ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৭ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২১, ০৯:৩০

প্রিন্ট

বীরশ্রেষ্ঠদের কথা

ছেলেমেয়েরা স্বাধীন হল, দেশে আজ কত শান্তি

ছেলেমেয়েরা স্বাধীন হল, দেশে আজ কত শান্তি
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ

জার্নাল ডেস্ক

মুন্সি আব্দুর রউফ এর জন্ম ১৯৪৩ সালে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায়। ১৯৬৩ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ যোগ দেন তিনি। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর দিকেই প্রাণ হারান এই অকুতোভয় সৈনিক।

মুন্সি আব্দুর রউফের মা মকিদুন্নেসার বয়স এখন ৯৯ বছর। ফরিদপুরের আড়পাড়া গ্রামে বসবাস করেন তিনি। ডয়েচে ভেলের সঙ্গে কথা হয় মকিদুন্নেসার। মুন্সি আব্দুর রউফ সম্পর্কে তিনি বলেন, ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল রউফ। সারাবেলা নদীতে নেমে সাঁতার কাটতো আর উঠতো না।

তরুণ বয়সেই চাকরির সন্ধান

রউফ যখন কিশোর, তখন তার বাবা মারা যান। ফলে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন রউফ। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েই ভর্তি হন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে। একাত্তরের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর সময় তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে। সেখান থেকেই তিনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

মকিদুন্নেসা জানান, যুদ্ধে যাওয়ার আগে রউফ তার মাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। একমাত্র ছেলে হওয়ায় মায়ের জন্য খাবার সংস্থানের ব্যবস্থাও করে গিয়েছিলেন। কথা ছিল, যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় বোনের জন্য একটা শাড়ি নিয়ে আসবেন।

মর্টারের গোলায় নিহত রউফ

শাড়ি নিয়ে আর ফিরতে পারেননি রউফ। একাত্তরের এপ্রিলে শত্রুপক্ষের মর্টারের গোলায় প্রাণ হারান তিনি। বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআরের ১৫০ জন সৈনিককে রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌ-পথে নিরাপত্তাব্যুহ তৈরির দায়িত্বে দেয়া হয়। এই দলের এক নম্বর এলএমজি চালক মুন্সি আব্দুর রউফ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর উপজেলাধীন বাকছড়ির একটি বাঙ্কারে। ৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২ নং কমান্ডো ব্যাটালিয়ান রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌ-পথের আশেপাশে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমণ করে।

ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তখন পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিরাপদে অবস্থান ত্যাগের জন্য দরকার নিরবিচ্ছন্ন কাভারিং ফায়ার। মুন্সি আব্দুর রউফ এর এলএমজির কাভারিং ফায়ারে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তার সৈন্যদের নিয়ে পেছনে হটতে থাকেন। তার অব্যর্থ গুলিতে শত্রুদের স্পিড বোটগুলো ডুবে যায় এবং সেগুলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা হতাহত হয়। হঠাৎ করে শত্রুর একটি গোলা এসে পড়ে রউফের ঠিক উপরে। মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মুন্সি আব্দুর রউফের দেহ।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করায় বাংলাদেশ সরকার ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও দীর্ঘ সময় তার সমাধিস্থলের কাছে যেতে পারেননি মা মকিদুন্নেসা।

মকিদুন্নেসাকে দেখাশুনা করছেন মুন্সি আইয়ুব আলী। তিনি জানান, ১৯৯৬ সালে আমরা নানিয়ারচরে রউফের সমাধিস্থলে যাওয়ার অনুমতি পাই। এর আগে নিরাপত্তার কারণে আমাদেরকে সেখানে যেতে দেয়া হয়নি।

কৃতজ্ঞতা

মকিদুন্নেসা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নানিয়ার চরের বাসিন্দাদের প্রতি। যারা অপার স্নেহে তার সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। তাই, অনেকে চাইলেও সন্তানের দেহাবশেষ নানিয়ার চর থেকে তুলে আনতে রাজি হননি তিনি।

এই শহীদের জননী মনে করেন, যুদ্ধে তিনি সন্তান হারিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু দেশতো স্বাধীন হয়েছে। দেশে শান্তি এসেছে। এই শান্তির দেশের সব সন্তানকে নিজের সন্তান মনে করেন তিনি। তাই আজ আর কোনো দুঃখ নেই মকিদুন্নেসার।

মুন্সি আব্দুর রউফ এপ্রিলের ঠিক কোন তারিখে নিহত হন সেটি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ বলছেন, একাত্তরের ৮ এপ্রিল, কেউ ১৯ এপ্রিল আবার কেউবা বলছেন ২০ এপ্রিল। তবে তার সমাধিস্থলে মৃত্যুর তারিখ লেখা আছে ২০ এপ্রিল, ১৯৭১। সূত্র: ডয়েচে ভেলে

বাংলাদেশ জার্নাল/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত