ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ২৫ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২১, ১৭:১৯

প্রিন্ট

মনোহরদীতে জামদানি শিল্পের অন্তিম দশা

মনোহরদীতে জামদানি শিল্পের অন্তিম দশা
ছবি- প্রতিনিধি

আতাউর রহমান ফারুক, মনোহরদী প্রতিনিধি

নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে জামদানি শিল্পে এখন চরম দুর্দশা চলছে। শতাধিক তাঁতের এ শিল্প এখন একটি তাঁতে তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। মালিক ও তাঁতীরা এখন ভিন্ন পেশায়। পর্যাপ্ত পুঁজির জোগান পেলে এ শিল্প ঘুুুরে দাঁড়াতে পারে এবং একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় লাভজনক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে মাত্র ২০/২৫ বছর আগেও ছিলো জামদানি শিল্পের একটি রমরমা পরিস্থিতি। কুটির শিল্পের আকারে গ্রামটির কমপক্ষে ২০টি পরিবারে ছিলো শতাধিক তাঁত। এসব তাঁতে দিন-রাতজুড়ে বুনন হতো চমৎকার জামদানি শাড়ি। কর্মচাঞ্চল্যে মুখর ছিলো নিভৃত পল্লীর একটি শান্ত জনপদ।

স্থানীয় এবং দেশের সম্ভ্রান্ত বৌ-ঝিদের কাছে এ শাড়ির কদর ছিলো আকাশচুম্বি। বাজারে ছিলো এর বর্ণনাতীত আদর ও কদর। এ শিল্পের সাথে জড়িতরাও ছিলো এ পেশার প্রতি ভীষণ নেশাক্তের মতো। তারা এ শিল্পকে ভালোবেসে প্রত্যেক ঘরে কমবেশি ৭/৮টি তাঁতের জায়গা করে দিয়েছিলো।

বাড়ির কর্তা বৌ-ঝিসহ পেশাদার কারিগররা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে নিপুণ হাতে সন্তানস্নেহে একেকটা শাড়ির বুনন তুলতেন। শাড়িভেদে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগতো। কোনো কোনোটায় লেগে যেত ১২ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত। তারপর সে শাড়ি বিক্রেতা কিংবা সম্ভ্রান্ত গৃহিণীদের হাতে তুলে দিয়ে নতুন শাড়ি বুননে মনোযোগী হতেন তারা।

এভাবেই আবর্তিত হতো তাদের সপ্তাহ, মাস, বছরের সব দিন-রাত্রি। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে সে শিল্প আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যমান জামদানি বুননের তাঁত কমতে কমতে মাত্র দু'বছর আগে এসে ঠেকেছিলো ১৫/ ২০টিতে। গেলো করোনার ধাক্কায় সে তাঁত এখন মাত্র একটিতে এসে ঠেকেছে। সেটি চালাচ্ছেন সানাউল্লাহ (৩৫)।

সরেজমিনে সানাউল্লাহর বাড়িতে বসে আলাপকালে তিনি জানান, জামদানি শাড়ির চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এবং বাজার আগের চেয়ে অনেক ভালোও হয়েছে। ক্রেতারও কোনো অভাব নেই এখন। তারাই কেবল পুঁজির অভাবে সে চাহিদা মেটাতে পারছেন না।

সেখানে উপস্থিত পুরনো একজন জামদানি কারিগর ও তাঁত মালিক দুলাল কথা প্রসঙ্গে জানান, তার নিজেরই ছিলো ৮/১০টি তাঁত। ২৫ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত ছিলেন তিনি। কিন্তু পু্ঁজির অভাবে ক্রমাগত ক্ষতির মুখোমুখি হতে হতে শেষ পর্যন্ত বছর কয়েক হলো এ পেশায় ইস্তফা দিয়েছেন। এখন গরু লালন-পালন করেন ও কৃষিকাজ দেখাশোনা করেন।

পর্যাপ্ত পুঁজির জোগান পেলে এ পেশায় ফিরে আসতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন বলে জানান কারিগর দুলাল। এ নিয়ে তার আগ্রহের কমতি নেই বিন্দুুমাত্র। কারণ জামদানি শিল্পের সাথে জড়িত তার আশৈশবের স্মৃতি ও পরিচিতি। এ শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসাও প্রচুর।

তিনি জানান, এ শিল্পে জড়িত তার গ্রামের অধিকাংশরাই এখন অটোরিকশা চালক। কেউবা মাংস বিক্রি করেব বাজারে। কেউবা পুঁজি হারিয়ে তাঁত বেঁচে হয়েছেন সবজি বিক্রেতা। এভাবে গত এক যুগে এ শিল্প থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ৩/৪শ' ব্যক্তি ভিন্ন জীবিকার পথ বেছে নিয়েছেন।

একটিমাত্র তাঁতে দৌলতপুরে এ শিল্পের অস্তিত্ব ধরে রাখা সানাউল্লাহর ছোট ভাই আমিনুল (২৮) এখন ভাইয়ের সাথে জামদানি বুনন করেন। আমিনুল জানান, মাঝে মাঝে কতো মহল বা কর্তৃপক্ষই এখানে এসে তাদের খোঁজ খবর করেন। সব দেখেশুনে তাদের আশার বাণী শোনাতেও ভোলেন না তারা।

কিছুদিন অব্যহত থাকে তাদের তৎপরতা। কিন্তু কেউ বা কোনো মহলই সহজ শর্তে পর্যাপ্ত পুঁজির ব্যবস্থা নিয়ে এ শিল্পে জোয়ার আনতে এগিয়ে আসেননি এখনো পর্যন্ত। ফলে একটিমাত্র তাঁতের মাধ্যমে তারাই কেবল এ শিল্পের অস্তিত্ব এখনো টিকিয়ে রেখেছেন।

স্বল্প পুঁজির সীমিত সামর্থ্যে কতোদিন তারা টিকতে পারবেন? এভাবে কতোদিন সম্ভব? তারপর কি হবে? এমন নানা প্রশ্ন আমিনুলের।

এ ব্যাপারে বিসিক নরসিংদী জেলা অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মাহামুদুল হাসান জানান, করোনার জন্য কমবেশি সব শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত। মনোহরদীর জামদানি শিল্পে জড়িতরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার অফিস ঋণ সুবিধাসহ সব ধরণের সহযোগীতা প্রদানে প্রস্তুত আছে বলে বাংলাদেশ জার্নালকে জানান তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল/এসকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত