ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে
শিরোনাম

অনলাইনের জুয়ার টাকায় তাদের বিলাসী জীবন

  জার্নাল ডেস্ক

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ২০:৫০  
আপডেট :
 ১৬ জুলাই ২০২৬, ২০:৫৭

অনলাইনের জুয়ার টাকায় তাদের বিলাসী জীবন
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে গত এপ্রিলে দুর্ঘটনায় উল্টে পড়েছিল একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি। ওই গাড়ির মালিক ঘটনার পরপরই আরেকটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনে ফেলেন বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ।

ডিবি জানিয়েছে, ওই গাড়ির মালিক ২৩ বছরের তরুণ আরিফুল ইসলাম রিফাত। দামি গাড়ির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন নামি হোটেল ও রিসোর্টে অবস্থান করতেন তিনি।

আরিফুলসহ অনলাইন জুয়ার কারবারে জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার ডিবি জানায়, এই চক্রটি অনলাইন জুয়ার পেমেন্ট কোম্পানি বা অ্যাপ পরিচালনার মাধ্যমে বিলাসী জীবনযাপন করছিল।

ডিবির দাবি, এই পেমেন্ট কোম্পানির পেছনে রয়েছেন চীনা নাগরিকরা। অনলাইন জুয়ায় দেশের মানুষ যে অর্থ হারান, তার পুরোটা চলে যায় চীনাদের কাছে। আর এর সামান্য অংশ বা ০ দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ কমিশন পেয়েই বিলাসী জীবন কাটাতেন আরিফুলরা।

গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন—আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।

তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট যুক্ত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার ছয়জনের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ডিসি তরিকুল ইসলাম বলেন, দেড় বছর ধরে চক্রটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল পুলিশ। অবশেষে বুধবার গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি বলেন, তারা পুলিশের চোখ এড়াতে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতেন।

‘লাভ যায় চীনাদের পকেটে’

ডিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশে জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন ১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়।

আরিফুল ও তার চক্রটি দেশে ‘গো পে’ নামে একটি পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করছিলেন। ডিবির দাবি, আরিফুলই এই চক্রের মূল হোতা। তার বিরুদ্ধে আগেও চারটি মামলা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ পরিচালনায় অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে। বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে কাজ করা অধিকাংশ পেমেন্ট কোম্পানি চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে।

তিনি বলেন, এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসার জন্য স্থানীয় লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করা হয়।

ডিবি প্রধান বলেন, “জুয়ার সাইট এবং অ্যাপ চালানোর জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। পারসোনাল অ্যাকাউন্টগুলোতে পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার কেনা হয়। পরবর্তীতে পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ওই ক্রিপ্টো ডলার পাঠিয়ে দেওয়া হয়।”

পুলিশ জানিয়েছে, বাংলাদেশে জুয়ার সাইট ও অ্যাপগুলোর পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০টির মতো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করছে। এসব কোম্পানির প্রতিটির দৈনিক লেনদেন কয়েক কোটি টাকার বেশি।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘গো পে’ পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন। এই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ চীনা নাগরিকদের হাতে। ‘গো পে’র লেনদেন ৫ কোটি টাকার বেশি।

আরিফুল ও তার সহযোগীরা মূলত চীনা নাগরিকদের এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করতেন। ওই চীনা নাগরিকরা একসময় বাংলাদেশে থাকলেও বর্তমানে চীন থেকে বাংলাদেশে কোম্পানি পরিচালনা করছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রতিদিনের মোট লেনদেনের ০ দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ টাকা আরিফুলদের দিত। এর ৫০ শতাংশ ভেন্ডরদের দেওয়া হতো।

বাকি অর্থের ভাগ এমএফএস অ্যাকাউন্টের এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার এবং ক্ষেত্রবিশেষে হাউস ম্যানেজার, মালিক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও পেয়ে থাকেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

দামি গাড়ি, নামি হোটেল

ডিবি জানায়, কমিশনের অর্থের বাইরে আরিফুলদের আবাসন, খাবার, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খরচও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বহন করত।

রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে দুর্ঘটনায় পড়া নীল রঙের বিএমডব্লিউ গাড়িটির প্রসঙ্গ তুলে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়িটি ছিল আরিফের। পরে তিনি আরেকটি সাদা রঙের বিএমডব্লিউ গাড়ি কেনেন।

তিনি বলেন, “তাকে রিসোর্টের যে কক্ষ থেকে ধরা হয়েছে তার প্রতিদিনের ভাড়া ৫০ হাজার টাকা। তার কৌশল হচ্ছে তিনি কখনো ঢাকায়, কখনো গাজীপুরে বা কক্সবাজারে নামি-দামি হোটেলে থাকেন। তিন-চারদিন পরেই আবার অন্য জায়গায় চলে যান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই কৌশলেই চলছিলেন।”

পুলিশ বলছে, এসব তথ্য থেকে তাদের মাসিক আয়ের বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার এবং বিলাসবহুল গাড়ি উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: বিডি নিউজ

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএম

  • সর্বশেষ
  • পঠিত