কবুতরের বাজার থেকে মিরপুরের প্রানবন্ত পাখির হাট: এক অমলিন ঐতিহ্যের গল্প
ওমর ফারুক
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৫, ০৯:০৩

১৯৯০-এর দশকের এক বিকেলে স্বপন কাজী তাঁর মনে এক নতুন ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন—বাড়ির ধারের রাস্তায় একটি ছোট কবুতরের বাজার বসানোর কথা। কবুতরপ্রেমী কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনার পর সেটি বাস্তবে রূপ নেয়। শুরুটা ছিল অস্থায়ী, ছোট একটি হাট, যেখানে শুধুমাত্র কবুতর বিক্রি হতো। ঢাকার অন্যান্য পাখির বাজার যেমন কাপ্তানবাজার, মেরাদিয়া ও টঙ্গী ছিল সেই সময়েও বেশ পরিচিত, কিন্তু রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের এই নতুন বাজারটি ছিল একেবারে ভিন্ন। সেখানে ছিল স্বচ্ছতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং মানুষের প্রাণপ্রিয় পাখিদের জন্য অজস্র সম্ভাবনা।
বাজারটি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। কবুতরের সঙ্গে মোরগ-মুরগির আনা হয়, পরবর্তীতে বাজারটি আরও বৈচিত্র্যময় হয়। অবৈধ কার্যকলাপের অনুপস্থিতি, মাস্তান-চাঁদাবাজদের অনুপস্থিতি এই হাটকে করে তোলে এক নিরাপদ ও স্বচ্ছ জায়গা। দ্রুতই এই বাজারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে, এবং নাম হয় ‘পাখির হাট’। আজ এটি ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় পাখির বাজার।
প্রতি শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে এই প্রাণবন্ত হাট। হযরত শাহ আলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে পাখিদের খাঁচা আর পাখির খাওয়া-দাওয়া, খেলনা ও খাঁচার দোকান। হাজার হাজার বিক্রেতা এবং তাদের পাখি ছাড়াও ক্রেতা ও দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড় থাকে সারাদিন। ছোট ছোট কবুতর থেকে শুরু করে বিদেশি টার্কি, ময়না, বাজরিগার, কাকাতুয়া, আফ্রিকান ঘুঘু এবং দামী গ্রে প্যারট—সবকিছুই এই হাটে পাওয়া যায়।
এই হাটের সবচেয়ে চমক মূলত রঙিন পাখির বিচিত্র সমারোহ। লাল, সবুজ, কমলা, হলুদ আর সাদা নানা রঙের পাখির খাঁচা সারি করে সাজানো থাকে। বিশেষত বিদেশ থেকে আনা পাখির রং-গঠন ও জাতিগত বৈচিত্র্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। সংকরায়নের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নতুন রঙের পাখি, যা এখানে এক অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। পাখির দাম চাহিদা ও রঙের ওপর নির্ভর করে, তবে দাম কখনো কখনো আকাশ ছোঁয়া।
বিশেষ আকর্ষণ গ্রে প্যারট, যা 'পাখি জগতের আইনস্টাইন' নামেও পরিচিত। এই বুদ্ধিমান পাখি মালিকের আবেগ-অনুভূতি বুঝে কথা বলে এবং প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এর দাম লাখের উপরে হলেও শখের লোকদের জন্য এটি অমূল্য।

পাখি ছাড়াও এখানে বিড়াল, হ্যামস্টার, হেজহগ, খরগোশ সহ নানা পোষা প্রাণীর উপস্থিতি বাজারটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। বিশেষ করে বিড়ালের জন্য আলাদা গলি রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বিড়াল দেখা যায়। এছাড়া হ্যামস্টারের মধ্যে সিরিয়ান হ্যামস্টার সবচেয়ে জনপ্রিয়, যা সহজে পোষা যায়।
এই বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই একেকজন পাখিপ্রেমী। অনেকেই পাখি কেনার পাশাপাশি বিক্রেতাও। তারা নিজেরা পাখির যত্ন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং নতুনদের তা শিখিয়ে থাকেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে পাখি কিনতে ও বিক্রি করতে আসেন।
পাখি পোষার আনন্দ এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য অনেকেই এই হাটের নিয়মিত দর্শক। “পাখি পোষা মানে মাইন্ড ফ্রেশ রাখা”, এ কথা পাখি প্রেমীদের মুখে মুখে শোনা যায়। পাখির নরম মায়া, স্নেহপূর্ণ ডাক এবং যত্নের সময় মানুষ মনকে শিথিল করতে পারেন, যা দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে মুক্তির অন্যতম পথ।
সফল ব্যবসায়ী আবু হোরায়রা এই হাটের ইতিহাসই যেন জীবন্ত করে তুলেছেন। তার গল্প থেকে বোঝা যায়, কিভাবে শখ আর ব্যবসা একসঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। শুরু করেছিলেন একক পাখি দিয়ে, এখন তার ব্যবসা রয়েছে আমদানিকারক ও অনলাইন বিক্রিতে।
মিরপুর পাখির হাট শুধুমাত্র একটি বাজার নয়, এটি এক প্রানবন্ত কমিউনিটি যেখানে পাখি, প্রাণী ও মানুষের এক অপূর্ব বন্ধন গড়ে উঠেছে। এখানে বিক্রি হয় না দেশি পাখি বা প্রাণী যেগুলো সংরক্ষিত, কারণ বনবিভাগ নিয়মিত নজরদারি করে। তবে বিদেশি নানা জাতের পাখি ও প্রাণীর মাধ্যমে এটি এখন অনেকের শখ এবং জীবিকার অন্যতম উৎস।
সারা বছর ধরে মানুষের ভালোবাসা আর যত্নে বিকশিত এই পাখির হাট ঢাকা শহরের প্রাণের অংশ হয়ে উঠেছে। যেখানে প্রতিদিন পাখির ডাকে মিশে থাকে মানুষের আনন্দ, শখ আর জীবনের ছোট ছোট সুখ।
বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ










