয়, তাদের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিন। তাদের পর্যাপ্ত সময় দিন, তাদের সাথে বন্ধুসূলভ আচরণ করুন। তারা কী করছে, কার সাথে মিশছে এসব নজরে রাখুন। সেসব বিষয়ে সন্তানদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। পরিবারের একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চর্চা করুন। তাহলে এটিই হবে আত্মহত্যা প্রতিরোধের মূল উপায়।

অর্থাৎ আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবার আগে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত