ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ২০ মিনিট আগে
শিরোনাম

বোর ভাইদের বিজ্ঞানের ও ফুটবলের গল্প

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৮:৪৭

বোর ভাইদের বিজ্ঞানের ও ফুটবলের গল্প
ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে ক’টি নাম মানুষের চিন্তার জগৎকে বদলে দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, তাদের মধ্যে ডেনিশ পদার্থবিজ্ঞানী নিলস হেনরিক ডেভিড বোর অন্যতম। পরমাণুর গঠন আবিষ্কার এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপনের জন্য ১৯২২ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যে যুগে আজ আমরা বাস করছি, তার বীজ রোপিত হয়েছিল নিলস বোরের গবেষণায়। তবে এই প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক পরিচয়ের সমান্তরালে বোর পরিবারের আরও একটি অধ্যায় রয়েছে, এই পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ইউরোপীয় ফুটবলের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

নিলস বোর এবং তার অনুজ হ্যারাল্ড বোর- উভয়ই ডেনমার্কের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ‘আকাদেমিস্ক বোল্ডক্লুব’-এর হয়ে প্রথম সারির ফুটবলার হিসেবে মাঠে খেলেছেন। বড় ভাই যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে জাল সুরক্ষায় ব্যস্ত, ছোট ভাই তখন মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞান ও ক্রীড়ার এমন মেলবন্ধন ইতিহাসে বিরল।

১৮৮৫ সালের ৭ অক্টোবর ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে এক অগ্রসর পরিবারে নিলস বোরের জন্ম। তার পিতা ক্রিশ্চিয়ান বোর ছিলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির (শরীরবিজ্ঞান) অধ্যাপক এবং মাতা এলেন বোর ছিলেন ডেনমার্কের একটি ব্যাংকিং পরিবারের সন্তান।

নিলস ছিলেন মা-বাবার তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। তার বড় বোন জেনি বোর পরবর্তীতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং ছোট ভাই হ্যারাল্ড বোর হয়ে ওঠেন সমকালীন ইউরোপের অন্যতম সেরা গণিতবিদ।

বোর ভাইদের শৈশব কেটেছিল বিজ্ঞানমনস্ক পরিবেশে। পিতা ক্রিশ্চিয়ান বোর প্রায়শই তৎকালীন ডেনিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতেন। নৈশভোজের টেবিলগুলোতে নিয়মিত বসত বিজ্ঞান, দর্শন আর মহাবিশ্বের জটিল সব রহস্যের আসর। আর সেই আসরগুলোতে বালক নিলস এবং হ্যারাল্ডের প্রবেশাধিকার ছিল উন্মুক্ত। এই পারিবারিক আবহ অল্প বয়সেই দুই ভাইয়ের মনে কৌতূহল ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।

শৈশব থেকেই নিলসের মেকানিক্যাল কাজের প্রতি ঝোঁক ছিল। বাড়ির ঘড়ি, তালা বা যেকোনো নষ্ট জিনিস মেরামত করতে তিনি ভালোবাসতেন। বিদ্যালয়ে তার মেধার স্বাক্ষর ছিল স্পষ্ট, তবে তার একটি স্বভাব শিক্ষকদের প্রায়শই বিব্রত করত। পাঠ্যবইয়ে কোনো ভুল বা পুরনো তথ্য থাকলে নিলস তা ধরে ফেলতেন এবং শিক্ষকদের কাছে তার প্রমাণ দাবি করতেন। ১৯০৩ সালে তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা শুরু করেন এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও পরমাণুর কাঠামোর প্রতি আকৃষ্ট হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতেই বোর ভাইদের ফুটবলের প্রতি অনুরাগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ১৮৯৯ সালে কিশোর বয়সেই দুই ভাই ‘আকাদেমিস্ক বোল্ডক্লুব’-এর জুনিয়র দলে যোগ দেন। ১৯০৫ সাল নাগাদ ২০ বছর বয়সী নিলস বোর ক্লাবের মূল দলের প্রধান গোলরক্ষক এবং ১৬ বছরের হ্যারাল্ড মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেদের স্থান পাকা করে নেন।

নিলস বোর গোলরক্ষক হিসেবে বেশ দক্ষ হলেও মাঠের খেলায় তার মনোযোগ ধরে রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। মন সবসময় পড়ে থাকত ল্যাবরেটরি কিংবা গাণিতিক সূত্রে। বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ও বোরের ব্যক্তিগত সহকারী আব্রাহাম পেইস তার ‘নিলস বোরস টাইমস’ গ্রন্থে বোরের ফুটবল জীবনের একটি জনপ্রিয় ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

সেটি ছিল জার্মানির একটি ক্লাবের বিরুদ্ধে আকাদেমিস্ক বোল্ডক্লুবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ডেনিশ ক্লাবটির আক্রমণভাগের পারফরম্যান্সের কারণে খেলার সিংহভাগ সময় বল ছিল জার্মানির সীমানায়। ডেনিশ রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক নিলস বোর তখন বেকার সময় পার করছিলেন। হঠাৎ করেই কাউন্টার অ্যাটাকে জার্মানির এক খেলোয়াড় বলটি কাটিয়ে ডেনিশ সীমানার দিকে মাপা শটে এগিয়ে দিলেন। বলটি ধীরে ধীরে গোললাইনের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। গ্যালারির হাজার হাজার দর্শক তখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছেন- এই বুঝি বোর দৌড়ে এসে বলটি লুফে নেবেন।

কিন্তু বোরের কোনো হেলদোল নেই! তিনি বলের দিকে না তাকিয়ে গোলপোস্টের কাঠের গায়ে হাত দিয়ে চিন্তায় মগ্ন। বল যখন প্রায় জালের কাছাকাছি, তখন গ্যালারির দর্শকদের চিৎকার ও এক দর্শকের ডাকে বোরের ধ্যানভঙ্গ হয়। তিনি শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি লাইনের ওপর থেকে সরিয়ে দেন।

ম্যাচ শেষে সতীর্থ ও ক্ষুব্ধ কোচ যখন বোরকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন বোর লজ্জিত মুখে জবাব দিয়েছিলেন, “আসলে খেলা চলাকালীন হঠাৎ আমার মগজে একটা জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান চলে এসেছিল। আমি চারপাশের সবকিছু ভুলে গোলপোস্টের কাঠকে ব্ল্যাকবোর্ড বানিয়ে মনে মনে খসড়া হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছিলাম!”

বড় ভাই মাঠের খেলায় কিছুটা আনমনা হলেও, ছোট ভাই হ্যারাল্ড বোর ফুটবলে ছিলেন পুরোদস্তুর পেশাদার এবং দক্ষতাসম্পন্ন। ডেনমার্কের ফুটবল মহলে তিনি ‘লিল বোর’ বা ‘ছোট বোর’ নামে জনপ্রিয় ছিলেন। ড্রিবলিং আর মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল তার, সেই সুবাদেই ১৯০৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ডেনমার্কের জাতীয় ফুটবল দলে তিনি ডাক পান।

১৯০৮ সালের অলিম্পিক গেমসেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ফুটবল টুর্নামেন্ট অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সেবার অলিম্পিকের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হয়েছিল ডেনমার্ক। হ্যারাল্ড বোরের মিডফিল্ডিংয়ের ওপর ভর করে ডেনমার্ক ফ্রান্সকে ১৭-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে। অলিম্পিক ফুটবলের ইতিহাসে এক ম্যাচে কোনো দলের সর্বোচ্চ ১৭টি গোল করার এই রেকর্ড আজ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত রয়েছে। সেই ম্যাচে হ্যারাল্ড একাই ২ গোল করেছিলেন।

ফাইনালে স্বাগতিক গ্রেট ব্রিটেনের কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে ডেনমার্ককে রৌপ্যপদকেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে অলিম্পিক থেকে সিলভার মেডেল নিয়ে ফেরার পর হ্যারাল্ড ডেনমার্কের জাতীয় নায়কে পরিণত হন। ফুটবলার হিসেবে তার জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, ১৯১০ সালে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যখন গণিতে তার পিএইচডি থিসিস উপস্থাপন করতে যান, তখন মিলনায়তনে জায়গা হয়নি।

উপস্থিত শ্রোতাদের সিংহভাগই ছিলেন গণিতবিদদের বদলে হ্যারাল্ডের ফুটবল ভক্ত ও মাঠের সমর্থক! গণিতশাস্ত্রে হ্যারাল্ড পরবর্তীতে ‘অলমোস্ট পিরিওডিক ফাংশন’ তত্ত্বের জনক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান, যা গ্রহ-নক্ষত্রের অসম কক্ষপথ গণনায় আজও ব্যবহৃত হয়।

১৯১২ সালের পর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততা এবং ডক্টরেট থিসিসের চাপের কারণে নিলস বোর ফুটবল বুটজোড়া চিরতরে তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তার স্ত্রী মার্গরেথ বোর পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “নিলস তার পিএইচডি থিসিসের কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে ফুটবলের জন্য সময় বের করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”

ফুটবল মাঠ ছাড়লেও পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় বোর কিন্তু ফুটবলের উদাহরণটি প্রায়শই আনতেন। স্যার আইজ্যাক নিউটনের ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের সূত্রগুলো ফুটবল বা যেকোনো বৃহৎ বস্তুর গতিবিধি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। ফুটবলটি কোন কোণে শট করলে কতটা দূরে যাবে, তা পদার্থবিজ্ঞানের চেনা সূত্রে জানা সম্ভব। কিন্তু বোর তার গবেষণায় দেখলেন, পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রন বা প্রোটনের মতো অতিপারমাণবিক কণার ক্ষেত্রে নিউটনের এই চেনা সূত্রগুলো সম্পূর্ণ অকেজো। অর্থাৎ, কোয়ান্টাম জগতে বস্তুর আকার বা ‘সাইজ’ একটি বড় ফ্যাক্টর।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলটি জনপ্রিয় ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর ঘোরার মতো পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রনগুলো ঘোরে। কিন্তু ক্লাসিক্যাল থিওরি অনুযায়ী, চার্জযুক্ত ইলেকট্রন যদি এভাবে অনবরত ঘুরতে থাকে, তবে তা শক্তি হারিয়ে একসময় সর্পিলাকার গতিতে নিউক্লিয়াসের ওপর আছড়ে পড়ার কথা। বোর এই জটিলতার অবসান ঘটান।

১৯১৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত পরমাণু মডেলে তিনি দেখান যে, ইলেকট্রনগুলো চাইলেই যেকোনো কক্ষপথে ঘুরতে পারে না। এদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ‘অনুমোদিত কক্ষপথ’ বা অ্যানার্জি লেভেল রয়েছে। যতক্ষণ ইলেকট্রন নিজস্ব কক্ষপথে থাকে, ততক্ষণ তা কোনো শক্তি বিকিরণ করে না। আর এই যুগান্তকারী থিওরির জন্যই ১৯২২ সালে ডেনমার্কের ঝুলিতে আসে প্রথম পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কার।

পরবর্তীতে বোর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিখ্যাত ‘কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন’ এবং ‘কমপ্লিমেন্টারিটি প্রিন্সিপাল’ উপস্থাপন করেন। তিনি দেখান যে, আলো বা ইলেকট্রন একইসঙ্গে কণা এবং তরঙ্গের মতো আচরণ করতে পারে। কোয়ান্টাম জগতের এই অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনাতত্ত্ব নিয়ে বোরের সঙ্গে তার আজীবন বন্ধু আলবার্ট আইনস্টাইনের তাত্ত্বিক বিতর্ক চলত। আইনস্টাইন এই অনিশ্চয়তা পছন্দ করতেন না এবং বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন, “ঈশ্বর পাশা খেলেন না।” বোরও দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না, তিনি পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন, “ঈশ্বরকে কী করতে হবে তা দয়া করে আপনি বলে দেবেন না, আইনস্টাইন!”

১৯৬২ সালের ১৮ নভেম্বর ৭৭ বছর বয়সে কোপেনহেগেনে এই মহান বিজ্ঞানী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে বোর পরিবারের মেধার উত্তরাধিকার এখানেই থমকে যায়নি। নিলস বোরের চার পুত্রের একজন, আজ্ঞে বোর ১৯৭৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিজ্ঞান ইতিহাসে পিতা ও পুত্রের নোবেল জয়ের এমন নজির মেলা ভার।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে প্রযুক্তির নান্দনিক ব্যবহার দেখি, অফসাইড নির্ধারণের জন্য বলের ভেতরের মাইক্রোচিপ কিংবা স্টেডিয়ামের হাই-টেক সেন্সর দেখি—তার পেছনে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের অবদান। ফুটবল মাঠের সেই আনমনা গোলকিপার নিলস বোর যদি সেদিন গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে খড়িমাটি দিয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রাথমিক হিসাব না কষতেন, তবে হয়তো আজকের আধুনিক বিজ্ঞান আরও কয়েক দশক পিছিয়ে থাকত।

সূত্র: এআইপি ডট ওআরজি, ড্যাভিডসন ডট ওআরজি

বাংলাদেশ জার্নাল/এসআইপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত