ঢাকা, শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ আপডেট : ১৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২০, ১৬:৫০

প্রিন্ট

দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড ‘দুর্যোগমুক্ত’ যশোর

দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড ‘দুর্যোগমুক্ত’ যশোর

Evaly

কাজী আশরাফুল আজাদ, যশোর প্রতিনিধি

বাংলাদেশের যে ক’টি জেলা দুর্যোগমুক্ত বলে বিবেচিত তার মধ্যে যশোর একটি। এ জেলার তাপমাত্রা গড়ে সহনশীল। নেই ভূমিধস, জলোচ্ছাস, বন্যা, নদী ভাঙনের মতো দুর্যোগ। ফলে এ জেলার মানুষ ঘূর্ণিঝড় খুব বেশি দেখে না। তবে গত বুধবারের রাতে সুপার সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডব দেখেছে মানুষ। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পুরো জেলা। প্রাণহানী ঘটেছে ১৩ জনের। নষ্ট হয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফল ও ফসল। উপড়ে গেছে লাখ লাখ গাছ। বিদ্যুৎ, টেলিফোনসহ সকল নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেছে। ধংস হয়ে গেছে হাজার হাজার আধাপাকা ও কাঁচা বাড়ি ঘর।

সবজি উৎপাদন করে দেশের ৮০ শতাংশ চাহিদা পুরাণ করে যশোর। সেই যশোরের মোট সবজি ক্ষেতের ৮০ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। মোট পাট ক্ষেতের অর্ধেক ধংস হয়ে গেছে।

ঝড়ে সবজি, আম, লিচু, পানসহ মোট ৩২ হাজার ৫১৬ হেক্টর জমির ফল ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কৃষি বিভাগের হিসেবে এ ক্ষতির কথা বলা হলেও ক্ষতির পরিমান আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনের পর কৃষকদের প্রণোদনার অর্ন্তভুক্ত করার পাশাপাশি সব ধরনের সহায়তার কথা জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, যশোরে এবার পাট চাষ হয়েছিল ২৩ হাজার ৫৬৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১১ হাজার ৭৮৩ হেক্টর যা মোট আবাদের ৫০ শতাংশ।

শাক সবজি চাষ হয়েছিল ১৪ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১১ হাজার ৭৪৮ হেক্টর জমির। যা মোট আবাদের ৮০ শতাংশ।

পেঁপে চাষ হয়েছিল ৭৫০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৬০০ হেক্টর। কলা চাষ হয়েছিল ১৫০০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১১২৫ হেক্টর। মরিচ আবাদ হয়েছিল ৬৭৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৪০৫ হেক্টর জমির। মুগডাল চাষ হয়েছিল ১০৪৫ হেক্টর জমিতে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৭৩২ হেক্টর।

তিল আবাদ হয়েছিল ২৬৩৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ২১০৮ হেক্টর জমির। ভুট্টা আবাদ হয়েছিল ৫৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৪৪ হেক্টর। আম ছিল ৩৮৯৫ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ২৭১৬ হেক্টর জমির। লিচু ছিল ৭০০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৪৮০ হেক্টর জমির। পান ছিল ১১০০ হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ৭৭৫ হেক্টর জমির। যা মোট আবাদের ৭৫ শতাংশ।

যশোরের কাশিমপুর ইউনিয়নের দৌলতদিহী গ্রামের সবজি চাষি আমির তরফদার জানান, তিনি ও ভাইয়েরা মিলে ১০ বিঘা জমিতে পটল ও ৩ বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছিলেন। ঘূর্ণিঝড়ে তার বানের পটল পুরোটাই মাটিতে পড়ে গেছে। বেগুনেরও ক্ষতি হয়েছে তবে কম। পটলের এ গাছ থেকে আর তেমন ফসল পাওয়া যাবে না বলে জানান তিনি। এতে তাদের প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতির হবে বলে তিনি মনে করছেন।

যশোরের চুড়ামনকাটি এলাকার সবজি চাষি হজরত আলী জানান, এ বছর তিনি তিন বিঘা জমিতে পটল, চার বিঘা জমিতে করোলা চাষ করেছিলেন। বুধবারের ঝড়ে তার পটল ও করোলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুধু আমার নয়। আমার এ এলাকার বেশিরভাগ সবজি চাষির ফসল নষ্ট হয়েছে।

একই কথা বলেন সদর উপজেলার নোঙ্গরপুর এলাকার সবজি চাষি রমজান আলী। তিনি বলেন, বুধবারের প্রলয়ংকারী ঝড়ে আমাদের সবজি, ফসল শুধু নষ্ট করেনি। এ এলাকার বিভিন্ন বাগানের আম লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশ গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে। উপড়ে গেছে বহু গাছ। প্রায় সম্পূর্ণ ঝড়ে পড়েছে আম ও লিচু।

তিনি আরও বলেন, করোনার কারণে আমরা এমনিতে সবজি বিক্রি করতে পারছিলাম না। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকার মোকামে সবজি পাঠাতে শুরু করেছি। ঠিক সেই মুহুর্তে এ ধরনের ধাক্কা আমাদের পথে বসার উপক্রম করে দিয়েছে।

ঝিকরগাছার তরিকুল ইসলাম বলেছেন, উপজেলার হাজার হাজার গাছ উপড়ে পড়ে গেছে। ঐতিহাসিক যশোর রোডের ৫টি গাছ পড়ে আন্তর্জাতিক সড়কটি দেশের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য তা অপসারন করা হয়।

তিনি আরো বলেছেন, যশোরের অনেক গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হয়নি। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে চারিদিক।

জেলা পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ের কবলে পড়ে ওইদিন জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মণিরামপুরে একটি পরিবারের ৫ জন রয়েছে। এখনো গ্রামের অনেক রাস্তার উপর বড় বড় গাছ পড়ে আছে।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ জানিয়েছেন, জেলার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে সাধ্য মতো দাঁড়িয়েছে সরকার। নগদ টাকা ও ঢেউটিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনের পর বলেন, ‘আম্পান এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। এমনিতেই করোনার কারণে কৃষকরা সমস্যায় ছিলেন। তারপর ঝড়ের এ ক্ষতি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রণোদনায় ক্ষতিগ্রস্থ এসব কৃষকদের অর্ন্তভূক্ত করা হবে। এছাড়া কৃষকরা যাতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে সেজন্য কারিগরি সহায়তাসহ সার্বিক সহায়তা দেয়া হবে।’

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত