ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ২৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

হাত হারানো নাঈম পেল ৩০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২:২৬  
আপডেট :
 ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২:৪৬

হাত হারানো নাঈম পেল ৩০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আপিল বিভাগের আদেশে অবশেষে ক্ষতিপূরণের ৩০ লাখ টাকা পেয়েছে ভৈরবের একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতে গিয়ে ডান হাত হারানো শিশু নাঈম হাসান নাহিদ।

ওয়ার্কশপের মালিকপক্ষ ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ টাকা ও বকেয়া ভাতা পরিশোধ করে সোমবার প্রতিবেদন জমা দিলে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ তা গ্রহণ করে।

এ মামলার শুনানিতে শিশু নাঈমের বাবার পক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং আইনজীবী মো. ওমর ফারুক। অন্যদিকে ওয়ার্কশপ মালিকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. ফজলুর রহমান।

আদালত অবমাননার মামলা থেকে বাঁচতে মালিকপক্ষ কয়েক ধাপে এই টাকা জমা দেয়।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ৫ মে ১০ লাখ, ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি ৫ লাখ, ১৬ এপ্রিল ৫ লাখ এবং সর্বশেষ ৬ জুলাই ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার হস্তান্তর করা হয়।

এছাড়া মাসিক ভাতার বকেয়া বাবদ আগে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং সর্বশেষ ৪২ হাজার টাকা সোমবার পরিশোধ করা হয়েছে।

আদালতের আদেশের পরও টাকা দিতে মালিকপক্ষের দীর্ঘসূত্রতার কথা তুলে ধরে রিটকারীর আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, “এর আগে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ হলেও তারা ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিল। বাকি ১৫ লাখ টাকার জন্য টালবাহানা করছিল। এছাড়া শিশুটির পড়ালেখার জন্য ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে যে ৭ হাজার টাকা দেওয়ার কথা, সেটাও দেওয়া হচ্ছিল না।”

টাকা আদায়ে আদালতের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গত সপ্তাহে শুনানির দিনে মালিকপক্ষ ৫ লাখ টাকা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোর্ট বলেছে— ‘না, পুরো টাকা দিতে হবে’। এরপর আজকের দিন ধার্য করে আদালত। আজ তারা পুরো টাকাই দিয়েছে। এর সঙ্গে মাসিক ৭ হাজার টাকা ভাতার ৬ মাসের বকেয়া ৪২ হাজার টাকাও পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করেছে।”

নাঈমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার আড়াইসিধা গ্রামে। তার বাবা নিয়ামুল হোসেন আনোয়ার পেশায় একজন দিনমজুর। কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে কমলপুর এলাকার নূর বিল্ডিং নামের একটি ভবনে ভাড়া থাকতেন তিনি। ওই ভবনের মালিক হাজী ইয়াকুব হোসেনের একটি ওয়ার্কশপ ছিল।

২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে এবং বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ায় নাঈমের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে।

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে নাঈম বলে, "তখন বাসার মালিক আমার আব্বুকে বলে— 'আপনার ছেলে ত এখন স্কুলে যায় না, তাকে আমার অফিসে ২ হাজার টাকা বেতনে কাজে দিয়ে দেন'।"

অফিসের কাজ বলে নেওয়া হলেও কিছুদিন পর মালিক তাকে ওয়ার্কশপের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করেন।

নাঈম বলে, "হঠাৎ একদিন মালিক আইসা বলে আমাকে ওয়ার্কশপের ভেতরে নিয়ে কাজ করাবে। আমি ম্যানেজারকে বলি— 'আমার আব্বু-আম্মু আমাকে এই কাজে দেয় নাই, আমি এই কাজ করব না'। তখন আমাকে মারধর করা হয়। মারধর করে যখন কাজ করায়, তখনই মেশিনের ভেতরে আমার ডান হাতটা চলে যায়।"

মামলার নথিতে বলা হয়, শিশুটিকে জোর করে 'হেভি অটো ড্রিল মেশিন' চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল।

২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার পর চিকিৎসক শিশুটিকে পঙ্গু হাসপাতালে (নিটোর) নেওয়ার পরামর্শ দিলেও মালিকপক্ষ তাকে ঢাকার শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে যায়।

পরে পরিবারের সদস্যরা ২৯ সেপ্টেম্বর তাকে রাজারবাগের বারাকাহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কনুই থেকে তার ডান হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।

নাঈমের হাত হারানোর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ কোটি টাকা দাবি করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন তার বাবা। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি রায় দেয় বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

রায়ে শিশু নাঈমের নামে ১৫ লাখ টাকা করে মোট ৩০ লাখ টাকার দুটি ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) ১০ বছর মেয়াদে করে দিতে ওয়ার্কশপের মালিককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে নাঈমের পড়ালেখার খরচ হিসেবে প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা করে দিতে বলা হয়।

কিন্তু মালিকপক্ষ হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে। গত বছরের ২০ নভেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ সেই আপিল খারিজ করে হাই কোর্টের রায় বহাল রাখে।

আপিল খারিজের পরও মালিকপক্ষের ক্ষতিপূরণ দিতে গড়িমসি প্রসঙ্গে আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, "আপিল বিভাগে মালিকপক্ষ হেরে যাওয়ার পর আমরা আদালত অবমাননার মামলা করতে বাধ্য হই। এরপরেও তারা কোর্টে আসছিল না। আদালত তখন উষ্মা প্রকাশ করে তাদের পুলিশ দিয়ে আনতে বাধ্য হয়।"

তিনি বলেন, ‘‘নাঈমের বয়স এখন ১৬ বছর। এই ৩০ লাখ টাকা তার নামে নির্দিষ্ট ব্যাংকে এফডিআর করা হবে। ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে এই টাকা ভাঙা বা খরচ করা যাবে না।

এই জাজমেন্টটা একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আশা করি, শিশুদের নিয়ে কোনো কারখানা অন্তত জীবন-মৃত্যুর খেলা খেলবে না।"

দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় পর ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে পেয়ে বিনা পারিশ্রমিকে শুনানি করা আইনজীবীকে ধন্যবাদ জানিয়ে নাঈম বলে, "আমার এই মামলার জন্য আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করেছেন। মা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন, বাবা আমার জন্য ভেঙে গেছেন। আমি আমার বাবার কাছে চিরঋণী থাকব। আমি চাই আমার মত এমন নিষ্ঠুরতার শিকার আর কোনো শিশু হোক।"

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত