ঢাকা, সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৩ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৩৪ মিনিট আগে
শিরোনাম

‘গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার’ ওরা তিনজন সবার অনুপ্রেরণা

  সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫:২৪  
আপডেট :
 ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫:৩৫

‘গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার’ ওরা তিনজন সবার অনুপ্রেরণা
গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালায় চা বিক্রি চলছে। ছবি: প্রতিনিধি
সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, দিনাজপুর

শীতের পড়ন্ত বিকেলে হালকা রোদ পড়েছে। একটি অটোরিকশাযোগে বড় পাতিল, চায়ের ক্যাটলি, গ্যাসের সিলিন্ডার, গ্যাসের চুলা, মাটির চায়ের কাপ নিয়ে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর এ শহীদ ময়দানের শহীদ মিনার সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে উপস্থিত হলেন তিন তরুণ। তাদের বয়স ২১ থেকে ২৪ এর মধ্যে। পলিথিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো একটি ঠেলাগাড়ি খুলতে শুরু করেন তারা। পলিথিন খোলার পর ঠেলাগাড়ির ভেতর থেকে প্লাস্টিকের চেয়ার বের করে বসিয়ে দিতেই বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষ বসতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যেই সব চেয়ার পূর্ণ হয়ে গেল। চেয়ারে বসে আড্ডা দেন, কেউ কেউ আবার সেলফি তুলছেন। কেউ কেউ ছোট্ট এক টুকরা কাগজে কিছু লিখছেন। আবার কেউ লেখাটি নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করছেন। বলছি দিনাজপুরের গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা খ্যাত একটি বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের তিন শিক্ষার্থীর চা-দোকানের খোলার দৃশ্যের কথা।

একজন এসে বললেন, কতক্ষণ পর চা পাওয়া যাবে, আমরা চারজন এসেছি। অনেক দূর থেকে চা খেতে এসেছি। আমাদেরকে আগে দিতে হবে কিন্তু। বিক্রেতারা জানালেন, কিছুক্ষণের মধ্যে পেয়ে যাবেন। ২০ মিনিট সময়ের মধ্যেই চা তৈরি হয়ে যাবে। সবাই পাবেন, একটু ধৈর্য্য ধরুন। কথা বলতে বলতেই তিন তরুণের মধ্যে কেউ চুলা জ্বালাতে ব্যস্ত, কেউ চা আর দুধ গরম করছেন, আবার চা আর দুধের সাথে এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, চায়ের মসলা ও চিনিসহ গরম করছেন। অন্যজন সসপেনে দুধ ঢালতে, ক্রেতাদের বসার জন্য ছোট ছোট টুলগুলো সারি সারি করে সাজাতে ব্যস্ত।

ওরা তিনজন দিনাজপুরের একটি বেসরকারি পলিটেকনিক কলেজের সিভিল বিভাগের তিন শিক্ষার্থীর ভাসমান চায়ের দোকান ‘গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা’র সার্বিক পরিস্থিতি।

শুধু বড় বড় চাকরি করতে হবে এমন চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। পৃথিবীতে কোনো কাজই ছোট নয়- এমন চিন্তা থেকে তিন শিক্ষার্থী খুলে বসেছেন চায়ের দোকান। দোকানের নাম দিয়েছেন গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা। তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রধান উদ্যোক্তা সুজন শেষ সেমিস্টার, সাইফুল ও রানা পড়ছেন ৭ম সেমিস্টারে। তাদের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলায় দন্ডপাল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। দিনাজপুর শহরের বটতলী আব্দুল মালেকের চায়ের দোকানে একদিন রাতে চা খেতে খেতে আব্দুল মালেকের সাথে কথা বলে জানা গেল তারা এই চা বিক্রি করে প্রতিমাসে কেমন আয় করেন। আব্দুল মালেক বলছিলেন, সব খরচ বাদ দিয়ে তার প্রতিমাসে ৯০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। প্রতিদিন তার আয় তিন হাজার টাকা। এখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর, দশ কেজি দুধ আর দুই কেজি চা পাতাসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে তিন শিক্ষার্থী । তাদেরকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

দিন দিন যেভাবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তাতে এক সময় কলেজে পড়াশোনা ও বাড়ি একই এলাকায় হওয়ায় তারা নিজেরা কিছু একটা করার চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০২০ সালে ইউটিউবে ভারত ও চীনে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের ভিডিও দেখে চা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন তারা। তবে আর্থিক ও পরিবারের সাপোর্ট না থাকায় শুরু করতে পারেননি। পরে তারা অনলাইনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে অর্থ জমিয়ে শুরু করেন ভাসমান চায়ের দোকান। নাম দেন ‘গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা’।

গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা স্টল থেকে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় খোলা হয়। এই সময়ের মধ্যেই তাদের ৪০০ থেকে ৪৫০ কাপ চা বিক্রি হয়। এখানে ভিন্ন দামের ৫ রকমের চা পাওয়া যায়, পোড়ামাটি ও প্লাস্টিকের কাপে চা পরিবেশন করা হয়। তাদের চায়ের মধ্যে রয়েছে গ্র্যাজুয়েট স্পেশাল চা। গ্র্যাজুয়েট স্পেশাল চা (চিলি কাপ), হরলিকস চা, চকলেট চা, জাফরান চা, ফ্রান্স ফ্রাই চা।

গ্র্যাজুয়েট স্পেশাল পোড়ামাটির প্রতি কাপ চা ২০ টাকা আর প্লাস্টিকের প্রতি কাপ চা ১৫ টাকা। এছাড়াও ৩০ টাকা ৬০ টাকায় চা বিক্রি করা হয় যেখানে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে চায়ের চুমুকে সময় পার করতে আসেন অনেকে।

গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার চায়ের স্বাদ যেমন অনন্য, তেমনি বাহারি চায়ের দোকান। এই দুইয়ের আকর্ষণে দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন চা-প্রেমিরা। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে চায়ের দোকান চলে। ভিন্ন উদ্যোগ ও স্বাদের টানে শহরজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তিন শিক্ষার্থীর গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা।

দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শ্রাবণী রানী দাস বলেন, আমরা বন্ধুরা মিলে আজ এসেছি গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা ভাইদের চা খেতে। এখানে চা খাওয়ার অনুভূতিটা অন্যরকম। চায়ের স্বাদ অসাধারণ। পরবর্তীতে আমরা এখানে আবার আসব চা খেতে। ভাইরা যে কাজটি করছে সত্যি নতুন প্রজম্মের জন্য অনুপ্রেরণা।

দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান মিম বলেন, পড়ন্ত বিকেলে সুন্দর পরিবেশে অসম্ভব ভাল চা খেলাম। গ্র্যাজুয়েট পাশ করে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রয়েছে। তাদের জন্য অবশ্যই শুভকামনা রইল।

স্থানীয় রবিউল ইসলাম রবি বলেন, আমি দিনাজপুরের মানুষ হয়ে তাদের প্রশংসা করি। তারা তিনজন তরুণ সমাজকে একটা মেসেজ দিতে পেরেছে যে, কোনো কাজই ছোট নয়। তাদের চায়ের স্বাদ খুব ভালো। তাদের তিনজনের জন্য শুভ কামনা।

বর্ষা জাহান মিম নামে এক চা-প্রেমি বলেন, আমি মনে করি শিক্ষিতরা চা বিক্রি করতে পারবে না- সেই ধারণাটাই ভুল। তারা তো কাজ করছে, চাঁদাবাজি বা চুরি করছে না। তাদের এই কাজ অন্যান্য বেকার শিক্ষিত যুবকদের জন্য অনুপ্রেরণা।

গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার প্রধান উদ্যোক্তা সুরুত জামান ইসলাম সুজন বলেন, চায়ের দোকান চালুর শুরুতে কেউ ভালোভাবে নেয়নি। পরিবারের সঙ্গে এক প্রকার যুদ্ধ করতে হয়েছিল। পরে অবশ্য পরিবারকে ম্যানেজ করা গেছে। এছাড়াও পরিকল্পনা অনেক আগে করলেও আর্থিক সমস্যার কারণে শুরু করা যায়নি। পরবর্তীতে ফাইবারসহ বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে কাজ করে ৮০ হাজার টাকার মূলধন দিয়ে দুই মাসে গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার পথচলা শুরু হয়।

তিনি বলেন, প্রথমে সাড়া না পেলেও বর্তমানে প্রচুর চাহিদা আমাদের এই ‘গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা’ দেকানের চায়ের। শুরুর দিকে দোকানে ২০ লিটারের মতো দুধ লাগলেও এখন প্রতিদিন ৬০ লিটারের মতো দুধ লাগছে। মানুষ গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার চা খেতে আসে। আমাদের এই চায়ের সবাই প্রশংসা করছে। ভবিষ্যতে এটা নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে দোকান দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে।

গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার উদ্যোক্তা মোজাইদুল ইসলাম রানা বলেন, কোন পরিবারই চায় না তাদের ছেলেরা লেখাপড়া শেষ করে চা স্টল দিক। আমাদের ক্ষেত্রেও পরিবারের পক্ষ থেকে না বলে দিয়েছিল। পরিবারের সাথে যুদ্ধ করে এই চা স্টল দিয়েছি। এখন আমাদের এই কাজে সবাই প্রশংসা করছে। প্রতিদিন আমাদের তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার চা বিক্রি করতে পারছি। আমাদের এই গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালা দোকানে আমরাই কর্মচারী, তাই আমাদের প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালার উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা তিনজনই প্রথম দিকে মাত্র ৮০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে গ্র্যাজুয়েট চা ওয়ালার যাত্রা শুরু করি। এখন আমরা সবার কাছ থেকে সারা পাওয়ায় আরও অনুপ্রাণিত হচ্ছি। ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো- আগামী ৭ বছরের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি শাখা খোলা।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত