ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২০, ১৬:৩৩

প্রিন্ট

গল্প: না পাওয়া স্বপ্ন

গল্প: না পাওয়া স্বপ্ন
প্রতীকী ছবি

মো. রুহুল আমিন

বয়স বাড়তে বাড়তে ডাংগুলি খেলার বয়স এক সময় শেষ হয়ে যায়। স্কুল জীবনে প্রথম পদার্পণ করলাম। ভালোই লাগে বন্ধুদের সাথে সকাল হলেই স্কুলে যাওয়ার ব্যস্ততা। বই, খাতা, মাটির বা কাঠের সিলেট নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময়টা বেশ মজার। নেই বাড়তি চিন্তা। পড়াশোনা আর খেলাধুলা নিয়েই দিন পার। তবে মাঝে মধ্যে দাদির বকুনি তো মাফ নেই। বিকেল বেলা খেলা শেষে বাড়ি ফিরতে দেরি হলেই চলতো বকুনির পালা। তখন খুব একটা ভালো লাগতো না। কি হয়েছে, একটু দেরি হলে ক্ষতি কি। কিন্তু না, সে দিনের কথা আজ মনে পড়ে। সেই বকুনির তাৎপর্য ছিলো যা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাই।

যাই হোক, প্রাথমিক পেরিয়ে এবার মাধ্যমিক এ পা বাড়ালাম। কখনো ফুল প্যান্ট মাধ্যমিকের আগে পড়িনি। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হবার পর প্রথম প্যান্ট পড়া।ভালোই লাগে। মনে হয় বড় হয়ে গেছি। সকালে স্কুলে যাই আর বাড়ি ফিরি সেই বিকেলে। তাও আবার প্রায় দের কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া।আবার দের কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা। সকালে যাওয়া ভালোই লাগতো কিন্তু বিকেলে আর পা চলতো না। দুপুরে না খেয়ে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস করা খুব কঠিন ছিল। দুপুরে বেশিরভাগই খাওয়া হতো না। খাব কি করে। পকেটে তো আর টিফিন করার মতো টাকা থাকতো না। তাও কখনো স্কুল কামাই করতাম না। স্বপ্ন ছিল এক সময় ভালো কিছু করবো। সেই স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়া।

ধীরে ধীরে উপরের ক্লাসে উঠতে লাগলাম। ৬ষ্ঠ পের্য়ে ৭ম। ৮ম শ্রেণিতে উঠার পর শিক্ষকদের নতুন নতুন পরামর্শ। তোমাদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। ভালো করে বছরের শুরু থেকেই মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। তাছাড়া পুরো বই বার বার রিভিশন করা যাবে না। কি আর করা ভালো করতে হবে। সেই আশায় ‍শুরু করলাম প্রাইভেট পড়া। অংক আর ইংরেজি। নিয়মিত পড়তে থাকলাম। স্বপ্ন একটাই ভালো করতে হবে। স্বপ্ন নিজেকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো। নিজেও মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। চলতে চলতে আসলো শীতকাল। কঠিন সময়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া ছিল কঠিন ব্যাপার। ঠিক মতো ভালো শীতের পোশাকের বড়ই অভাব ছিল। যাই কোন রকমে শীতের মধ্যে চলতে থাকলো পড়াশোনা। স্বপ্ন একটাই ভালো ফলাফল করতে হবে।

তবে শীতকালে যে স্যারের কাছে গণিত পড়তাম সেই স্যারের একটা মজার ঘটনা আছে। তবে স্যারের নামটা এখানে গোপন রইল। স্যার খুব ভালো গণিত পড়ান। অনেক কষ্টে পাঁচ বন্ধু মিলে স্যারকে ধরলাম। আমাদের গণিত পড়াতে হবে। কিন্তু আমাদের আগেই স্যারের কাছে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী দিয়েই ব্যাচ হয়ে গেছে। আমাদের স্যার পড়াতে রাজি হলেন না। অনেক জোরাজুরি করার পর স্যার রাজি হলেন। পরদিন থেকে শুরু হলো প্রাইভেট পড়া। তবে স্যারের একটা শর্ত ছিল পাঁচ জনের একজন যদি কোনোদিন পড়তে না আসি সেদিন থেকেই তোমাদের ব্যাচ বাদ। শর্ত মেনে নিয়ে রাজি হলাম। দু'দিন পড়ার পর স্যার আবার শর্ত জুড়ে দিলেন। সকলকেই সকালে গোসল করে আসতে হবে। কিন্তু তখন ছিল প্রচণ্ড শীত। একেবারে হাড় কাঁপানো। কি আর করা স্বপ্ন একটাই ভালো ফলাফল। রাজি হলাম স্যারের কথায়। দু'চারদিন ভোরে গোসল করে যাওয়ার কারণে আমাদের এক বন্ধুর হাঁচি ঠাণ্ডা লেগে যায়। সেই শর্ত মোতাবেক স্যার তো আর রাজি নন পড়াতে। শর্ত অনুযায়ী পড়ার পাঁচ দিনের মাথায় প্রাইভেট পড়া বন্ধ হয়ে যায়। যাই হোক পড়ে জানতে পারলাম স্যার আমাদের না পড়ানোর জন্য এমন শর্ত দিয়েছিলেন। শুনে শুধু হাসিই লেগেছিল। তবে আমরাও ছিলাম নাছুর বান্দা। শীতের শেষ দিকে আমাদের এক বন্ধুর বাবাকে দিয়ে আবার স্যারের কাছে পড়া শুরু করলাম। কারণ বন্ধুর বাবা ছিল ঔই স্কুলেরই ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য।

না পাওয়া স্বপ্ন মানে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় না পৌঁছানো। ছাত্র জীবনে কতোই না স্বপ্ন মাথায় থাকে। চলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা। আবার অনেকের নতুন প্রেম ভালোবাসা ধরা দেয়। তা সত্যিকারের প্রেম ভালোবাসা নয়। কারণ ভালোবাসার মর্ম কি তখন বুঝতে পারতাম না। সাময়িক একটু ভালোলাগা। এক সময় তা ভুলে যাওয়া। সেই সময় জীবন কোন দিকে গড়াবে তা বলা যায় না। তবে জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ঔই সময়ই ছিল। প্রাথমিক মাধ্যমিকই জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। আমরা তা বুঝতে পারি না। আবার সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়ারও কেউ ছিল না। স্বপ্ন নিয়ে দু'কদম এগিয়ে গেলে আবার পিছিয়ে পড়তাম। কি করে না পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে। পথ যে ছিল দূর্গম।

অনেক স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে একদিন অনেক বড় কিছু হবো। অনেক না পাওয়া স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু তা কি হতে পেরেছি। না নিজের না পাওয়া স্বপ্নকে পূরণ করতে পেরেছি। পড়াশোনা শেষ করেও না হতে পারলাম একজন ভালো চাকরিজীবী না আসতে পারলাম পরিবারের কোন উপকারে। তবে হতাশ হয়নি। হালও ছাড়িনি। না পাওয়া স্বপ্ন পূরণ করতে এখন নতুন নতুন স্বপ্ন নিজের মনে গেঁথেই চলেছি। হয়তো বা এক সময় স্বপ্ন পূরণ হবে। তখন কি আর আজকের অনুভূতি থাকবে। হয়তো বা থাকবে, হয়তো বা না। তবুও এগিয়ে চলছি নতুন করে। না পাওয়া স্বপ্ন পূরণের জন্য।

চলতে চলতে এখন বুঝতে পারি স্বপ্ন কখনো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখা যায় না।ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা হলো কল্পনার মতো। সেটা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন হলো সেটাই যা নিজেকে ঘুমাতে দেয় না। যার চিন্তায় রাতে ঘুম চোখে আসে না। শুধু সামনে এগিয়ে চলার স্বপ্ন। একজন মানুষ সামনে এগিয়ে চলছে কিন্তু তার কোনো স্বপ্ন নেই সে কি করবে। কিভাবে সে তার লক্ষে পৌঁছাবে। সেই লক্ষ পূরণের জন্য কাজ করছে সেটাই স্বপ্ন। আজ নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি কি না তা নিজেই জানি না। তাই এখনো না পাওয়া স্বপ্ন পূরণ করতে শুধু এগিয়েই চলেছি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত