ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:৩৭

প্রিন্ট

‘এমপিকে টকশোতে দেখি, এলাকায় দেখি না’

‘এমপিকে টকশোতে দেখি, এলাকায় দেখি না’
জাহিদ খন্দকার, গাইবান্ধা প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়ন যেন পরিত্যক্ত এক জনপদ। ইউনিয়নের কাশিমবাজার যেন এক নতুন ছিটমহল! গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে এই বাজারের চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করলেও সরকারি কোনো কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজ নিতে যাননি। ভাঙন কবলিতদের পাশে দাঁড়াতে জনপ্রতিনিধিদের নেই কোনো উদ্যোগ। নেই ভাঙন প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা।

গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও ওই এলাকা দেখাশোনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের বলে দাবি করেছে গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ড।

তবে গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী জানালেন, তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে কথা হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার এলাকায় গত দুই মাসে তিস্তা নদীর ভাঙনে চার শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। হুমকিতে আছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ওয়াফদা বাঁধ। ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ বি-এল উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নাজিমাবাদ দাখিল মাদরাসা ও ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কাশিমবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এখন হুমকির মুখে। তিস্তা নদীর ভাঙনে নিঃস্ব মানুষগুলো মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এমন দুর্দিনে কেউ আসেনি খোঁজ নিতে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১১ নং হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজারের বাসিন্দা রওশন আরা বেগম। জন্মের পর বাবাকে দেখেননি। অনেক কষ্টে বড় করা মেয়েও এক দুর্ঘটনায় তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমায়। মেয়ের মরদেহ বাড়ির উঠানে কবর দেয়া হয়। কষ্টের মাঝে মেয়ের কবর দেখে মনে সান্তনা পেতেন রওশন আরা। মনে করতেন আদরের মেয়ে তার পাশেই আছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে মেয়ের কবরসহ তার ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ভিটেমাটিহারা রওশন আরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মনে অনেক কষ্ট। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। আমরা কোন দেশে আছি। আমাদের জন্য কেউ দয়া করে না। এখন আর বাঁচার ইচ্ছা নেই। আল্লাহ আমাদের মরণ দাও।’

নদী ভাঙনের শিকার আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। সরকারি কোনো কর্মকর্তা তো দূরের কথা, আমরা যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি তারাও খোঁজ নিতে আসেনি।’

ভাঙনের শিকার আবু তালেব বলেন, ‘ভিটেমাটি সব নদীতে গেল, ভিডিও করে কী লাভ। ঘরবাড়ি কি আর ফিরে আসবে। সবাইকে চেনা হয়েছে, বিপদে কেউ আসে না।’

হরিপুর ইউনিয়নের রওশন আরা, ‘আলেয়া আর আর আবু তালেবের মতো গত দুই মাসে ভিটেমাটি হাড়িয়ে নিঃস্ব হয়েছে চার শতাধিক পরিবার। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরবাড়ি সরাতে ব্যস্ত সবাই। কারও সঙ্গে কথা বলার যেন সময় নেই তাদের।’

এমন পরিস্থিতিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাও অভিযোগ করছেন, এখনও কোনো জনপ্রতিনিধি ভাঙন কবলিতদের পাশে দাঁড়ায়নি।

হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আমরা বারবার যোগাযোগ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি, কিন্তু তারা নেয়নি। ফলে আমার বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ভাঙন প্রতিরোধের জন্য গাইবান্ধায় যোগাযোগ করলে বলে কুড়িগ্রামের কথা, আর কুড়িগ্রামে যোগাযোগ করলে বলে গাইবান্ধার কথা। কেউ আসেনি খোঁজ নিতে। আমরা কোন জেলার বাসিন্দা এখনও বুঝতে পারছি না।’

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসাশিক্ষক মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘ভাঙন প্রতিরোধে কুড়িগ্রাম অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছুটা কাজ করলেও তা ছিল লোক দেখানো। এখানে কোনো জনপ্রতিনিধি খোঁজ নিতে বা সাহায্য করতে কখনও আসে না।’

কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামের আব্দুল করিম মিয়া। অভিযোগ করে বলেন, ‘হামরা এমপিকে সবসময় টকশোতে দেখি, এলাকায় দেখি না।’

আব্দুল করিমের মতো সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাশিমবাজারের তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার অর্ধশত মানুষ সাংবাদিকের কাছে এমন অভিযোগ করেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ভাঙন কবলিতদের পাশে দাঁড়াননি। নেননি ভাঙন প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থাও।

হরিপুর ইউনিয়নের কাশিমবাজার গ্রামের বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্টে আছি। গত নির্বাচনে আমাদের নাজিরাবাদ স্কুলমাঠে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এমপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কথা তিনি রাখেননি। নির্বাচনের পর আর খোঁজ নেননি।’

হরিপুর ইউনিয়নের পাড়াসাধুয়া গ্রামের রঞ্জু মিয়া জানান, ‘আমরা এমপিকে টকশোতে দেখি। বড় বড় কথা বলেন। ওনার কথায় মনে হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মানুষ শান্তিতে আছে। কিন্তু আমরা যে কত কষ্টে আছি বোঝাতে পারব না।’

তিনি বলেন, ‘এমপি মহাদয় বলেছিলেন যেকোনো মূল্যে হোক কাশিমবাজার এলাকার মসজিদটি রক্ষা করা হবে। মাসজিদটি এখন নদীতে বিলীন। আপনি কী করলেন? এখন আমরা মানবেতন জীবন কাটাচ্ছি, আপনি খোঁজও নিচ্ছেন না। হয় আমাদের সহযোগিতা দিন না হয় আমাদেরকে নদীতে ভাসিয়ে দিন। ধুকে ধুকে মরার চেয়ে একবারে মরাই ভালো।’

স্থানীয় মাদারীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মমতাজ বেগম বলেন, ‘নদী ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে নাজিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাজিমাবাদ বি-এল উচ্চ বিদ্যালয়, নাজিমাবাদ দাখিল মাদরাসা ও কাশিমবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হবে। তাই সরকারসহ জন-প্রতিনিধিদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুস ছাত্তারের সঙ্গে কথা হলে তিনি সব দোষ চাপিয়ে দেন ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির ওপর।

আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘দুই চরের মাঝে দ্বন্দ্বের কারণে ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি কখনও কাশিমবাজারে আসেন না। আমি যে মেম্বার, আমাকে যে জনগণ ভোট দিয়েছে মানুষের সেবা করার জন্য, এই কথা চেয়ারম্যান বুঝতে চান না। তিনি এই এলাকায় কখনও আসেন না। চেয়ারম্যান না চাইলে আমি কিভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াবো?’

হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কী কাজ করলাম আর না করলাম সে জবাবদিহিতা কি আপনাকে দিতে হবে? উপজেলায় আসেন কী কী কাজ করেছি দেখে যান।’

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম সরকারের মুঠোফোনে বারবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

তিস্তা নদীর কাশিমবাজার পয়েন্টে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘গাইবান্ধার মানচিত্রে হরিপুরের কাশিমবাজার থাকলেও গাইবান্ধা থেকে ওই এলাকা অনেক দূরে। ওই এলাকার দেখাশোনার দায়িত্ব কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেত নিতে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’

জনগণের অভিযোগের বিষয়ে গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘আমি কয়েকবার কাশিমবাজারে গেছি। সেখানে একটি মসজিদের জন্য ১০ লাখ টাকাও দিয়েছি। রাস্তার জন্য টাকা দিয়েছি। আরও ৬টি মসজিদের জন্য টাকা দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাতে পারছি না। ওই জায়গাটি উলিপুর-কাশিমবাজার বর্ডার এলাকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও বিভাগীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। কাল-পরশু ডিজির সঙ্গে কথা বলব। আশা করি বস্তা ফেলবে। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর কাশিমবাজার সরেজমিনে যাব।’

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত