ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৪৬

প্রিন্ট

কী মধু শিল্পী সমিতির নির্বাচনে?

কী মধু শিল্পী সমিতির নির্বাচনে?
মাহমুদা আকতার

কথায় বলে ‘আসল ঘরে মশাল নাই ঢেঁকিঘরে চাঁদোয়া’। অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজকে পাশ কাটিয়ে লোকজন যখন অপ্রয়োজনী বা কম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হয় তখন এই প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শুক্রবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িতদের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ দেখে আমার এই প্রবাদটি মনে পড়ে গেলো।

বর্তমানে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অন্য ভাষায় বলা যায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে এই শিল্পটি। এখন আর প্রতি শুক্রবার নিয়মিত হলগুলোতে সিনেমা মুক্তি পায় না। দেশে নির্মিত সর্বশেষ কোন চলচ্চিত্রটি সুপারহিট বা ব্যবসা সফল হয়েছে, তার নাম বলতে গেলে অনেকেই থমকে দাঁড়াবেন। কেবল সাধারণ মানুষ নয়, ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নাম বলতে গিয়ে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্তরাও মাথা চুলকাবেন খানিকক্ষণ। এ অবস্থায় একেরে পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলগুলো, যেগুলো আছে সেগুলোতেও বেশিরভাগ কলকাতার ছবি দেখানো হয়। কিন্তু এসব নিয়ে আমাদের প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা, চরিত্রাভিনেতা, ভিলেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কারোরই তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে এবার তাদের অনেক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিন উঠে আসছে কোনো না কোনো শিল্পীর নাম। এই সুযোগে নতুন প্রজন্ম সিনেমার অনেক শিল্পীদের নাম জানার সুযোগ পাচ্ছেন, এটাও কিন্তু কম নয়। তো তাদের এই হঠাৎ জেগে উঠার কারণ হচ্ছে শিল্পী সমিতির নির্বাচন। শুক্রবার এফডিসিতে সম্পন্ন হয়েছে এই নির্বাচনের ভোট। অনেকেই এসেছেন ভোট দিতে, কেউ বা ঢুকতেই পারছেন না কেন্দ্রে। ভোট দেবেন কী করে!

নির্বাচনে সভাপতি পদে লড়ছেন এক সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমী। এই সেই মৌসুমী যার প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দারুণভাবে ব্যবসা সফল হয়েছিলো। এই ছবি মুক্তির আগে থেকেই ‘আনন্দ বিচিত্রা’ সেরা ফটো সুন্দরী হওয়ার কারণে দেশ জুড়ে আলোচিত ছিলেন এই নায়িকা। নব্বই দশকে মৌসুমীর আরো একাধিক ছবি হিট হয়েছিলো। নির্বাচনে তিনি লড়ছেন পর্দার শক্তিশালী ‘খল নায়ক’ মিশা সওদাগরের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের আগে থেকেই দুজনের বাক বিতণ্ডা নিয়ে নিয়ে সরগরম ছিলো সংবাদ মাধ্যমগুলো।

মৌসুমীর স্বামী ওমর সানীও চলচ্চিত্রে এসেছিলেন ‘চাঁদের আলো’র মতো হিট ছবি দিয়ে। এরপর নায়ক হিসাবে তিনিও আরো বেশ কয়েকটি ব্যবসা সফল উপহার দিয়েছেন এদেশের দর্শকদের। কিন্তু এখন তিনি কেবলই মৌসুমীর স্বামী, চলচ্চিত্রে তার তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে মৌসুমীর ব্যবসা দিকটা তিনিই দেখছেন। এখন আর এই জুটিকে চলচ্চিত্রে তেমন দেখা যায় না। বয়স হয়েছে তাদের, তারওপর চলচ্চিত্রের বাজার ভালো না, এ নিয়ে তাদের আর কি করারই বা আছে!

প্রসঙ্গক্রমে কিছু স্মৃতি মনে পড়ছে। নব্বই দশকের সাড়া জাগানো ছবি ‘চাঁদনী’ যখন মুক্তি পায় তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ঢাবির বাইরের গোটা এলাকা তখন ছেয়ে গেছিলো এ ছবির পোস্টারে। তখন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে হলে গিয়ে এই ছবি দেখেছেন। আমিও আমার ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে এ ছবি দেখতে গিয়েছিলাম বলাকা প্রেক্ষাগৃহে। পরে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে আবার দেখেছি ‘গীত’ হলে। তখন এ ছবির মাধ্যমে দরিুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ছবির নায়ক-নায়িকা শাবনাজ ও নাঈম। এরপর এই জুটি আরো বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন দর্শকদের। তবে বিয়ে করার পর আস্তে আস্তে ঢাকার চলচ্চিত্রকে গুডবাই জানিয়েছেন এই জুটি। এক সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা শাবনাজ স্বামী, সংসার আর ধর্মকর্ম নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

এই স্মৃতি মনে পড়ায় আফসোস হচ্ছে। এক সময় এ দেশের লোকজন দল বেধে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতেন। শুক্রবার নতুন ছবি মুক্তিকে কেন্দ্র করে রাজধানী জুড়ে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকতো। সিনেমার পোস্টার বুকে নিয়ে গোটা শহর চষে বেড়াত ভ্যানগুলো। ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর একাধিক পাতা জুড়ে থাকতো ছবির বিশাল বিশাল সব বিজ্ঞাপন। এদেশের দর্শকরা তখন লাইন ধরে ছবির টিকেট কাটতো। ঢাকার মধুমিতা, অভিসার, বলাকা হলের আঙিনা ছাড়িয়ে সেই টিকিটের লাইন রাজপথে এসে ব্যাপক যানজট তৈরি করতো। গত এক দশক আগেও এই দেশের দর্শকরা হলে গিয়ে ছবি দেখেছেন। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহের ছবি মানেই তো হিট। সালমান শাহের সঙ্গে জুটি বেধে দর্শকদের বহু হিট ছবি উপহার দিয়েছেন আরেক জনপ্রিয় নায়িকা শাবনুর। সালমান মারা যাওয়ার পর রিয়াজ, ফেরদৌস ও হালের শাকিব খানের সঙ্গে জুটি বেধেও অনেক ছবি উপহার দিয়েছেন এই নায়িকা। কিন্তু তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে চলচ্চিত্র থেকে একপ্রকার ‘নিখোঁজ’ এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তিনি আবারো চলচ্চিত্রে ফিরবেন কিনা, ফিরলেও কবে তা নিশ্চিত নয়।

‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ও ‘হৃদয়ের আয়না’র মতো ব্যবসা সফল ছবি দিয়ে ঢাকার চলচ্চিত্রে আগমন ঘটেছিলো সুদর্শন রিয়াজের। তার সমসমায়িক আরেক নায়ক ফেরদৌস ঝড় তুলেছিলেন দুই বাংলায় সমান ব্যবসা সফল ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ দিয়ে। তারা দু’জন এরপর দীর্ঘদিন দর্শকপ্রিয় একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। শুরু থেকেই ফেরদৌস তো দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু এখন আর তাদের কথা শোনা যায় না। তবে গত এপ্রিলে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে ফের সংবাদ মাধ্যমে ঠাঁই নিয়েছিলেন ফেরদৌস। এরপরই তার ভারত সফরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিজেপি সরকার।

এইসব নায়কদের হটিয়ে বর্তমানে যিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের শাহেনশা তিনি আর কেউ নন, সবার প্রিয় শাকিব খান। তবে কারো কারো অভিযোগ, তিনি কলকাতার চলচ্চিত্রে বেশি সময় দিতে গিয়ে অবহেলা করছেন ঢাকার চলচ্চিত্রকে। আর কলকাতায় তার সব ছবি জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন এমনটা তার সুহৃদরাও বলছেন না। একই সঙ্গে শত্রুদের প্রচরণা, চলচ্চিত্রে নিজের সিংহাসনকে কণ্টকহীন রাখতে নতুনদের কোনোরকম সহযোগিতা বা স্বাগত জানান না শাকিব।

পপি, শাবনুরদের পর শাকিবের নায়িকা হিসাবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন অপু বিশ্বাস। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি শাকিব-বুবলির সম্পর্ক আর শাকিবের স্ত্রী হিসাবে নিজের অধিকার নিয়ে যতটা সরব ছিলেন, ততটা নিজের চলচ্চিত্র কেরিয়ার নিয়ে নয়।

তাই সব মিলিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঢাকার চলচ্চিত্র। দেশের ১২শ’ হলের মধ্যে মাত্র ১৭৩টির অস্তিত্ব টিকে অছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র দেড়শ হলে নিয়মিত সিনেমা মুক্তি পায়। এক চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ জানান, এসব হলগুলোতে কেবল শাকিব খান অভিনীত ছবিই মুক্তি দেয়ার আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। চলচ্চিত্র মন্দার বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনেও। সর্বশেষ ঢাকার চলচ্চিত্রের কোন গানটা মোটামুটি হিট হয়েছে তা অনেকেই বলতে পারবেন না। অথচ একসময় দেশি সিনেমার গান লোকজনের মুখে মুখে ফিরতো। রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, কবরী, শাবানা আর ববিতার মত অভিনেত্রীদের লিপসিনে কণ্ঠ দিয়েই কিন্তু জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোরের মতো লিজেন্ড কণ্ঠ শিল্পীরা।

কিন্তু অন্ধকার গহ্বরে পড়ে যাওয়া ঢাকার চলচ্চিত্রকে টেনে তোলার কেনো কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ে না। এ নিয়ে শিল্পী সমিতির নেতারা কার্যত কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কিনা এমনটা স্মরণেও আসছে না। শুধু শিল্পী সমিতি কেন, পরিচালক ও প্রযোজকসহ চরচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরো যেসব সমিতি আছে, সেগুলোর কোনটিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য কোনো কাজ করছে না। বলে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের অভিমত। তাহলে শিল্পী সমিতির এই নির্বাচন নিয়ে কলা কুশলীদের এত উৎসাহ উদ্দীপনার কারণটা কী? আপনাদের রুটি রুজির অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্রই যদি টিকে না থাকে তাহলে এই সমিতি, এই নেতাগিরি দিয়ে কী করবেন আপনারা! এ নিয়ে এক সংবাদকর্মীর জিজ্ঞাসা, ‘কী মধু এই শিল্প সমিতির নির্বাচনে?’

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত